রাষ্ট্র এবং নাগরিকের সম্পর্ক সবসময় মসৃণ থাকে না। তবে সেজন্য রাষ্ট্র এবং নাগরিকের পরস্পরকে শত্রু হিসেবে দেখা উচিত নয়। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিহারে যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ ভোটারদের ধন্দে ফেলে দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নয়া নির্দেশে আঠারোর্ধ্ব নাগরিকদের ভোটদানের অধিকার টিকে থাকবে কি না, সেটা এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।
বিরোধীরা ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার। সুপ্রিম কোর্টে মামলাও হয়েছে। পাটনার রাস্তায় বিক্ষোভও দেখিয়েছেন রাহুল গান্ধি, তেজস্বী যাদবরা। অন্যদিকে তৃণমূলের আশঙ্কা, বিহারে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বৈধ ভোটারদের ছাঁটাইয়ের এই চেষ্টা আগামীদিনে পশ্চিমবঙ্গেও হতে পারে। বিষয়টিকে সামনে রেখে বাংলায় এনআরসি করার অভিযোগও তুলছে তৃণমূল।
অনুপ্রবেশের অভিযোগে দিনহাটার বাসিন্দা উত্তম কুমার ব্রজবাসীকে অসম সরকার এনআরসি নোটিশ পাঠানোয় এতে আরও ঘৃতাহুতি পড়েছে। রাজ্যের শাসকদল, খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরব হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ হোক বা বিহার, যে কোনও রাজ্যের বৈধ বাসিন্দাদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া বাঞ্ছনীয় নয়।
যদিও এটা ঘটনা যে, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা কাঁটাতার পেরিয়ে এদেশে ঢুকে জাল পরিচয়পত্র বানিয়ে দিব্যি জাঁকিয়ে বসে আছেন। ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। বাড়িগাড়ি করছেন। বৈধ নাগরিকদের সন্দেহের চোখে না দেখে এই অনুপ্রবেশকারীদের সবার আগে শনাক্ত করা দরকার। আবার সেই কাজটি করার নামে দেশের বৈধ নাগরিকদের কাঠগড়ায় তোলা, তাদের নাগরিকত্বকে সন্দেহের চোখে দেখা অনুচিত। নিজভূমে পরবাসী হয়ে থাকার যন্ত্রণা অপরিসীম।
অনুপ্রবেশকারীদের শাস্তি দেওয়ার নামে দেশের নাগরিকদের কষ্টার্জিত ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া অপরাধ। নির্বাচন কমিশন বিহারে যেভাবে ধর তক্তা মার পেরেক মনোভাব নিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধন করতে চাইছে, তাতে মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে বাধ্য। ভুয়ো ভোটার বাদ দিতে হলে অনেক আগেই তা করা যেত। বিহারে বিধানসভা ভোট হওয়ার কথা অক্টোবর-নভেম্বরে। এই অবস্থায় মাত্র তিন-চার মাসের মধ্যে ওই রাজ্যের ৮ কোটি ভোটারের মধ্যে ভুয়োদের যাচাই করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে।
যাচাইয়ের জন্য যে নথিগুলিকে মান্যতা দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে আধার, প্যান, ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। জন্মের শংসাপত্র, পাসপোর্ট, ম্যাট্রিক পরীক্ষার শংসাপত্র, জাতিগত শংসাপত্রের মতো ১১টি নথিকে প্রামান্য নথি হিসেবে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। কমিশনের যুক্তি, আধার, প্যান বা ড্রাইভিং লাইসেন্স নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। অথচ ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য কমিশনের ৬ নম্বর ফর্মে অন্যতম নথি হিসেবে আধার ব্যবহারের উল্লেখ আছে।
কেন্দ্রীয় সরকার আধার কার্ডকে সমস্ত পরিষেবার জন্য কার্যত বাধ্যতামূলক করেছে। অন্য সমস্ত নথির সঙ্গে আধার সংযোগ বাধ্যতামূলক। তারপরও আধার ঘিরে এই আঁধার ঘনানোর ব্যাখ্যা কেন্দ্রীয় সরকারই দিতে পারে। আধার যে নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়, তা মোটা হরফে কার্ডের পিছনে লেখা আছে। তাহলে আধার কার্ডকে সবকিছুর সঙ্গে সংযোগ করার কী দরকার পড়ল? কেনই বা তাতে আবালবৃদ্ধবনিতার আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়, চোখের মণি স্ক্যান করা হয়!
এই বিভ্রান্তির মাশুল গুনছেন সাধারণ মানুষ। দেশের বৈধ নাগরিকদেরই একমাত্র ভোটাধিকার আছে। সেই বৈধতার মাপকাঠি খুঁজে বের করতে সরকার কার্যত নাগরিকদের গোলকধাঁধায় ঢুকিয়ে দিচ্ছে। নাগরিকদের সন্দেহের জালে জড়িয়ে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হলে তা রাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁদের সংঘাতই তৈরি করবে।
বিরোধীদের অভিযোগ, নথিপত্রের গোলকধাঁধায় ঢুকিয়ে গরিব, দলিত ও পিছিয়ে পড়া মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চাইছে সরকার। এই শ্রেণির মানুষের অনেকের হাতেই বহু নথিপত্র নেই। থাকলেও নষ্ট হয়ে গিয়েছে। নাগরিককে ভোটদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলে দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।
