রূপায়ণ ভট্টাচার্য
ওই যে সাবিত্রী চ্যাটার্জি! এত বয়স হয়ে গেল। ৯০। এখনও এত সাজগোজের মানেটা কী? এত বয়সেও অভিনয়ের কী দরকার?
অনুষ্কাশংকর! আপনি ভুলে গেলেন কোন বাবার মেয়ে? এইভাবে শরীর দেখানো পোশাক পরে ঘুরছেন?
জয়া বচ্চন! এত ঝগড়ুটে বলেই কি অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে আপনার সংসারে অশান্তি?
অ্যাই দেবশ্রী রায়! আপনাকে মহালয়ার অনুষ্ঠানে দুর্গা সাজতে কে বলেছে এত বয়সে এসে?
মমতাশংকর! সব ব্যাপারে আপনার মতামত দেওয়ার কী হল?
শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়! এত বড় ছেলের মা, ঘোড়ায় চড়ে সিনেমার প্রচারে নামতে লজ্জা করে না?
অপরাজিতা ঘোষ দাস! আপনাকে এমন পরকীয়ার চরিত্রেই অভিনয় করতে হল?
স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়! আপনার বাবার একটা ভালো ছবিতে ফুল দিতে পারেননি?
শুধু বিস্ময় চিহ্ন আর প্রশ্ন!
এগুলো আমার নয়। ফেসবুকে যাঁরা সক্রিয়, তাঁরা জানেন, এই প্রশ্নগুলো আসলে কাদের।
এইসব প্রশ্ন বহু তথাকথিত শিক্ষিত মহিলার। এমন নরম করে মোটেই প্রশ্ন করেন না তাঁরা। ছাপার অযোগ্য ভাষায় ট্রোল করতে অভ্যস্ত এঁরা। বাকস্বাধীনতার অপপ্রয়োগে এঁরা একশোয় একশো। ইদানীং শোবিজের সেলেবদের সোশ্যাল মিডিয়ায় আক্রমণ একেবারে নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা শ্রেণি তৈরিই আজ শুধু নামী সেলেবদের অকারণ আক্রমণের জন্য। উত্তমকুমার এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একসঙ্গে যাঁকে সর্বকালের সেরা বাঙালি অভিনেত্রী বলেন, সেই সাবিত্রীকে যেভাবে এলি তেলি গঙ্গামালিরা আক্রমণ করেছেন, তা রীতিমতো অকল্পনীয়। আজও অভিনয়ে মারাত্মক সক্রিয় সাবিত্রী বা মাধবী। দুজনেই বাঙালির চিরন্তনী গর্ব, বয়স জয় করা প্রেরণার মুখ। অথচ বাংলায় তাঁদেরও শুনতে হচ্ছে অকথ্য গালাগাল। কেন তাঁরা আজও সক্রিয়?
এবং সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের, এই ট্রোলবাহিনীর অধিকাংশ মুখ মহিলা। সকালে হয়তো ক্লাবে নারী স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল করেছেন, মুণ্ডপাত করছেন পুরুষতন্ত্রের। বিকেলে ফেসবুকে সাবিত্রী থেকে স্বস্তিকা, দেবশ্রী থেকে শ্রাবন্তী সবাইকে অকাতরে গালাগাল দিয়ে চলেছেন। এঁদের বক্তব্যের পিছনে পুরুষতন্ত্রেরই জয়গান স্পষ্ট।
এঁদের আসলে অধিকারই নেই সাবিত্রীকে নিয়ে কোনও কথা বলার। কিন্তু ফেসবুক তো এখন কলতলার, টিভি চ্যানেলের সান্ধ্যকালীন বিতর্কের মতো। যে যা খুশি বলে যেতে পারেন। তাই এই মহান পরামর্শদাতারা ফেসবুকে যা খুশি তাই লিখে চলেছেন। কিছু না জেনেই। ভালো করে খোঁজ না নিয়ে। এ এক নতুন সামাজিক অসুখ।
মনোবিদ ও মনস্তত্ত্ববিদদের সঙ্গে কথা বলে গালিওয়ালিদের অবিশ্বাস্য কীর্তিকলাপের তিনটে কারণ উঠে আসে।
১) গালিব্রিগেডের অধিকাংশই বেকার গৃহবধূ বা তরুণী। যাঁরা চাকরি করেন, অনেক কাজ, তাঁদের এত সময় নেই সেলেবচর্চার। যাঁরা বাড়িতে বসে থাকেন, তাঁরাই নাম লেখান ট্রোলবাহিনীতে। ট্রোলিং শুরু হতাশা, অক্ষম ঈর্ষা এবং রাগ থেকে। আমি পারলাম না, অন্যরা পারছে কেন?
২) ফেসবুক এঁদের সমালোচনার ছাড়পত্র দিয়ে দিয়েছে। এঁরা জানেন, পুলিশ কিছু করবে না। সেলেবদের গালাগাল দিয়ে এক অন্যরকম তৃপ্তি। নিজেকে সেলেবদের সমান মনে হয়।
৩) অধিকাংশেরই ধারণা, সেলেবরা অযোগ্য হয়েও এত সাফল্য, স্বীকৃতি পেয়েছে। এটা তো আমিও পেতে পারতাম। ওরা সাফল্য পেয়েছে অন্যায় সিঁড়ি ব্যবহার করে।
দিন কয়েক আগে শিয়ালদা স্টেশনের সামনে অভিনেত্রী কাঞ্চনা মৈত্র একটি দৃশ্যের শুটিং করছিলেন। চরিত্রের দাবি অনুযায়ী গলার স্বর পালটে খারাপ ভাষা ব্যবহার করতে হচ্ছিল তাঁকে। আর যায় কোথায়! ফেসবুকের নতুন হার্মাদরা শুরু করে দিল গালাগাল। এই অভিনেত্রী ব্যক্তিগত জীবনেও সব সময় নাকি এরকমই করে থাকেন। পোস্টে দু-একজন মিনমিনে গলায় বলার চেষ্টা করেছিল, আরে, এটা তো একটা সিরিয়াল বা সিনেমার শুটিংয়ের অংশ। কে এত শুনতে যাবে, পড়তে যাবে? অন্যের কথা এখন কেউ শোনে না, নিজের কথা বলতে চায়! এই ঘটনা বাস্তবে ঘটেছে, ধরে নিয়ে অভিনেত্রীকে অকথ্য গালিগালাজ চলল বহুদিন।
হায় বাকস্বাধীনতা! এক তরুণী অভিনেত্রীকে তো টানা বলে যাওয়া হয়েছে, তাঁর গায়ের রং এত কালো কেন। অবসাদে বিধ্বস্ত তরুণী বছর দুই চলে গিয়েছিলেন আড়ালে। যদি অবসাদে আত্মহননের পথে যেতেন তিনি, দায়িত্ব নিত কে? এই গালিওয়ালিরা?
মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল, তৃণমূল-বিজেপি-সিপিএম-কংগ্রেসের সমর্থক বাহিনীর মধ্যে এই ধরনের গালিগালাজ চালাচালি, ট্রোল হয় অনেকদিন। সেই অকথ্য ভাষা বিনিময়ে অন্তত মহিলাদের প্রবেশ ছিল না কার্যত। এখন টালিগঞ্জের অতি ছোট্ট দুনিয়া নিয়ে মহিলাদের ভাষার ব্যবহার শুনলে অবাক হতে হয়।
এঁরা মন দিয়ে প্রতিদিন সিরিয়াল দেখবেনও এবং অকথ্য ভাষায় গালাগাল দিয়ে চলে যাবেন কলাকুশলীদের। কিছু পুরুষ তা দেখে উৎসাহিত, তাঁরাও বাড়তি আগ্রহ নিয়ে যোগ দেন সেখানে। মহিলারাই এঁদের টার্গেট, মহিলা মুখ্যমন্ত্রীও বিশ্রী গালাগালের হাত থেকে পার পাবেন না। মুখ্যমন্ত্রীর নীতি নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, কিন্তু এই নারীরা এমন কদর্য ভাষা প্রয়োগ করেন, তা কল্পনার বাইরে।
ভাবতে পারেন, গালাগাল দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে অনেক প্রোফাইল। যত গালাগাল, তত রিচ, আর ভিউ। বাঙালি নাকি এসব গালাগাল শুনতে আজকাল ভালোবাসছে ফেসবুকে। সাবিত্রীর মতো মহান অভিনেত্রীদের গালাগাল দেওয়ার সময় এঁদের আর বাড়ির ঠাকুমা, দিদিমার মুখ ভেসে আসে না। ভাবেন না, মমতাশংকর নিজে কথা বলছেন না আগ বাড়িয়ে। তাঁর মতামত জানতে চাওয়া হচ্ছে বলে মুখ খুলেছেন। দেবশ্রী নিজে নাচতে যাননি। তাঁর নাচের মূল্য এখনও আছে বলে তাঁকে টিভি চ্যানেল ডেকেছে। স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় তাঁর কিংবদন্তি বাবা সন্তু মুখোপাধ্যায়ের ছবিতে মালা দিয়েছিলেন। তাতেও এঁদের গালাগাল ফুরোবে না, নানা প্রশ্ন।
বাংলায় রাজনীতিকদের ভাষা অত্যন্ত খারাপ হয়ে যাচ্ছে বলে আমরাই হাহুতাশ করে থাকি। সেলেবদের যেভাবে প্রচুর মানুষ মেঠো ও গ্রামীণ ভাষায় আক্রমণ করছেন বাংলায়, তা দেখার পর কোনও রাজনীতিককেই আর দোষারোপ করা উচিত নয়। নেতারা তো সমাজেরই অঙ্গ। এবং সমাজের একটা বড় অংশ, বিশেষ করে তথাকথিত শিক্ষিত মহিলারা যদি এভাবে প্রকাশ্যে গালাগাল দিয়ে যান, তার প্রভাব নেতা-শিক্ষক-আইনজীবী-সরকারি কর্মী সবার উপরেই পড়বে। এবং সেটাই পড়ছে। পরের প্রজন্মের উত্তরসূরিরাও মা-বাবাকে দেখে একই কাজে নামছে অতি দ্রুত।
আমি স্টারডম পাইনি, কিন্তু তোমরা কেন পাবে? এই ঈর্ষা থেকেই এসব গালাগাল। এঁরাই আবার নেতাদের মুখে গালাগাল শুনে প্রশ্ন করবেন, এসব কী হচ্ছে? বাংলাটা রসাতলে গেল! ওদিকে, মুখ্যমন্ত্রী থেকে বিরোধী সব দলের নেতাদের ছাপার অযোগ্য ভাষায় জ্ঞান দিয়ে যাবেন এঁরাই! কোনওদিন জ্ঞান দেবেন, কোনওদিন শুধু অযৌক্তিক গালাগাল। যুক্তিপূর্ণ ভদ্রভাষার সমালোচনা অবশ্যই দরকার। এঁরা তো নাম লেখান খেউরের দলে। ফেসবুকের এই গালিওয়ালা, গালিওয়ালিদের মুখে কোনওদিন যুক্তি শুনবেন না। গালাগালেই তাঁদের মোক্ষলাভ।
তাহলে আর নেতাদের মুখে আমরা শুধুই সাধু ভাষা শুনতে চাইছি কেন? নেতাদেরও তো আরও বেশি করে রিচ চাই, ভিউ চাই! তাঁরা উচ্চকিত ভাষণে ছাপার অযোগ্য কথা বললে উত্তেজিত হবেন না আর। এসব আমাদের বাঙালিদের সবারই প্রাপ্য।
