- গৌতম সরকার
তৃণমূলে বড্ড অসুখ। উত্তরবঙ্গে প্রায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত। আর কেউ নয়, খোদ দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক কবুল করছেন। কোচবিহার থেকে মালদা পর্যন্ত বুথ স্তরে দলের এই নড়বড়ে অবস্থার জন্যই যে গত কয়েকটি নির্বাচনে উত্তরের ৮ জেলায় তৃণমূল হোঁচট খাচ্ছে, তা মেনে নিচ্ছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। উন্নয়নে পিছিয়ে থাকলে কী হবে, রাজনীতিতে উত্তরবঙ্গের কদর হটকেকের মতো। সব দলেরই নজর তোর্ষা থেকে গঙ্গার মধ্যবর্তী ভূখণ্ডে।
বিজেপি প্রমাণ করেছে, উত্তরবঙ্গ পাশে থাকলে বাংলায় এগিয়ে থাকা যায়। উত্তরবঙ্গ যে পদ্ম শিবিরের দুধেল গাই। ভোটে আসন দখলের নিরিখে যেটুকু সাফল্য, তা এসেছে তো কোচবিহার থেকে মালদা পর্যন্ত ভূখণ্ডের কারণে। তৃণমূলও জানে উত্তরে এগিয়ে থাকলে, ক্ষমতার পুনর্দখলে নিশ্চয়তা বাড়বে। তবে সবপক্ষের মুখে উন্নয়নের কথা কম, দখলদারির লক্ষ্য বেশি স্পষ্ট।
তৃণমূলের খোদ সেকেন্ড-ইন কমান্ড উত্তরবঙ্গে দলের অবস্থা নিয়ে আক্ষেপ করার সময়ই উত্তরবঙ্গে এসেছেন মোহন ভাগবত। তিনদিনের সফরে শিলিগুড়িতে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধানের মতো হাইপ্রোফাইল পদাধিকারীর এক জায়গায় তিনদিনের কর্মসূচিতে স্পষ্ট উত্তরবঙ্গে কতটা জোর দিচ্ছে গেরুয়া শিবির। কাগজে-কলমে উত্তরের ৫৪ বিধানসভা আসনের মধ্যে ২৯ খানায় জিতেছিল বিজেপি। আলিপুরদুয়ারের বিধায়ক সুমন কাঞ্জিলাল তৃণমূলে যোগ দেওয়ায় এবং ধূপগুড়িতে উপনির্বাচনে বিজেপি হেরে যাওয়ায় সেই সংখ্যা এখন ২৭।
ফলে সরাসরি উত্তরের অর্ধেক আসন পদ্ম শিবিরের দখলে। কোচবিহার ও মালদা দক্ষিণ বাদ দিলে সব লোকসভা আসনে পদ্ম ফুটে আছে। অথচ তৃণমূলের দাপট এমনই যে, এসআইআর-এর সময় বিজেপি’র বিএলএ-রা ভয়ে গুিটয়ে ছিলেন। শুভেন্দু অধিকারীর কনভয় কোচবিহারে আক্রান্ত হলেও কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো প্রতিবাদ সংগঠিত হয় না তেমন। নাগরাকাটায় মালদা উত্তরের সাংসদ খগেন মুর্মুর নাক-মুখ ফাটিয়ে দেওয়ার উত্তাপে নিজেকে সেঁকে নিতে ব্যর্থ পদ্ম-চাষির দল।
যে সংগঠন বুথ স্তরে ফোঁপরা হয়ে আছে বলে খোদ অভিষেক কবুল করছেন, তা নিয়ে কিন্তু অবাধে দাদাগিরি চালিয়ে যাচ্ছে তৃণমূল। জেলায় জেলায় তৃণমূলের গোষ্ঠীকোন্দলে মানুষ তিতিবিরক্ত। দুর্নীতি, বেকারত্ব ইত্যাদি কারণে ভয়ানক জনরোষ। নেতাদের একাংশের ঔদ্ধত্য মানুষের সহ্যশক্তিকে ভেঙে দিচ্ছে। রাজবংশী, আদিবাসী, নেপালি ইত্যাদি জনগোষ্ঠীগত সমীকরণেও ভোটের অঙ্কে দলটা পিছিয়ে।
নস্যশেখ শুধু তৃণমূলের জনগোষ্ঠীগত নিশ্চিত ভোটব্যাংক। তুলনায় বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও জন অসন্তোষকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ বিজেপি। আন্দোলন যেন দলটার অভিধানে নেই। একা শিলিগুড়ির বিধায়ক শংকর ঘোষ সংবাদমাধ্যমে বিবৃতিতে, ভিডিও পোস্টে গরম গরম বয়ান দেন। উত্তরের বাকি ২৬ বিধায়কের সক্রিয়তা এত কম চোখে পড়ে যে, মাঝে মাঝে তাঁদের নামও মনে থাকে না।
এত গুটিয়ে থাকা সত্ত্বেও বিজেপির উত্তরবঙ্গে সাফল্যের পেছনে আছে আসলে আরএসএস। জেলায় জেলায় সংঘের শাখাগুলির প্রকাশ্য ও গোপন তৎপরতা ঠুঁটো জগন্নাথ বিজেপিকে সুবিধা করে দিয়েছে। গঙ্গাপাড়ের এক সাংসদ ঘরোয়া আলোচনায় স্বীকার করলেন, নির্বাচনি প্রস্তুতি বা প্রচারের জন্য তাঁরা এখন বাংলার দুই পর্যবেক্ষক ভূপেন্দ্র যাদব ও বিপ্লব দে’র নির্দেশিকার অপেক্ষায়।
তৃণমূল কিন্তু এসআইআর, উন্নয়নের পাঁচালি, প্রশাসনিক বৈঠক ইত্যাদি সবকিছু দিয়ে নির্বাচনি প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। মোহন ভাগবতের তিনদিনের উত্তরবঙ্গ সফর যেন বিজেপির এই ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যেই। শুধু জনগোষ্ঠীগত সমীকরণে ভোটের অঙ্কে চিঁড়ে নাও ভিজতে পারে মনে করে, আরএসএসের পরিকল্পিত নজরে এখন যুব প্রজন্ম। উত্তরে বরাবরই বিজেপির ভোটব্যাংক তৈরি করে দেওয়ার দায়িত্বটা নিয়ে থাকে আরএসএস। সেই কাজ এগিয়ে দিতে এবার স্বয়ং ভাগবত উত্তরবঙ্গে।
যুবসমাজের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রভাবশালীদেরও কাছে টানতে ভাগবতের এই সফর। শিলিগুড়িতে চিকিৎসক, অধ্যাপক, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব যাঁরা সংঘ প্রধানের বৈঠকে ছিলেন, তাঁদের কেউ তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ, কেউ বাম মনোভাবাপন্ন। তাঁদেরও খোলা আহ্বান রেখে গিয়েছেন সরসংঘচালক। যদিও তাঁর কথা যুবসমাজকে কতটা আকৃষ্ট করবে, তা বলার সময় আসেনি।
রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে তরুণরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তিনি যে উত্তর দিয়েছেন, তা নবীন প্রজন্মের মনে দাগ না কাটতেই পারে। তরুণরা চায় চটজলদি সমাধান। ভাসা ভাসা কথা তাদের ঘোর অপছন্দ। ভাগবতের বক্তব্য কিন্তু ধরি মাছ না ছুঁই পানি। সংঘের কাজ বাংলার আইনশৃঙ্খলা সমস্যা কেন্দ্রের নজরে আনা- ভাগবতের এই বক্তব্য অনেকটা আগুন লেগেছে, এখন জলের জন্য আগে পুকুর খোঁড়ো, তারপর আগুন নেভাও গোছের।
এক তরুণ বাংলায় রাষ্ট্রপতি জারির প্রসঙ্গ এনেছিলেন। তাতেও সেই গোল গোল জবাব- সংঘ রাষ্ট্রপতি শাসনের কথা বলে না। সংঘ কেন্দ্রকে বলতে পারে, বাংলার আইনশৃঙ্খলার অবস্থা খারাপ। তারপর যা করার কেন্দ্র করবে। তবে সর্বরোগহর যে বার্তা ভাগবত দিয়েছেন, তা সংঘ সবসময় বলে থাকে। যেমন, হিন্দুত্ব জাগলে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিংবা হিন্দুত্বকে শক্তিশালী করতে সুস্থ সমাজ গড়তে হবে। অথবা সমাজের পাশে দাঁড়ালে হিন্দু সংগঠন শক্তিশালী হবে।
বাংলায় শুধু হিন্দুত্বে অবশ্য তৃণমূলের মোকাবিলা কঠিন হয়ে গিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও হিন্দুত্বের অস্ত্রে শান দিয়ে জগন্নাথধাম প্রতিষ্ঠা করেছেন দিঘায়। শিলিগুড়িতে মহাকাল মন্দির, কলকাতায় দুর্গাঙ্গন বানাতে চলেছেন। যা আরএসএসের অ্যাজেন্ডাই বলা যায়। ফলে যে প্রশ্নটা বড় হয়ে ওঠে, তা হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী থাকলে আরএসএসের সমস্যার কোনও কারণ আছে কি! অ্যাজেন্ডা অভিন্ন হলে মানুষ খামোখা কেন বিকল্প খুঁজবে! উত্তরবঙ্গের মাটি তাই স্থিতাবস্থার সাক্ষী হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না!
The publish পদ্মের বৈতরণি পারে নতুন মোহন-ছক appeared first on Uttarbanga Sambad.
