নারী দিবসে শিকল যখন হয়ে ওঠে অলংকার

নারী দিবসে শিকল যখন হয়ে ওঠে অলংকার

শিক্ষা
Spread the love


রূপায়ণ ভট্টাচার্য

৮ মার্চ আর দু’দিন পরে বলেই শ্রীনগর এবং লখনউয়ের (Lucknow) দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভাসছে বেশি করে। বারবার। যতবার ভাসছে, ততবার অবাক হচ্ছি আরও বেশি করে। মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায় ঢাকার ছবিও।
ইরানের রাষ্ট্রপ্রধান এবং ধর্মীয় গুরু খামেনেই নিহত হওয়ার পর কাশ্মীর (Kashmir) এবং লখনউয়ের রাস্তায় যে প্রতিবাদ মিছিল ছিল, তাতে মহিলাদের সংখ্যা ছিল প্রচুর। অনেককে বুক চাপড়ে কাঁদতে দেখা গিয়েছে খামেনেইয়ের শোকে। মুখে ট্রাম্প এবং আমেরিকাকে অভিসম্পাত। অনেক তরুণীর কথায় শুনলাম, তাঁরা আমেরিকায় গিয়ে ট্রাম্পকে মেরে আসার জন্য তৈরি।

ধাঁধাটা এখানেই। যে খামেনেই মেয়েদের পায়ে বেড়ি লাগিয়ে দিতে চেয়েছেন, মেয়েদের বোরখার আড়ালে রেখে দিয়েছেন হাজার বছর পেছনে, তাঁর জন্য এই ভিনদেশি মহিলাদের এত আবেগ কেন? তাঁরা কি নিজেরাই স্বাধীনতাহীনতায় বেঁচে থাকতে চান বোরখা এবং অশিক্ষার অন্ধকারে? প্রচুর ইরানি মহিলা সম্প্রতি রাস্তায় নেমেছিলেন খামেনেইয়ের পোশাক নীতির প্রতিবাদে! তাহলে কেন ওই মহিলাদের এই প্রতিবাদে সায় ছিল না কোনও। ইরানের রাষ্ট্রপ্রধানের মৃত্যুতে শোকমিছিলেও হাজার হাজার মহিলাকে বোরখা পরে দেখা গেল। শ্রীনগর ও লখনউয়ের মতো তেহরানেও হাজার মহিলা কাঁদছিলেন ও অভিসম্পাত দিচ্ছিলেন ‌ ট্রাম্পকে।

তাঁরাও তাহলে আদিম যুগেই পড়ে থাকতে চান। এই প্রশ্নটাই ভাবায়। তসলিমা নাসরিন দিনের পর দিন এত ভালো ভালো লেখা লিখে যান, অথচ তাঁর দেশে জামায়াতে ইসলামির মিছিলে দেখি প্রচুর বোরখা পরা মহিলা। অথচ এই জামায়াতের আমির স্পষ্ট বলে দেন তাঁরা ক্ষমতায় থাকলে কোনও নারী রাষ্ট্রপ্রধান হবেন না। একজন নারীকেও তারা প্রার্থী করেনি গত নির্বাচনে। তবু বহু নারীর ভোট তারা পেয়েছে। কোনও যুক্তি দিয়েই যা মানা যায় না। যে পার্টি নারীদের পায়ে দলে রাখতে চায়, যে পার্টি নারীস্বাধীনতায় বিশ্বাসই করে না, তাদের নারীরা সহ্য করে কীভাবে? ইদানীং ভারত এবং বাংলার কিছু সাংবাদিক নিজেরাই ক্ষমতাসীন নেতাদের কাছে গিয়ে হাত বাড়িয়ে কার্যত বলেন, ‘আমার হাতটায় শিকল পরিয়ে দিন। আমি আপনাদের বিরুদ্ধে লিখছি না।’

রক্ষণশীল মেয়েদের ব্যাপারটাও দাঁড়াচ্ছে এরকম। চূড়ান্ত নারীবিরোধী খামেনেই বা বাংলাদেশি জামায়াতের নেতাদের কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করছেন নারীরাই। কী সব্বোনেশে ব্যাপার! ও হো, ইরান বা বাংলাদেশের উদাহরণ টানছি কেন শুধু? ভারতেও তো প্রচুর উদাহরণ। আরএসএসের মহিলা সংগঠন রাষ্ট্রীয় সেবিকা সমিতি বা মুসলিম সংগঠনগুলোর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। সেখানে নারীদের তুলনামূলকভাবে ছোট চোখে দেখানো হয়। নাগপুরে আরএসএসের সদর দপ্তরে বিশেষ অনুমতি ছাড়া নারীরা ঢোকেন না। অনুষ্ঠান হলে নারী-পুরুষ আলাদা বসেন। সেবিকা সমিতির সদস্য সংখ্যা কয়েক লক্ষ।

এসবের পেছনে অনেক সমাজতাত্ত্বিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং ধর্মীয় জটিল কারণ কাজ করে। আর কাজ করে অশিক্ষিতদের ব্রেন ওয়াশ করার নীতি।

১. অনেক নারীর কাছে ধর্মীয় বিধান রাজনৈতিক বা সামাজিক স্বাধীনতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, এই দল বা নেতারা স্রষ্টার আইন বাস্তবায়ন করছেন। তাঁদের চোখে ‘স্বাধীনতা’ মানে পশ্চিমী সংস্কৃতি নয়, বরং ধর্মীয় কাঠামোর ভেতরে থাকা। তাঁদের ধারণা, এই ত্যাগের মাধ্যমে তাঁরা পারলৌকিক মুক্তি পাবেন।

২. অনেক নারীর বিশ্বাস, রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থা তাদের এক ধরনের ‘নিরাপত্তা’ দেয়। জামায়াতে বা আরএসএসের আদর্শগুলো পারিবারিক কাঠামোকে খুব গুরুত্ব দেয়। অনেক নারী মনে করেন, তথাকথিত লিবারেল সমাজে নারীরা পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হন। আর রক্ষণশীল সমাজে তাঁরা মা বা বোন হিসেবে বেশি ‘মর্যাদা’ ও ‘সুরক্ষা’ পান।

৩. পুরুষতান্ত্রিক এই সংগঠনগুলো নারীদের এক ধরনের ‘রাজনৈতিক পরিচয়’ দেয়। জামায়াতের নারীবাহিনীর শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। সাধারণ সমাজে অবহেলিত বোধ করা কিছু নারী এই দলগুলোতে এসে নেতৃত্বের সুযোগ পান। এটা অনেকটা পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে থেকেই নিজের জন্য কিছু ক্ষমতা বা প্রভাব নিশ্চিত করা।

৪. বিশ্বায়নের যুগে পশ্চিমী জীবনযাত্রাকে অনেক মহিলাই তাঁদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মের ওপর হুমকি মনে করেন। তাঁদের কাছে হিজাব বা পর্দাপ্রথা শুধু পোশাক নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রতীক।জামায়াতে বা আরএসএসের নারী সংগঠন বাদ দিলে আরও দু-তিনটে দেশে এমন উদাহরণ আছে। মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডের নারী শাখা মুসলিম সিস্টারহুড অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা মনে করে, ইসলামি শাসনই তাদের প্রকৃত অধিকার দিতে পারে। আমেরিকায় পর্যন্ত অনেক নারী ‘নারীবাদ’ বিরোধী। তাঁরা গর্ভপাত নিষিদ্ধ করা এবং ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক প্রথা বজায় রাখার পক্ষে আন্দোলন করেন। তাঁরা মনে করেন নারীবাদ পরিবার প্রথাকে ধ্বংস করছে। তুরস্কে জাঁদরেল প্রেসিডেন্ট এর্দোগানের একে পার্টির পেছনে তুরস্কের পর্দানশিন নারীদের বিশাল সমর্থন। তাঁদের ধারণা, আগের ধর্মনিরপেক্ষ সরকারগুলো তাঁদের ধর্মীয় স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল, যা এর্দোগান ফিরিয়ে দিয়েছেন। নারীরা যখন এই ভয়ংকর পুরুষতান্ত্রিক পক্ষগুলোতে যোগ দেন, তাঁরা নিজেদের ‘শিকার’ মনে করেন না। বরং নিজেদের এক বৃহত্তর আদর্শের অংশ মনে করেন। তাঁদের কাছে স্বাধীনতার সংজ্ঞা সম্পূর্ণ আলাদা। ব্যক্তিগত ইচ্ছার চেয়ে গোষ্ঠীগত সংহতি ও ধর্মীয় অনুশাসন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অরুন্ধতী রায় বা তসলিমা নাসরিন পড়ে মুগ্ধ হওয়ার পরেও, নারী দিবসের আগে এই প্রসঙ্গগুলো যেন বেশি করে ভাবায়। কেন এমন হয়? কেন এমন হয়?



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *