রাজনীতি সবসময়ই সম্ভাবনার শিল্প। বিহারে সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা ভোটে ভোট কুশলী প্রশান্ত কিশোরের (পিকে) দল জন সুরাজ পার্টিকে ঘিরে কৌতূহল ছিল। নরেন্দ্র মোদি থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, পিকে’র পরামর্শে ক্ষমতায় আসীন হয়েছেন অনেকে। পরামর্শ দিয়ে অন্যকে সাফল্যের মুখ দেখালেও নিজের দলের বেলায় পুরোপুরি ব্যর্থ হলেন তিনি।
নিরঙ্কুশ এনডিএ’র দাপটে আরজেডি, কংগ্রেস, বামেদের সঙ্গে উড়ে গিয়েছে পিকে’র দলও। পরাজিত হলেও অবশ্য লড়াই ছাড়তে নারাজ প্রশান্ত কিশোর। ভোটে পর্যুদস্ত হওয়ার চারদিন বাদে সাংবাদিক বৈঠকে জন সুরাজ পার্টির প্রধান জানিয়ে দিয়েছেন, নতুন সরকার তাদের প্রতিশ্রুতিগুলি ঠিকমতো পালন করছে কি না, সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখা হবে তাঁর দলের কাজ।
ভোটপর্বে পিকে একাধিক জনসভা, পথসভা করেছেন, প্রচারমাধ্যমে প্রচুর সাক্ষাত্কার দিয়েছেন। সবেতেই তাঁর দাবি ছিল, ১৫০-এর কম আসন পাওয়ার অর্থ হবে তাঁর কাছে পরাজয়। সেই পরাজয় তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন। কিন্তু তিনি বিজেপি-জেডিইউ বনাম আরজেডি-কংগ্রেসের বাইনারি থেকে বিহারের রাজনীতিকে মুক্ত করার সম্ভাবনার আলোটি জ্বালানোর চেষ্টা করেছেন।
বিহারে এবার পিকে’র দল ভালো ফল করলে অবধারিতভাবে তৃতীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করত। ভোটযুদ্ধে পরাজিত হলেও কিন্তু জন সুরাজের তৃতীয় শক্তি হিসেবে উঠে আসার সম্ভাবনার বীজটি নষ্ট হয়নি। ভোটের ফল অনুযায়ী, বিহারের যে ২৩৮টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল তারা, তার ২৩৬টিতেই জামানত জব্দ হয়েছে। ১২৯টি আসনে জন সুরাজের প্রার্থীরা তৃতীয় স্থানে ছিলেন, একটি মাত্র আসনে দ্বিতীয় হয়েছেন।
ভোট প্রচারে পিকে উচ্চগ্রামে যে সমস্ত দাবি করেছিলেন সেগুলির একটিও পালন করতে পারেনি জন সুরাজ পার্টি। ভোট কুশলী সেকথা মেনে জানিয়েছেন, তাঁরা মানুষকে বোঝাতে পারেননি। তাই মানুষ তাঁদের ওপর ভরসা রাখতে পারেননি। এর দায় সম্পূর্ণভাবে শুধুমাত্র তাঁর। এরপরই প্রশান্ত কিশোর জানিয়েছেন, ২০ নভেম্বর নীতীশ কুমারের দশমবার গান্ধি ময়দানে মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার দিন তিনি পশ্চিম চম্পারণের গান্ধি আশ্রমে অনশনে বসবেন।
পিকে’র এমন আত্মবিশ্বাসী বার্তার নেপথ্যে তৃতীয় শক্তি হিসেবে উঠে আসার বাসনা প্রবল। আসন ও ভোট শতাংশের হিসেবে জেডিইউ এবার বিজেপির ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। নীতীশ কুমারের গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নাতীত। কিন্তু তাঁর পর সেই পদে কে? অনেকে বলাবলি করছেন, নীতীশের ছেলে নিশান্তকে সক্রিয় রাজনীতিতে আনার চেষ্টা চলছে।
যদিও সেই সম্ভাবনা যথেষ্ট ক্ষীণ। কারণ ছেলেকে সামনে আনলে নীতীশের এতদিনের পরিবারতন্ত্র-বিরোধী রাজনীতির ভিতটাই ধসে যাবে। নীতীশের অন্য কোনও বিকল্প মুখ আপাতত জেডিইউয়ে নেই। সম্রাট চৌধুরী, বিজয়কুমার সিনহা, নিত্যানন্দ রাইদের নিয়ে বিজেপি স্বপ্ন দেখছে ঠিকই। কিন্তু এই নেতাদের কেউ নীতীশের মতো জনপ্রিয় নন। বরং খানিকটা সম্ভাবনা রয়েছে এলজেপি (রামবিলাস) নেতা চিরাগ পাসোয়ানকে ঘিরে।
অপরদিকে, তেজস্বী যাদবকে আরজেডি নেতা হিসেবে মেনে নিলেও মহাজোটের সমস্ত শরিকের যে তাতে সায় নেই, সেটা পরিষ্কার। পুত্রকে নিয়ে লালুর সংসারেও অশান্তি চরমে। এই অবস্থায় নতুন বিকল্প হিসেবে প্রশান্ত কিশোর যদি নিজেদের প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে আগামীদিনে বিহারের রাজনীতিতে তাঁর জাঁকিয়ে বসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
জাতপাত, জঙ্গলরাজ, লাগামছাড়া দুর্নীতির পাশাপাশি টাকা ছড়িয়ে ভোট কেনার অভিযোগে অভ্যস্ত বিহারকে প্রশান্ত কিশোর নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছেন। অনেকটা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ধাঁচে তিনি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলছেন। তাতে আশা জাগলেও কয়েকটা প্রশ্ন থেকেই যায়। ভারতের রাজনীতিতে, তৃতীয়, চতুর্থ যে শক্তিই তৈরি হোক না কেন, শেষপর্যন্ত তাদের হয় কংগ্রেস নয়তো বিজেপির ছত্রছায়ায় থাকতে হয়। অকংগ্রেসি বা অবিজেপি জোট অতীতে সফল হয়নি।
ফলে প্রশান্ত কিশোরের চেষ্টা বিহারের মাটিতে দাগ কাটবে কি না, সেটা লাখ টাকার প্রশ্ন।
