উত্তরবঙ্গ ব্যুরো: এ যেন শিকড়ের খোঁজ এবং ভবিষ্যতের ভিত তৈরি। বাঙালির আবেগের ঢাকে কাঠি পড়ে যখন ‘গৌরী এল’ বার্তা ছড়িয়ে পড়ে, তখনই তাই অপেক্ষা শুরু হয় শারদ সম্মানের। হবে না-ই বা কেন, কয়েক মাসের চরম খাটনি, ব্যস্ততা শেষে এতটুকু প্রাপ্তির প্রত্যাশা তো স্বাভাবিক। তাছাড়া শারদ সম্মান যখন তুলে দেয় উত্তরবঙ্গের আত্মার আত্মীয় ‘উত্তরবঙ্গ সংবাদ’, তখন তার গরিমা মাপার মাপকাঠি তো অন্য কিছু হতে পারে না। এই সম্মান ‘সব পেয়েছি’র- বক্তব্য পুজো উদ্যোক্তাদের। শুধু উদ্যোক্তারা নন, আবেগ জড়িয়ে টানা দু’দিন শহর থেকে গ্রাম, আলো-আঁধারি পথ পেরিয়ে ক্লান্তিহীন বিচারকরাও।
সময়ের চাকা যত গড়াচ্ছে, তত প্রতিযোগিতা বাড়ছে। যে কারণে এবছর গত বছরের সংখ্যাকে পিছনে ফেলে শারদ সম্মানের লড়াইয়ে দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, মালদা, উত্তর দিনাজপুর ও দক্ষিণ দিনাজপুরের অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮২। গত বছরের থেকে ৩০টি বেশি। প্রতি জেলায় প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং কম বাজেটের তিন সেরা মিলিয়ে তিনটি পুজোকে বেছে নিচ্ছে উত্তরবঙ্গ সংবাদ।
মোট পুরস্কার ৪২টি। প্রতি জেলার প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্থানাধিকারী উদ্যোক্তা সংস্থা পাবে যথাক্রমে ১৫০০০, ৭৫০০ এবং ৫০০০ টাকা পুরস্কার। কম বাজেটের সেরাদের জন্য রয়েছে ৫,০০০ টাকা। সঙ্গে সুদৃশ্য ট্রফি। এবছর সর্বাধিক সংখ্যায় ৫৩টি পুজো কমিটি অংশগ্রহণ করছে কোচবিহার জেলা থেকে। দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদা জেলায় রয়েছে যথাক্রমে ৩৯, ৩৬, ৩৮, ৩০, ৩৯ এবং ৪৭টি পুজো। বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে সোমবার সপ্তমীর দুপুর ১২টায় উত্তরবঙ্গ সংবাদের ফেসবুক পেজে। পরে বিকেলে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।
প্রতিটি জেলায় পঞ্চমী ও ষষ্ঠীতে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরেছেন বিচারকরা। প্রতি জেলায় ছিলেন তিনজন করে বিচারক। সেরা বেছে নেওয়ার সময়টা মাত্র দু’দিন। তার মধ্যেই এত সংখ্যক মণ্ডপে পা রাখা, প্রতিমা, মণ্ডপের চুলচেরা বিশ্লেষণ, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও পরিবেশে নজর রাখার কঠিন কাজটি করেছেন বিচারকরা।
সেই কঠিন কাজটিই আন্তরিকতার সঙ্গে করেছেন মালদার নাট্যকর্মী ওঙ্কারানন্দ সাহা, চিত্রশিল্পী প্রণব সাহা চৌধুরী ও মূকাভিনেতা বিদ্যুৎ কর্মকার থেকে শুরু করে আলিপুরদুয়ারের ডঃ জয়দীপ সিং, অনিরুদ্ধ ভট্টাচার্য ও অসীম সাহা, শিলিগুড়ির কুন্তল ঘোষ, দেবব্রত চক্রবর্তী ও মানসী কবিরাজ, জলপাইগুড়ির গৌতম গুহ রায়, ডঃ রাজা রাউত ও সিদ্ধার্থশেখর চক্রবর্তী, উত্তর দিনাজপুরের শোভন মৈত্র, শ্যামল কর্মকার ও শিবশংকর উপাধ্যায়, দক্ষিণ দিনাজপুরের কবি শুভদীপ আইচ, চিত্রশিল্পী শুভ্রদীপ চৌধুরী ও নাট্যকর্মী শুভদীপ পাল, কোচবিহার কলেজের অধ্যক্ষ ডঃ পঙ্কজ দেবনাথ, কোচবিহার রামভোলা হাইস্কুলের শিক্ষক তথা বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী মৃত্যুঞ্জয় ভাওয়াল ও বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ইভানা কুণ্ডু প্রমুখ।
প্রত্যেকেই অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন টানা দু’দিন। উৎসবে পরিবারের সঙ্গে মেতে ওঠার মূল্যবান সময়টা দিয়েছেন উত্তরবঙ্গ সংবাদকে। ২১ জন বিচারকের পক্ষে ২৮২টি পুজোমণ্ডপ ঘুরে ৪২টি পুজোকে সেরা হিসেবে বেছে নেওয়া যথেষ্ট কঠিন। কারণ, পুজোগুলি শুধু শহরের মসৃণ রাস্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, উত্তরবঙ্গ সংবাদ পৌঁছে গিয়েছিল গ্রামের খানাখন্দ ভরা রাস্তাতেও। আত্মার আত্মীয়তার বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার প্রতিজ্ঞা আর দায়বদ্ধতার কারণে। যখনই যে মণ্ডপে পৌঁছেছে উত্তরবঙ্গ সংবাদ, উদ্যোক্তাদের মুখে ছিল চওড়া হাসি। এই হাসি বছরভরের অপেক্ষার। যা বলে দেয় উত্তরবঙ্গ সংবাদের শিকড়টা কত গভীরে। যে গভীরতার কারণে ভিতটাও শক্ত।
