শুভময় মুখোপাধ্যায়
রাজনীতিতে ১৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখা সহজ কথা নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তা করে দেখিয়েছেন। সারদা-নারদ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের নানা দুর্নীতির অভিযোগ—কোনও কিছুই তাঁর জনপ্রিয়তার দুর্গে বড়সড়ো ফাটল ধরাতে পারেনি। বিরোধীদের আক্রমণ তিনি সামলেছেন তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ‘ফাইটার’-সুলভ ভঙ্গিমায়। কিন্তু তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক কেরিয়ারে সম্ভবত এই প্রথমবার তিনি এমন এক সংকটের মুখোমুখি, যা এসেছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এক দিক থেকে। বিজেপি বা সিপিএম নয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ কোণঠাসা এক ফুটবল কিংবদন্তির অপমানে এবং এক তথাকথিত ‘বেসরকারি’ অনুষ্ঠানের বিশৃঙ্খলায় (chaos)। লিওনেল মেসির কলকাতা সফর এবং যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের সেই ২০ মিনিটের ‘বিপর্যয়’ আজ তৃণমূল সুপ্রিমোকে এমন এক অস্বস্তিতে ফেলেছে, যা এর আগে দেখা যায়নি।
১৩ ডিসেম্বরের সেই কালো অধ্যায়
তারিখটা ছিল ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন সেজেছিল বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলারকে বরণ করে নিতে। কিন্তু বরণের বদলে যা জুটল, তা একরাশ লজ্জা। অভিযোগ, অনুষ্ঠানটি ‘বেসরকারি’ হলেও সেখানে ভিড় জমিয়েছিলেন তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রী এবং তাঁদের ঘনিষ্ঠরা। মাঠের মধ্যে মেসির সঙ্গে সেলফি তোলার হিড়িক, বিশৃঙ্খলা এবং আয়োজকদের অপেশাদারিত্বে বিরক্ত হয়ে মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে মাঠ ছাড়েন মেসি।
এই ঘটনাটি যখন ঘটছে, তখন গোটা বিশ্ব তাকিয়ে ছিল কলকাতার দিকে। আর ঠিক তার পরেই হায়দরাবাদ, মুম্বই এবং দিল্লিতে মেসির যে অনুষ্ঠানগুলো হল, তা ছিল এককথায় নিখুঁত ও সুশৃঙ্খল। এই বৈপরীত্যই যেন বাংলার মানুষের গালে সপাটে এক চড়। যে বাংলা নিজেকে ফুটবলের মক্কা বলে দাবি করে, সেই বাংলাতেই কি না মেসি অপমানিত, অসম্মানিত হলেন? এই প্রশ্নটিই আজ সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে।
বাঙালি অস্মিতার দর্পচূর্ণ
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই তাঁর রাজনীতিতে ‘বাঙালি অস্মিতা’ বা বাঙালি আবেগকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বিজেপি-র ‘বহিরাগত’ তকমা বা দিল্লির আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তিনি বাঙালির গর্বকে ঢাল হিসেবে খাড়া করেছেন বারবার। কিন্তু মেসির এই ঘটনা সেই গর্বের মূলে কুঠারাঘাত করেছে। কলকাতা আজ লজ্জিত। সোশ্যাল মিডিয়ায়, চায়ের দোকানে, ট্রামে-বাসে একটাই আলোচনা— বাংলার মানসম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিল কিছু নেতার আত্মপ্রচার। মমতার সযত্নে লালিত ‘বাঙালি গর্ব’-এর ন্যারেটিভ আজ ছিন্নভিন্ন। এবং একজন পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেটা হাড়েমজ্জায় টের পাচ্ছেন।
ক্ষমা, শোকজ এবং বলির পাঁঠা
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে মমতা কালবিলম্ব করেননি। তিনি ক্ষমা চেয়েছেন— যা তাঁর রাজনৈতিক অভিধানে খুব একটা সুলভ শব্দ নয়। কিন্তু এই ক্ষমা চাওয়া কি শুধুই অনুতাপ, নাকি ড্যামেজ কন্ট্রোল? ঘটনার পরেই দেখা গেল পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর খাঁড়া নেমে আসতে। একাধিক আইপিএস এবং আইএএস অফিসারকে শোকজ করা হল, বিভাগীয় তদন্ত শুরু হল, গঠিত হল সিট (SIT)। এবং চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে ইস্তফা দিতে হল।
কিন্তু জনমানসে প্রশ্ন উঠছে, শতদ্রু দত্তের মতো প্রোমোটার বা আমলাদের ‘বলির পাঁঠা’ বানিয়ে কি আসল দোষীদের আড়াল করার চেষ্টা চলছে না? ১৩ ডিসেম্বরের ফুটেজে দেখা গেছে, মেসির আশপাশে যাঁরা ভিড় করেছিলেন, যাঁরা হাসিমুখে ফ্রেমে থাকার চেষ্টা করছিলেন, তাঁরা কারা? অভিযোগের আঙুল উঠছে দলের অত্যন্ত প্রভাবশালী কিছু মুখ এবং ‘ফার্স্ট ফ্যামিলি’-র ঘনিষ্ঠদের দিকে। পুলিশ বা ক্রীড়ামন্ত্রীকে সরিয়ে কি সেই ভিআইপি-দের দায় ঢাকা দেওয়া যাবে? আমলারা তো হুকুমের দাস, হুকুম যাঁরা দিয়েছিলেন, সেই রাজনৈতিক দাদারা কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে?
অভিষেকের নীরবতা : কৌশল নাকি দূরত্ব?
এই গোটা পর্বে আরও একটি বিষয় নজর কেড়েছে, তা হল, দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড এবং সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা। আরজি কর কাণ্ডের সময় যেমন তিনি দীর্ঘ সময় নীরব ছিলেন, মেসির ঘটনাতেও তিনি মুখে কুলুপ এঁটেছেন। যখন খোদ মুখ্যমন্ত্রী ক্ষমা চাইছেন, দলের মুখপাত্ররা সংবাদমাধ্যমে ড্যামেজ কন্ট্রোলে ঘাম ঝরাচ্ছেন, তখন অভিষেক কিন্তু এই বিষয়ে একটিও শব্দ খরচ করেননি। উলটে দেখা গেল, এই উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি ব্যস্ত তাঁর নিজের নির্বাচনি কেন্দ্র ডায়মন্ড হারবারের নিজস্ব প্রকল্প ‘সেবাশ্রয় ২’-এর প্রচার নিয়ে। রাজ্যজুড়ে তোলপাড় করা এই ঘটনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজের ‘মস্তিষ্কপ্রসূত’ প্রকল্প নিয়ে এই পোস্ট কি বুঝিয়ে দিচ্ছে না যে, তিনি সচেতনভাবেই এই বিতর্ক থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখছেন? রাজ্যের ভাবমূর্তির সংকটের চেয়েও কি তাঁর কাছে নিজের কেন্দ্রের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা বেশি জরুরি? রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, অভিষেক হয়তো বুঝতে পারছেন এই ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী, তাই নিজের ‘ক্লিন ইমেজ’ বজায় রাখতে তিনি মেপে পা ফেলছেন।
শেষের শুরু, নাকি ফিনিক্স পাখির মতো উত্থান?
বিরোধীরা এবং সমালোচকদের অনেকেই বলছেন, এটি মমতার পতনের শুরু। যে আবেগ এবং গর্বের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি রাজনীতি করেছেন, তা আজ প্রশ্নের মুখে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনীতির ময়দানে কাঁচা খেলোয়াড় নন। তিনি জানেন, কীভাবে ন্যারেটিভ বা রাজনীতির অভিমুখ বদলে দিতে হয়। অতীতেও বহু কঠিন পরিস্থিতি থেকে তিনি ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।
অরূপ বিশ্বাসের ইস্তফা বা অফিসারদের শাস্তি দিয়ে তিনি হয়তো সাময়িক ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা করছেন। এখন দেখার বিষয়, তিনি কি সত্যিই দলের ভেতরের আগাছা পরিষ্কার করার সাহস দেখাবেন, নাকি সবটাই লোকদেখানো মহড়া হিসেবেই থেকে যাবে? ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটের আগে এই ‘মেসি-ধাক্কা’ কি তৃণমূলের কফিনে শেষ পেরেক হবে, নাকি মমতা তাঁর রাজনৈতিক জাদুবলে আবার পাশার দান উলটে দেবেন?
বাঙালির আবেগ বড় বালাই। একবার আঘাত পেলে তা সহজে সারে না। মেসির ছেড়ে যাওয়া ফাঁকা মাঠ আর ক্ষুব্ধ মুখগুলো বাংলার মানুষ সহজে ভুলবে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষোভের আঁচ অনুভব করছেন ঠিকই, কিন্তু সেই উত্তাপ তাঁকে পুড়িয়ে দেবে নাকি ইস্পাতের মতো আরও কঠিন করে তুলবে, তার উত্তর দেবে আগামী সময়। তবে এটুকু নিশ্চিত, ১৪ বছরের শাসনে এমন অস্বস্তিকর এবং লজ্জাজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি তাঁকে আগে কখনও হতে হয়নি।
(লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক)
