সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে যখন আমরা বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিই, তখন আমাদের মনের গোপন বাসনা একটাই – চটজলদি ঘুম আসুক। অনেকে গর্ব করে বলেন, ‘জানেন, আমার বালিশে মাথা ছোঁয়ানোরও ফুরসত থাকে না, তার আগেই আমি ঘুমের দেশে!’ আমরাও ভাবি, কী দারুণ ব্যাপার! কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আর বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন, তা শুনলে আপনার এই ‘গর্বের ঘুম’ নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তা হতে পারে।
স্লিপ ল্যাটেন্সি
আমরা অনেক সময় মনে করি দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া মানেই হল আমাদের শরীর খুব চাঙ্গা। আসলে কিন্তু ব্যাপারটা উলটো। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় স্লিপ ল্যাটেন্সি (Sleep Latency)। অর্থাৎ, আপনি যখন আলো নিভিয়ে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হলেন, সেই সময় থেকে আপনার মস্তিষ্ক কখন ঘুমের প্রথম পর্যায়ে প্রবেশ করল – এই মাঝখানের সময়টুকু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন সুস্থ মানুষের স্বাভাবিক স্লিপ ল্যাটেন্সি হওয়া উচিত ১০ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে। যদি আপনার ঘুমোতে ১৫ মিনিট সময় লাগে, তাহলে জানবেন আপনার মস্তিষ্ক এবং শরীর একদম সঠিক ছন্দে রয়েছে।
২ মিনিটের ঘুম কেন ভয়ের
যদি কোনও ব্যক্তি বিছানায় শোয়ার ২ থেকে ৩ মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েন, তাহলে চিকিৎসকরা একে বলছেন প্যাথলজিক্যাল স্লিপিনেস। এর সহজ মানে আপনার শরীরে মারাত্মক ঘুমের ঘাটতি বা স্লিপ ডেট রয়েছে।
ব্যস্ত জীবনে আমরা অনেক সময় চাষবাস, ব্যবসা বা অফিসের চাপে ঘুমের সময় কমিয়ে ফেলি। ক্রমাগত পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব হলে শরীর এতটাই পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ে যে, সুযোগ পেলেই সে শাট ডাউন হয়ে যায়। অনেকটা মোবাইলের ব্যাটারি যখন ১ শতাংশে নেমে আসে, তখন যেমন হুট করে ফোন বন্ধ হয়ে যায় ঠিক তেমন। এটি কিন্তু গভীর কোনও শারীরিক সমস্যার লক্ষণও হতে পারে, যেমন স্লিপ অ্যাপনিয়া বা অতিরিক্ত মানসিক চাপ।
ঘরোয়া পরীক্ষায় ঘুমের মান যাচাই
চামচ পরীক্ষা বা দ্য স্পুন টেস্ট-এর মাধ্যমে আপনি জানতে পারবেন আপনার ঘুমের মান কেমন। এটি বিখ্যাত গবেষক নাথানিয়েল ক্লেইটম্যানের আবিষ্কৃত। পরীক্ষাটি আপনি ঘরেই করতে পারেন।
দুপুরের দিকে বা অবসরে যখন একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব আসবে, তখন হাতে একটি ধাতব চামচ নিয়ে খাটের ধারে শুয়ে পড়ুন। মেঝের ওপর ঠিক চামচটির নীচে একটি স্টিলের থালা রাখুন। এবার ঘড়ির সময় দেখে চোখ বন্ধ করুন। আপনার যখন গভীর ঘুম আসবে, তখন হাতের পেশি শিথিল হয়ে চামচটি থালার ওপর পড়বে। সেই প্রচণ্ড আওয়াজে আপনার ঘুম ভেঙে যাবে। এবার ঘড়ি দেখুন। যদি দেখেন ৫ মিনিটের কম সময়ে আপনার হাত থেকে চামচ পড়ে যায় তাহলে বুঝবেন আপনি মারাত্মক ঘুমের অভাবে ভুগছেন। আর যদি ১৫ মিনিটের কাছাকাছি সময় লাগে, তবে আপনার ঘুম স্বাভাবিক।
কেন ১৫ মিনিট সময় নেওয়া প্রয়োজন
আমাদের মস্তিষ্ক কোনও যন্ত্র নয় যে সুইচ টিপলেই বন্ধ হয়ে যাবে। সারাদিনের নানা চিন্তা, দুশ্চিন্তা এবং কাজের রেশ কাটতে মস্তিষ্কের কিছুটা সময় লাগে। এই ১৫-২০ মিনিটে মস্তিষ্ক নিজেকে ধীরগতির তরঙ্গ বা আলফা ওয়েভ থেকে থেটা ওয়েভ-এ নিয়ে যায়। এই রূপান্তরটি সুস্থ শরীরের জন্য জরুরি। যাঁরা দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েন, তাঁদের মস্তিষ্ক এই রূপান্তরের সময়টুকু পায় না। ফলে তাদের ঘুমের মান প্রায়ই নিম্নমুখী হয়।
আধুনিক ডিজিটাল অভ্যাস আমাদের ঘুমের বারোটা বাজাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা কিছু সহজ টোটকা দিয়েছেন যা দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ করা সম্ভব। যেমন –
১. ডিজিটাল কার্ফিউ – ঘুমোনোর অন্তত ৩০ মিনিট আগে স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা টিভি বন্ধ করে দিন। ফোনের নীল আলো আমাদের মস্তিষ্কের মেলাটোনিন হরমোনকে নষ্ট করে দেয়, যা ঘুমের জন্য দায়ী।
২. চা-কফি নিয়ন্ত্রণে রাশ – বিকেল ৫টার পর আর কড়া চা বা কফি খাবেন না। ক্যাফিন আপনার স্নায়ুকে উত্তেজিত রাখে, যা স্বাভাবিক স্লিপ ল্যাটেন্সি কমিয়ে দেয়।
৩. রুটিন মেনে চলা – প্রতিদিন একই সময়ে বিছানায় যাওয়া এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করুন। এমনকি ছুটির দিনেও এই নিয়ম মেনে চললে শরীর নিজের একটি ছন্দ তৈরি করে নেয়।
৪. পরিবেশ – ঘুমের ঘর অন্ধকার এবং শান্ত রাখা জরুরি। প্রয়োজনে হালকা সুতির পোশাক ব্যবহার করুন যাতে শরীরের তাপমাত্রা আরামদায়ক থাকে।
ঘুম কেবল অলসতা নয়, বরং এটি শরীরকে রিচার্জ করার প্রক্রিয়া। তাই বালিশে মাথা দিয়ে ১৫-২০ মিনিট এপাশ-ওপাশ করাটাকে খারাপ ভাববেন না। ওটাই আপনার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ক্রিয়া। কিন্তু যদি দেখেন প্রতিদিন ২ মিনিটে আপনি অচেতন হয়ে যাচ্ছেন, তবে বুঝবেন এবার নিজের শরীরের দিকে নজর দেওয়ার সময় এসেছে। মনে রাখবেন, আজকের ভালো ঘুমই আগামীকালের কর্মশক্তি। তাই সুস্থ থাকতে পর্যাপ্ত সময় নিন, আর শান্তির ঘুম ঘুমান।
