- মৌমিতা আলম
নারী হতে গেলে কী কী মূল্য চোকাতে হয়? ব্রিটিশ রাজত্বে কেরলের ত্রাভাঙ্কোরের রাজা আদায় করতেন স্তন শুল্ক। হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন, স্তন শুল্ক বা ব্রেস্ট ট্যাক্স। তথাকথিত নীচু জাত বলে মনে করা মহিলাদের স্তন ঢাকতে গেলে কর দিতে হত। ত্রাভাঙ্কোর ছিল ব্রিটিশ রাজত্বে ভারতবর্ষে থাকা ৫৫০টি প্রিন্সলি রাজ্যের মধ্যে অন্যতম একটি রাজ্য। মূল উদ্দেশ্যটা ছিল পোশাক দিয়ে যাতে জাত চেনা যায়। এখনও যেমন অনেকেই পোশাক দিয়ে ধর্ম চিনতে চান! দলিত সম্প্রদায়ের মহিলাদেরই এই কর দিতে হত।
নাঙ্গেলি বলে একজন এঝভা সম্প্রদায়ের মহিলা এটা মানতে চাননি। কর আদায়কারীরা যখন তাঁর বাড়িতে যান, নাঙ্গেলি প্রতিবাদে নিজের স্তন কেটে ফেলে দেন। অতিরিক্ত রক্তপাতের জন্য তাঁর মৃত্যু হয়। নাঙ্গেলির এই প্রতিরোধ থেকেই স্তন করের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয় এবং এই কর রদ করতে বাধ্য হন ত্রাভাঙ্কোরের রাজা। নাঙ্গেলির এই গ্রাম আজও মুলাচিপারামবু বা ল্যান্ড অফ দ্য উওম্যান উইথ ব্রেস্ট নামে পরিচিত।
নারী হওয়া কি অতই সোজা?
আজকে হয়তো ব্রেস্ট ট্যাক্স নেই কিন্তু আজও শুধুই নারী হতে দিতে হচ্ছে কর যার নাম পিঙ্ক ট্যাক্স বা গোলাপি শুল্ক। পিঙ্ক ট্যাক্স কথাটি প্রথম চালু হয় আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় ১৯৯৪ সালে। মহিলাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী চড়া দামে কিনতে হয় পুরুষদের জন্য তৈরি জিনিস থেকে। একারণেই নাকি পিঙ্ক ট্যাক্স নেওয়া হয়। একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় যে, আমেরিকায় নারীদের ব্যক্তিগত প্রসাধনীর দাম পুরুষদের থেকে প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। মহিলাদের পোশাকের দাম পুরুষদের থেকে সাত থেকে আট শতাংশ বেশি। মহিলাদের চুল কাটানোর জন্য বেশি টাকা দিতে হয় পুরুষদের থেকে।
ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স অ্যাসোসিয়েশনের গবেষণা অনুযায়ী ভারতের ৬৭ শতাংশ মানুষ পিঙ্ক ট্যাক্স–এর নামই শোনেনি কখনও। খুবই স্বাভাবিক যদিও। যে দেশের মানুষ সকাল থেকে ঘুমোতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত যে জীবনদায়ী ওষুধ খায় সেই ওষুধেও চড়া জিএসটি দিতে অভ্যস্ত বিনা প্রতিবাদে, তাদের আর কী-ই বা যায় আসে মহিলাদের কোন শুল্ক বেশি দিতে হচ্ছে তাতে! মজার বিষয়টি হল ছোট মেয়েদের খেলনা থেকে প্রাপ্তবয়স্কাদের পোশাকের যে অতিরিক্ত দাম দিতে হচ্ছে তা কিন্তু সরকার কোনও ট্যাক্স–এর নামে চাপাচ্ছে না। আবার মহিলাদের জন্য তৈরি সামগ্রীর যে বেশি দাম নিচ্ছে তার উপর সরকারের কোনও নিয়ম বা আইনও নেই। এর ফলে যে বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে তা সম্পূর্ণ পকেটে পুরছে বিভিন্ন সংস্থা। যদিও ভারতে এনসিডিআরসি (ন্যাশনাল কনজিউমার ডিসপিউটস রিড্রেসাল কমিশন) বারবার বলেছে যে, সংস্থাগুলির উচিত ন্যায্যমূল্য নেওয়ার পাশাপাশি লিঙ্গ নিরপেক্ষ দাম ধার্য করা। কিন্তু আইন না থাকলে কে আর শোনে কার কথা।
ভারতের মতন উন্নয়নশীল দেশে যেখানে সমস্ত নারী আজও স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতে পারেন না অর্থের অভাবে, স্যানিটারি ন্যাপকিনের উপর ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১২ শতাংশ কর নিত কেন্দ্রীয় সরকার। স্যানিটারি ন্যাপকিন থেকে কন্ট্রাসেপটিভকে মনে করা হত লাক্সারি প্রোডাক্ট, তাই ছিল এই ট্যাম্পন ট্যাক্স। কিন্তু ২০১৮ সালের পর এক অনলাইন আন্দোলন চালু করা হয় এই করের বিরুদ্ধে। স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপর থেকে এই ট্যাম্পন ট্যাক্স তুলে নিতে অনলাইনে যে আবেদন করা হয় তাতে সই করেন সেলেব্রিটি, অ্যাক্টিভিস্ট, রাজনীতিবিদ থেকে সমস্ত স্তরের প্রায় চার লাখ মানুষ। সরকার অবশেষে স্যানিটারি ন্যাপকিন থেকে সমস্ত কর তুলে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু পিঙ্ক ট্যাক্স বা গোলাপি কর থেকেই যায় নীরবে, চুপচাপ আমাদের প্রতিবাদের আড়ালে।
তাই একটি মহিলাদের ডিওডরান্টের দাম পুরুষদের ডিওডরান্টের থেকে বেশি। ইউএনউইমেন-এ প্রকাশিত একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, আমেরিকায় অনেক প্রদেশে যেখানে ভায়াগ্রাকে করমুক্ত সামগ্রী হিসেবে ধরা হয় পুরুষদের প্রয়োজনীয় জিনিস বলে কিন্তু মহিলাদের স্যানিটারি ন্যাপকিনকে লাক্সারি প্রোডাক্ট হিসেবে ধরা হয় ও নেওয়া হয় চড়া কর।
ভারতে যেখানে অর্থের অভাবে স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনার খরচ করতে গিয়ে পিরিয়ড পভার্টি বা মাসিক-দরিদ্রতার শিকার নারীরা, সেখানে পিঙ্ক ট্যাক্স একটি নারীবিরোধী কর যা নারীদের উপর অনৈতিক অর্থনৈতিক বোঝা চাপায়। ভারতের মতন উন্নয়নশীল দেশে নারী ও পুরুষের মধ্যে গড় আয়ের পার্থক্য বিরাট। ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্স (২০২৪) থেকে জানা যায়, অর্থনৈতিক লিঙ্গ সমতার সর্বনিম্ন স্তরের দেশগুলির মধ্যে রয়েছে ভারত৷ ভারতের অর্থনৈতিক সমতা মাত্র ৩৯.৮ শতাংশ। অর্থাৎ ভারতে কোনও পুরুষ যদি কাজ করে ১০০ টাকা আয় করেন, তবে সেই তুলনায় কোনও মহিলা গড় আয় করেন ৩৯.৮ টাকা। জেন্ডার পে গ্যাপ-এর ক্ষেত্রে ১৪৬টি দেশের তালিকায় ভারত ১২৯ নম্বরে। ইকনমিক অ্যান্ড পলিটিকাল উইকলি প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, শুধুমাত্র মহিলা দ্বারা পরিচালিত একটি পরিবারে পিঙ্ক ট্যাক্স বা গোলাপি করের জন্য সেই পরিবারের খরচ একটি পুরুষ পরিচালিত পরিবারের তুলনায় প্রায় ৩০০ ডলার বেশি হয়।
তাহলে এই পিঙ্ক ট্যাক্স বা গোলাপি কর থেকে বাঁচতে উপায় কী?
কিনতে গিয়েছেন একটি টি-শার্ট। পুরুষদের একই রকমের টি-শার্টের দাম হয়তো দেখছেন কম, সেটা কিনুন। জেন্ডার নিউট্রাল জিনিসপত্র কিনুন। কিনতে গিয়েছেন নিজের কন্যাসন্তানের প্রিয় গোলাপি রঙের খেলনা, ঘরে ফিরুন পুত্রসন্তানের জন্য তৈরি নীল রঙের বানানো খেলনা নিয়ে। এভাবে বাঁচতে পারেন পিঙ্ক ট্যাক্স থেকে, তেমনই ভাঙতে পারবেন নীল ও গোলাপি রঙের বাইনারিকেও। কেনই বা মহিলাদের জন্য পিঙ্ক বা গোলাপি আর পুরুষদের জন্য নীল? মহিলারা কেন পুরো রামধনু রঙের হকদার নয়?
কিন্তু প্রশ্ন হল নারীরাই সবসময় সমস্ত বৈষম্যের শিকার হবে কেন?
ভারত সহ গোটা বিশ্বেই রাজনৈতিক থেকে অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ করেন পুরুষরাই আর তা করেন কর্পোরেটদের স্বার্থরক্ষা করেই। পুরুষতন্ত্র আর পুঁজিবাদের সম্পর্ক মিথোজীবীদের মতো। তাই চুলোয় যাক নারী স্বার্থ, নারী সুরক্ষা আর জেন্ডার পে গ্যাপের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে লিঙ্গ নিরপেক্ষ নীতি নির্ধারণ।
ততদিন পিঙ্ক ট্যাক্স থেকে বাঁচতে কিনে নিন পুরুষদের ডিওডরান্ট কিংবা পুরুষদের লিপ বাম। দুটোরই দাম মহিলাদের জন্য বানানো বাম বা ডিওডরান্টের থেকে কম।
অথবা নারীরা জ্বলে উঠুন দ্রোহে। আন্দোলন ছাড়া পৃথিবীর ইতিহাসে কিচ্ছুটি পায়নি নারী। তাই আরেকবার। বাধ্য করতে হবে ক্ষমতার অলিন্দে পুরুষতান্ত্রিকতার শিখরে বসে পা দোলানো পুরুষ নীতি নির্ধারকদের। নাঙ্গেলি তো আছেনই! যাঁর প্রতিবাদে স্তন কর তুলে দিতে বাধ্য হন রাজা।
বা যেমনটি কবি মায়া অ্যাঞ্জেলো, পৃথিবীর সমস্ত নারীকে দিয়ে গেছেন বঞ্চনা থেকে মুক্তির পাঠ তাঁর Nonetheless I Rise কবিতায়…
‘লজ্জানত ইতিহাসের কুঁড়েঘরগুলি ভেঙেচুরে
আমি উঠে দাঁড়াই
যন্ত্রণার শেকড়ে গেঁথে যাওয়া অতীত থেকে
আমি উঠে দাঁড়াই
লাফিয়ে ওঠা কৃষ্ণ-সাগর আমি তো বিপুল
ফুলে ওঠা আর ফেঁপে ওঠা এক জোয়ারে ফুল
সন্ত্রাসে-ত্রাসে কম্পিত যত রাত্রিগুলিকে ক’রে ভন্ডুল
উঠে দাঁড়াই আমি।
অভূতপূর্ব আর বিস্ময়করভাবে স্বচ্ছ এই সন্ধ্যার ভেতর থেকে
উঠে দাঁড়াই আমি।
পূর্বপূরুষের উপহারগুলি একসাথে ক’রে
সমস্ত দাসের স্বপ্নগুলিকে মুঠোতে ধ’রে
উঠে দাঁড়াব,
উঠে দাঁড়াব,
উঠে দাঁড়াবই।
।। তবু উঠে দাঁড়াব।।’ (অনুবাদ : রহমান হেনরী)
নিপাত যাক পিঙ্ক ট্যাক্স।
(লেখক সাহিত্যিক)
