মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর শুল্কনীতির মোক্ষম জবাব দিল ভারত। এর আগে মার্কিন মুলুকে পণ্য রপ্তানির ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে ভারতকে চাপে ফেলেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। তারপর থেকে আমেরিকার বিকল্প বাজারের খোঁজে হন্যে ভারত চাইছিল নির্ভরযোগ্য বিকল্প। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে প্রায় দুই দশক ধরে চলতে থাকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরিত হওয়ায় সেই ভরসার জায়গাটা যেন খুঁজে পেল ভারত।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তা এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভান ডার লিয়েনের উপস্থিতিতে এফটিএ স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভারত এবং ইইউ, উভয়পক্ষই এই চুক্তিকে ‘মাদার অফ অল ডিলস’ আখ্যা দিয়েছে। এই চুক্তির ফলে ভারতের সঙ্গে ইউরোপের ২৭টি দেশের অর্থনৈতিক করিডর তৈরি হতে চলেছে এবং ২০০ কোটি মানুষের বাজার একসুতোয় গাঁথা হতে চলেছে।
বিশ্বের জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশকে প্রভাবিত করতে পারে মাদার অফ অল ডিলস। চুক্তি অনুযায়ী, বস্ত্র, চামড়া, জুতো, চা-কফি, মশলা, রত্ন, গয়নার মতো বিভিন্ন পণ্য বিনাশুল্কে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করতে পারবে ভারত। অপরদিকে, ইউরোপের একাধিক নামী গাড়ি নির্মাতা সংস্থা ভারতের বাজারে আগের তুলনায় অনেক সস্তায় গাড়ি বিক্রি করতে পারবে।
সস্তা হবে ইউরোপীয় মদ, চকোলেট, পাস্তার মতো একাধিক পণ্য। অর্থাৎ যে সুবিধা এতদিন আমেরিকার ক্ষেত্রে মিলত, এবার তা ইউরোপের ২৭টি দেশে মিলবে। এই চুক্তিতে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষিপ্ত আমেরিকা। সেদেশের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট রেসেন্ট ওই চুক্তির সঙ্গে ইউরোপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে আমেরিকার দাদাগিরি মিথে পরিণত হয়েছিল। সেই মিথকেও টপকে গিয়েছে ট্রাম্পগিরি।
লোকলজ্জা ভুলে একজন রাষ্ট্রনেতা নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার জন্য কতটা লালায়িত হতে পারেন, সেটা ট্রাম্প দেখিয়ে দিয়েছেন। গ্রিনল্যান্ডের মতো একটি সাতে-পাঁচে না থাকা দেশ দখলের নির্লজ্জ আবদার করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাঁর কাছে বিশ্বশান্তি, মানবতা, আন্তর্জাতিক রীতিনীতির কোনও মূল্য নেই।
রাশিয়ার সঙ্গে মজবুত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সত্ত্বেও ভারত কিন্তু আমেরিকার সঙ্গে সবসময় সহজ, স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। বিনিময়ে ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে শুল্ক কাঁটায় ভারতকে বিদ্ধ করেছে, ইইউয়ের সঙ্গে মাদার অফ অল ডিলস সেরে আমেরিকাকে তার জবাবটাই যেন দিল ভারত। ইইউ-ও চেয়েছিল আমেরিকাকে বুঝিয়ে দিতে যে, তারা ট্রাম্পের কেনা গোলাম নয়।
গণতন্ত্র, মুক্তচিন্তা, মানবাধিকারের প্রশ্নে আমেরিকার থেকে ইউরোপ কোনও অংশে কম যায় না। ইউরোপের দুই প্রধান নেতাকে এবার প্রজাতন্ত্র দিবসে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত। মোদি জানিয়েছেন, মাদার অফ অল ডিলসে বিশ্বের দুটি গণতান্ত্রিক শক্তি তাদের সম্পর্কের নির্ণায়ক অধ্যায় শুরু করল। উরসুলার দাবি, তাঁরা বিশ্বের ২০০ কোটি মানুষের জন্য মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল তৈরি করেছেন যাতে উভয়পক্ষই লাভবান হবে।
তবে চুক্তি সত্ত্বেও কিছু খটকা থেকে গেল। সমালোচকদের মতে, এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে না। বরং ভারতের অর্থনীতিতে ইউরোপের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পেলে দেশের কৃষি, খুচরো বাণিজ্য এবং উৎপাদন ক্ষেত্রগুলি বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারে। তাছাড়া ইউরোপের দামি, বিলাসবহুল গাড়ি, মহার্ঘ চকোলেট, মদ কেনার সামর্থ্য ভারতে সীমিত সংখ্যক মানুষের আছে। ফলে ইউরোপীয় পণ্য সস্তায় এদেশের বাজারে এলে এখানকার আমজনতার রুজিরুটির উন্নতি কতটা হবে, তা নিয়ে সংশয় আছে।
আমেরিকাকে সবক শেখাতে ইউরোপের সঙ্গে এই নতুন বাণিজ্য বন্ধুত্ব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি এবং আয় বৈষম্যে জর্জরিত মানুষের কাছে লাভজনক হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেল।
