কলকাতার উপরের পাটির দাঁতগুলি বাঁধানো। কলকাতার নিচের পাটির দাঁতগুলি বাঁধানো নয়, এবড়োখেবড়ো। এ কথা নাকি ‘সকলেই জানে’। এইভাবে শুরু হয়েছে নবারুণ ভট্টাচার্যের বিখ্যাত ছোটগল্প ‘চাঁদের চোয়াল’। নবারুণ লিখে চলেন– নৈশভোজের পরে এই কলকাতা নাকি উপরের পাটির দাঁত ‘আকাশের কাচের বাটিতে’ ডুবিয়ে রাখে। ‘কলকাতার লোকেরা তারই নাম দিয়েছে চাঁদ’।
গল্পটি বলা বাহুল্য উপরের পাটির দাঁত নিয়ে নয়। তাহলে? কলকাতার কোনও একটি বাস স্টপ লেখকের ফোকাস। সেখানে বিশাল একটি হলদে-কালো হোর্ডিং রয়েছে বাস স্টপের শেডের পিছনে। দু’জন ‘মার্ডারার’ ওই শেডের তলায় উবু হয়ে বসেছিল। অল্প বৃষ্টি। বিশ্রী গুমট। ওদের সঙ্গে ছিল গামছায় জড়ানো দুটো কাতান আর ভোজালি। শেষ মিনিবাসে লোকটা আসে। এই দু’জন মার্ডারার খেয়াল করেছে তা। অপেক্ষা করতে করতে মার্ডারার দু’জন ভাবে– লোকটি আসবে তো? শেষ মিনিবাস না ক্যানসেল হয়ে যায়! সেই আশঙ্কা অসত্য করে লোকটি আসে। একটি ম্যাটাডোর ঠিক করা ছিল আগে থেকে। সেটি গিয়ে মিনিবাস থেকে নামা লোকটাকে ধাক্কা মারে। এবং এরপর ‘মার্ডার শুরু হয়ে যায়’। কাতান কোপানোর জন্য। ভোজালি ছাল-চামড়া, মাংস-মেদ ভেদ করে ভিতরে ঢোকার জন্য। নিজের-নিজের কাজ করতে থাকে।
আরও পড়ুন:
বিজেপি শাসিত রাজ্যে প্রকাশ্য রাজপথে লাইসেন্স ছাড়া মাংস কেটে বিক্রি না-করার ফরমানের সঙ্গে আবার জড়িয়ে রয়েছে আমিষ-নিরামিষ খাদ্যাভ্যাসের মেরুকরণকে চওড়া করার রাজনীতি।
আরও পড়ুন:
এই খুন-পর্ব যখন সাধিত হচ্ছে, তখনই ঘটল আসল মজার কাণ্ড! একটি পুলিশ ভ্যান অকুস্থলে ব্রেক কষে থামল। কাতান থমকে যায়। ভোজালিও নিশ্চুপ। পুলিশ ভ্যান থেকে নেমে ইনস্পেক্টর বলেন– ‘কি লেখা, ওটা?’ নিয়ন আলো দপদপ করছিল। তাতে অবশ্য পড়তে কষ্ট হয় না, লেখা রয়েছে– ‘প্রকাশ্য রাস্তায় মাংস কাটা ও বিক্রি করা আইনত অপরাধ। কলকাতা পুরসভা’। অর্থাৎ এ ফরমান জারি করেছে পুরসভার মহানাগরিক। ইনস্পেক্টর বিরক্ত হয়ে তড়পান: ‘কোনো সিভিক সেন্স নেই!’ পুলিশ ভ্যান চলে যাওয়ার পরে কাতান ও ভোজালি, যেন লজ্জিত হয়েই, আস্তে আস্তে শেষ মিনিবাসে আসা নিহত লোকটার নিথর দেহ টানতে টানতে বাস স্টপের পিছনের অন্ধকারে নিয়ে চলে যায়। বাদবাকি যা কাজ, ওখানে হবে।


এ-গল্প পড়ে শিরদাঁড়া দিয়ে ঘামের স্রোত বয়ে যায় যেন। আইনি নির্দেশ কীভাবে নিছক নির্দেশে পরিণত হতে পারে, আইনের থেকে কী করে সিভিক সেন্স আলাদা হয়ে যেতে পারে, পুলিশের কর্তব্যবোধ ও মার্ডারারের টাকা নিয়ে কাজ করার আনুগত্য কেমন করে ঘোলাটে সীমায় লুকোচুরি খেলতে পারে, নবারুণ যেন পাঠকের চোখ চিরে দেখিয়ে দেন। প্রকাশ্য রাজপথে যত্রতত্র মাংস কেটে বিক্রি করার মধ্যে রয়েছে বাজারি অভ্যাস। কোথাও কোথাও তা হয়ে ওঠে নৃশংসতার বিজ্ঞাপন। শিশুদের মনে বিরূপ আঘাত হানে। তবে বিজেপি শাসিত রাজ্যে প্রকাশ্য রাজপথে লাইসেন্স ছাড়া মাংস কেটে বিক্রি না-করার ফরমানের সঙ্গে আবার জড়িয়ে রয়েছে আমিষ-নিরামিষ খাদ্যাভ্যাসের মেরুকরণকে চওড়া করার রাজনীতি। নৃশংসতা কমাতে এমন বিভাজন কাম্য নয়!
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
