শ্রাবস্তী রায়
প্রকৃতির কোল ঘেঁষেই বেড়ে ওঠা উত্তরবঙ্গের ভূমিপুত্র রাজবংশী সম্প্রদায়ের জীবনচর্যা। তাঁদের প্রতিটি আচার-অনুষ্ঠানে প্রকৃতির ছোঁয়া আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে। ঋতু পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে, বিশেষ করে ফাল্গুনের আগমনে যখন শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন চাদর বিদায় নেয়, তখন রাজবংশী লোকবিশ্বাসে এক বিশেষ পার্বণ উদযাপিত হয়। ফাল্গুন মাসের তেরো তারিখ উত্তরবঙ্গের জনজীবনে ‘তেরেয়াপুজো’ নামে পরিচিত। এটি কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং শীতকে সশ্রদ্ধ বিদায় জানানোর এক অনন্য লোকজ রীতি। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই উৎসবটি রাজবংশী সমাজের কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতি ও প্রাণীকুলের প্রতি তাঁদের ভালোবাসার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
গোয়ালের শুচিতা ও মাঙ্গলিক আচার
তেরেয়াপুজোর দিনটি শুরু হয় অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে। ভোরবেলা গৃহস্থের গোয়াল থেকে গোরু বের করে সম্পূর্ণ স্থানটি পরিষ্কার করা হয়। সংগৃহীত শুকনো গোবর এই পুজোর একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে তুলে রাখা হয়। উৎসবের এই বিশেষ দিনে বাড়ির পোষ্য গবাদিপশুকে পরম মমতায় স্নান করানোর রীতি প্রচলিত। আগেকার দিনে গ্রামের পার্শ্ববর্তী নদীতে নিয়ে গিয়ে গোরুকে স্নান করানো হত, যদিও বর্তমান সময়ের ব্যস্ততায় অনেকে বাড়ির আঙিনাতেই এই মাঙ্গলিক স্নান সম্পন্ন করেন। বাড়িঘর লেপাপোছা করে শুদ্ধ করার পর শুরু হয় শিশুদের আনন্দযজ্ঞ। বড়রা ছোটদের জন্য কলা গাছের খোল বা ‘ঢোনা’ দিয়ে বিশেষ গাড়ি বানিয়ে দেন, যা এই উৎসবের এক প্রধান আকর্ষণ।
শিশুদের ঢোনা গাড়ি ও লোকবিশ্বাস
শিশুদের বানানো সেই ঢোনা গাড়িতে সাজিয়ে রাখা হয় শিমুল ফুল, মাদার ফুল (স্থানীয় ভাষায় মান্ডাল ফুল), ঝাড়ুর কাঠি এবং আগে থেকে সংগ্রহ করে রাখা শুকনো গোবর। এরপর সেই গাড়িটি টেনে নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের রাস্তার তেমাথায়। সেখানে ফুল ও জল দিয়ে ভক্তিভরে পুজো দেওয়া হয়। পুজোর শেষে শিশুরা নিকটবর্তী জলাশয়ে স্নান করে এক দৌড়ে বাড়ি ফিরে আসে। এই রীতির সঙ্গে এক গভীর লোকবিশ্বাস জড়িয়ে আছে- দৌড়ে ফেরার সময় নাকি পেছন ফিরে তাকাতে নেই। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, পেছন ফিরে তাকালে বিদায় নেওয়া শীত পুনরায় ফিরে আসতে পারে। এই সরল বিশ্বাসই রাজবংশী সমাজের লোকসংস্কৃতিকে এক মায়াবী রূপ দান করেছে।
আখোয়ালি পির ও রাখাল সেবার মিলন
তেরেয়াপুজোর দ্বিতীয় পর্বটি মূলত পুরুষকেন্দ্রিক। কোচবিহার জেলায় এই সময়ে ‘আখোয়ালি পির’-এর পুজোর প্রচলন লক্ষ করা যায়। ফাল্গুনের শুরুতে কিশোররা বাঁশের আগায় পাটের আঁশ বেঁধে গ্রামজুড়ে ‘মাগন’ বা ভিক্ষা সংগ্রহ করে। তেরেয়ার দিনে সেই সংগৃহীত উপচার দিয়েই আখোয়ালি পিরের আরাধনা করা হয়। অন্যদিকে, জলপাইগুড়ি জেলায় ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সেখানে সন্ধ্যার দিকে গ্রামের ফসলি জমিতে বা ‘দোলাবাড়িতে’ উনুন তৈরি করে রান্নাবান্নার আয়োজন করেন পুরুষরা। উনুনকে পুজো দিয়ে শুরু হয় রন্ধনকার্য। এরপর গ্রামের সকলে মিলে মেতে ওঠেন ‘রাখাল সেবা’ বা বনভোজনে। এই সামূহিক ভোজন কেবল উদরপূর্তি নয়, বরং গ্রামীণ ঐক্যের এক শক্তিশালী মাধ্যম।
বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য ও মিলনের বার্তা
সুদীর্ঘকাল ধরে প্রকৃতির উপাসনার মধ্য দিয়ে রাজবংশী জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যের ছাপ বজায় রেখেছে। তেরেয়াপুজোর এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আয়োজন আসলে বৃহত্তর সমাজকে একাত্ম করার এক বলিষ্ঠ বার্তা দেয়। যেখানে নেই কোনও কৃত্রিমতা, আছে কেবল অনাবিল আনন্দ আর প্রাণের স্পন্দন। তবে বর্তমান আধুনিকতা ও ব্যস্ততার যুগে এই প্রাচীন লোকাচারগুলি আজ ক্রমশ বিলুপ্তির পথে। বিশ্বায়নের দাপটে ধুঁকতে থাকা এই গ্রামীণ সংস্কৃতিগুলো হারিয়ে গেলে উত্তরবঙ্গের মাটির আসল গন্ধটাই হয়তো ফিকে হয়ে যাবে।
(লেখক সংস্কৃতিকর্মী। ধূপগুড়ির বাসিন্দা।)
