প্রকৃত লেখক, শিল্পীদের বেঁধে রাখতে পারে না পুরস্কারের শৃঙ্খল

প্রকৃত লেখক, শিল্পীদের বেঁধে রাখতে পারে না পুরস্কারের শৃঙ্খল

শিক্ষা
Spread the love


 

  • অংশুমান কর

কোনও পুরস্কারই অরাজনৈতিক নয়। সম্ভবত কোনওদিনই ছিল না। কিন্তু ভারতীয় সিনেমার জাতীয় পুরস্কারগুলি ঘোষিত হওয়ার পর পুরস্কারের রাজনীতিকরণ নিয়ে জোর কথাবার্তা শুরু হয়েছে দেশজুড়ে। পরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রী ও সিনে-সমালোচকদের একদল মনে করছেন, এবার যা হয়েছে তাতে বোঝাই যাচ্ছে যে, নির্বাচকমণ্ডলী এক কৌশলী রাজনৈতিক ব্যালেন্সের খেলা খেলেছেন পুরস্কার নির্বাচন করতে গিয়ে। এই কৌশলের ফলে, একদিকে যেমন তথ্যগতভাবে ভুল এবং বিপজ্জনকভাবে প্রচারমুখী সিনেমা ‘দ্য কেরালা স্টোরি’ (২০২৩)  দুটি জাতীয় পুরস্কার জিতে নিয়েছে— যার মধ্যে একটি শ্রেষ্ঠ পরিচালনার জন্য— তেমনই এই সিনেমাটি পুরস্কার পেলে সমালোচিত হবে এই আশঙ্কায় সমালোচকদের চুপ করাতে অন্য একটি মালয়ালম ছবি উল্লোঝুককু (২০২৪)-কেও দুটি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এই সিনেমাটির মূল বিষয় হল পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর মধ্যে শাশুড়ি-বৌমার সম্পর্ক। ‘দ্য কেরালা স্টোরি’-র মতো একটি ইসলাম-বিদ্বেষী সিনেমা পুরস্কৃত হলে সমালোচিত হতে পারে এই আশঙ্কাতেই, আবার অনেকে বলছেন, এক মুসলিম তারকা, শাহরুখ খানকে, ৩৩ বছরের অভিনয় জীবনে প্রথমবার জাতীয় পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। খেলা হয়েছে ব্যালেন্সের খেলা। মুশকিল হল, এইভাবে দেখতে গেলেও একটি সমস্যা তৈরি হয় বৈকি! শাহরুখ খানের মতো একজন অভিনেতাকেও তখন শুধুমাত্র তাঁর ধর্মীয় পরিচয়েই সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়। পুরস্কার এভাবেই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে যায় রাজনীতির সঙ্গে।

সম্প্রতি অবশ্য বিশ্বজুড়েই বিশেষ করে সিনেমা জগতে যে সমস্ত পুরস্কার দেওয়া হয়, সেই পুরস্কার প্রদানকারী সংস্থাগুলিকে সহ্য করতে হচ্ছে জনমতের চাপ। আগেও এটা ছিল, কিন্তু এতখানি ছিল না। আগে যেসব সিনেমা পুরস্কার প্রভাবশালী ও গ্ল্যামারাস ছিল, সেগুলোর জৌলুস এখন অনেকটাই স্তিমিত। আগে যেখানে জনপ্রিয় পুরস্কারগুলোর ভিত্তিতে সিনেমা নিয়ে জনমত গঠিত হত, এখন সেখানে জনমতই উলটে পুরস্কার কমিটিগুলিকে প্রভাবিত করছে। এর প্রধান কারণ আমাদের জীবনজুড়ে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম আর এক্স হ্যান্ডেল (সাবেক টুইটার)-এর দাপাদাপি। একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ২০২৪ সালে এমিলিয়া পেরেজ ছবিতে অভিনয়ের জন্য কার্লা সোফিয়া গাসকন কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতেছিলেন। অস্কারে ছবিটি ১৪টি বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছিল, কিন্তু ছবিটি মনোনয়ন পাওয়ার পরেই গাসকনের পুরোনো বর্ণবৈষম্যমূলক ও ইসলামবিদ্বেষী টুইট প্রকাশ্যে আনা হয়। প্রবল জনমত গঠিত হয় গাসকনের বিরুদ্ধে। মনে করা হয় যে, এ কারণেই শেষপর্যন্ত ছবিটি কেবল দুটি অস্কারই জিততে পারে।

আমাদের দেশে পুরস্কারের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগ খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে মাঝে মাঝেই বিভিন্ন সরকারি পুরস্কার ঘোষিত হলে। পদ্ম পুরস্কারের রাজনীতিকরণ নিয়ে বহুদিন ধরেই অভিযোগ তোলে যখন যে দল বিরোধী আসনে থাকে, তারাই। যেমন, গুগলের সিইও সুন্দর পিচাই এবং মাইক্রোসফটের সিইও সত্য নাদেলাকে পদ্ম পুরস্কার প্রদান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কারণ তাঁরা সরাসরি দেশের জন্য কিছুই করেননি। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময় উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন যিনি সেই কল্যাণ সিংকে পদ্ম সম্মান দেওয়া নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। একইভাবে রাজ্য সরকার যে সমস্ত বঙ্গ পুরস্কার দিয়ে থাকে তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে হামেশাই। প্রশ্ন ওঠে মহানায়ক পুরস্কার দেওয়া নিয়েও। শাসক-ঘনিষ্ঠ না হলে এই পুরস্কারগুলি পাওয়া যায় না, অভিযোগ এমনটাই। অবশ্য দেশে কেন্দ্রীয়ভাবে বিরোধীদের পুরস্কার দেওয়া হলে বেশ কয়েকবার প্রত্যাখ্যানও করেছেন বিরোধীরা। যেমন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যই পদ্ম সম্মান গ্রহণ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। আরও বড় স্তরে পুরস্কার গ্রহণে অসম্মতির কথা উঠলে বলতেই হয় জা জঁ পল সার্ত্রর নাম। আজীবন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এই চিন্তক ফিরিয়ে দিয়েছিলেন নোবেল পুরস্কার!

বলা বাহুল্য, প্রদান করা পুরস্কার মাঝে মাঝেই শাসকদের অশান্তির কারণও হয়ে ওঠে। কুশাসনের ফলে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার প্রেক্ষিতে পুরস্কার ফেরত দেওয়ার ঘটনা গোটা বিশ্বেই একাধিক। আমাদের দেশ বা রাজ্যও তার ব্যতিক্রম নয়। সারা দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপরে অত্যাচারের প্রেক্ষিতে একাধিক লেখক যেমন সাহিত্য অাকাদেমি পুরস্কার ফেরত দিয়েছিলেন কয়েক বছর আগে। গত বছর রাজ্যে আবার আরজি কর কাণ্ডের প্রেক্ষিতে পুরস্কার ফেরত দিয়েছিলেন একাধিক বিশিষ্ট বাঙালি লেখক, শিল্পী। পুরস্কার ফেরত দেওয়ার অস্বস্তির হাত থেকে বাঁচবার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার মাঝে চিন্তাভাবনা করছিল যে, পুরস্কার গ্রহণ করার সময় একজন প্রাপককে মুচলেকা দিতে হবে যে, তিনি কোনও অবস্থাতেই পুরস্কার ফেরত দিতে পারবেন না। নানা অংশের বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদের ফলে শেষপর্যন্ত অবশ্য পুরস্কারকেন্দ্রিক এই মুচলেকার সংস্কৃতি সরকার চালু করতে পারেনি। এ প্রসঙ্গেই উল্লেখ করা দরকার যে, মাঝে মাঝে কোনও কোনও বিশিষ্ট ব্যক্তিকে প্রদান করা কোনও কোনও পুরস্কার ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বানও আজকাল শোনা যায় সমাজমাধ্যমে। বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যেমন নেটিজেনদের একটা বড় অংশ দাবি তুলেছিল মুহাম্মদ ইউনূসকে দেওয়া নোবেল শান্তি পুরস্কার ফিরিয়ে নিতে।

কিন্তু কথা হচ্ছে, পুরস্কার নিয়ে এতখানি চর্চা হয়ই বা কেন? একটা কারণ অবশ্যই এই যে, একটি বড় পুরস্কার প্রাপককে অনেক মানুষের সামনে এনে ফেলে। তাঁদের কর্মক্ষেত্রও প্রসারিত হয়। দুটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে দুজন ভারতীয় লেখিকা বুকার পুরস্কার পেয়েছেন। একজন গীতাঞ্জলিশ্রী এবং অপরজন বানু মুস্তাক। পুরস্কার পাওয়ার পরেই বাঙালি পাঠকরা এঁদের বই কিনে পড়তে শুরু করেছেন। হুহু করে এঁদের কাজ অনূদিত হতে শুরু করেছে বাংলায়। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, বাংলা সাহিত্যিক অমর মিত্র একটি ছোট গল্পের জন্য পৃথিবী বিখ্যাত হেনরি পুরস্কার পাওয়ার পরে তাঁরও একাধিক বই ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হতে শুরু করেছে। কাজেই, পুরস্কারের একটা গুরুত্ব তো থাকেই। এ কারণেই থাকে পুরস্কার পাওয়ার জন্য নানা ধরনের লবি এবং কৌশল অবলম্বন করার অসৎ ইচ্ছাও।

পুরস্কার পাওয়ার জন্য অসততা যে কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে তার একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার একজন অ্যাবোরিজিনাল ঔপন্যাসিক ওয়ান্ডা কুলমাট্রির আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘মাই ওন সুইট টাইম’ (১৯৯৪) প্রকাশিত হওয়ার পর সমালোচকদের প্রশংসা পায়। কিছুদিনের মধ্যেই তা ডবি লিটারারি অ্যাওয়ার্ড সহ একাধিক মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে সম্মানিত হয়। কিন্তু পরে জানা যায়, ওয়ান্ডা কুলমাট্রি আসলে অ্যাবোরিজিনাল লেখকই নন। এই নামের আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন লিওন কারম্যান নামের এক শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি। তিনি দাবি করেন, অস্ট্রেলিয়ার প্রকাশনা জগতে শ্বেতাঙ্গ পুরুষ লেখকদের প্রতি বৈষম্যের প্রতিবাদে তিনি একজন অ্যাবোরিজিনাল নারী লেখকের ছদ্মনাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর ইঙ্গিত ছিল খুব স্পষ্ট। সাহিত্যে আদিবাসীদের জীবন সারা পৃথিবীতেই একটা সময়ের পর থেকে প্রকাশকদের মুনাফা করার মূলধন হয়ে ওঠে। সাহিত্যের গুণগত মান অপেক্ষা লেখকের পরিচয়ই হয়ে উঠতে থাকে ক্রমশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই অ্যাবঅরিজিনাল মহিলাদের আত্মজীবনীমূলক রচনা অস্ট্রেলিয়ায় প্রকাশ পেতে থাকে একের পর এক। কারম্যান এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলেন। অনেকে অবশ্য বলেন যে, তাঁর আসল উদ্দেশ্য ছিল অল্প সময়ে দ্রুত খ্যাতিমান হয়ে ওঠা।

একটি কথা অবশ্যই এই খ্যাতির প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো। একটি ছবি মাঝে মাঝেই সমাজমাধ্যমে আজও ভাইরাল হয়ে পড়ে। জেমস জয়েসের বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস ‘ইউলিসিস’ পাঠ করছেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী মেরিলিন মনরো। পোস্টটি এতখানি ভাইরাল হওয়ার কারণ কী? কারণ একটাই। পৃথিবীর একটি বড় অংশের পাঠকই মনে করেন ইউলিসিস এমন একটি উপন্যাস যা পড়ে শেষ করে ওঠা যায় না, তা নাকি এতই কঠিন! আর ছবিটি দেখায় যে, মনরো প্রায় শেষ করে এনেছেন উপন্যাসটি। এই উপন্যাসটি এতখানিই জনপ্রিয় যে, কল্পনাই করা যায় না যে, একজন পড়ুয়া ইউলিসিস উপন্যাস বা জেমস জয়েসের নাম জানেন না। জয়েস কিন্তু নোবেল পুরস্কার পাননি। নোবেল পুরস্কার না পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের তালিকাটি কিন্তু বেশ বড়ই। এই তালিকায় চলে আসেন টলস্টয়, বর্হেস, ইবসেন, মার্ক টোয়েন, ফ্রস্ট, চেকভ, লোরকার নাম। এঁদের নোবেল পুরস্কার না পাওয়া প্রসঙ্গে মনে পড়ে, লোরকাকে নিয়ে লেখা ‘কবির মৃত্যু’ কবিতাটি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় শেষ করেছিলেন লোরকার মুখে এই কথাটি বসিয়ে, ‘বলেছিলুম কিনা, আমার হাত শিকলে বাঁধা থাকবে না!’ সত্যিই কিছু কিছু লেখক, শিল্পী তাঁদের কাজে এতই বড় হয়ে ওঠেন যে, পুরস্কারের শৃঙ্খল শেষমেশ তাঁদের বেঁধে রাখতে পারে না!

(লেখক কবি ও অধ্যাপক)   



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *