নিউজ ব্যুরো: ঠিক ২৬ দিন পর ফের নিম্নচাপের জেরে বৃষ্টিতে পাহাড় থেকে সমতলে আশঙ্কার মেঘ। অক্টোবরের ৫ তারিখ ভুটান ও দার্জিলিং পাহাড় এবং সমতলে ডুয়ার্সে প্রবল বৃষ্টিতে ফুঁসে উঠেছিল নদীগুলি। প্লাবিত হয়েছিল পাহাড় ও ডুয়ার্সের বিস্তীর্ণ এলাকা। দুর্যোগের বলি ছিলেন ৪০ জনেরও বেশি। সেই আতঙ্কের রেশ কাটার আগেই ফের নিম্নচাপ মন্থার প্রভাবে বৃহস্পতিবার রাত থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে উত্তরবঙ্গে। কোথাও ঝিরঝিরে, আবার কোথাও মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে শুক্রবার সারাদিন। ফলে কিছু নদীর জলস্তর অনেকটাই বেড়েছে।
শনিবারও উত্তরবঙ্গের সর্বত্রই বিক্ষিপ্তভাবে কমবেশি বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহারের দু’-একটি জায়গায় ভারী বৃষ্টির (Heavy Rain) আশঙ্কায় ওই তিন জেলায় হলুদ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। মেঘমুক্ত আকাশ পাওয়া যাবে রবিবার থেকে। তবে দিনে রোদ পাওয়া গেলেও, রাতে তাপমাত্রার পতন হবে।
শুক্রবার বিকেল থেকে আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকের শালকুমারহাট ও কালচিনির সুভাষিণী চা বাগানে শিসামারা ও তোর্ষার জল ঢুকতে শুরু করেছে। নতুনপাড়া গ্রামের নবীন সংঘ কলোনিপাড়ায় বাঁধের পুরোনো ভাঙা অংশ দিয়ে শিসামারার জল ঢুকে যায় প্রায় ২০০ বাড়িতে। ওই পরিবারগুলিকে ত্রাণশিবিরে সরিয়ে আনা হয়েছে। টানা বৃষ্টির জেরে ৪৮ নম্বর এশিয়ান হাইওয়েতে বীরপাড়ার কাছে ফের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্যারগান্ডা নদীর সেতুর অ্যাপ্রোচ রোড।
পাহাড়ে বৃষ্টির জেরে বালাসনের জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় এদিন সকাল থেকে দুধিয়ায় হিউমপাইপ দিয়ে তৈরি অস্থায়ী সেতুতে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে প্রশাসন। সকালে একমুখী যান চলাচল করলেও সন্ধ্যার পর মিরিকগামী ওই রাস্তায় যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দুপুরে সিকিমগামী ১০ নম্বর জাতীয় সড়কে ধস নেমে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এক ঘণ্টার মধ্যে ধস সরিয়ে রাস্তা খুলে দেয় প্রশাসন। দার্জিলিং এবং কালিম্পংয়ে প্রশাসনিক আধিকারিকরা সর্বক্ষণ তিস্তা, বালাসন, রঙ্গিতের জলস্তরের দিকে নজর রাখছেন। নদী পার্শ্ববর্তী এলাকার গ্রামগুলিতে বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিতে মাইকে প্রচার করা হয়েছে। রাতে বিজনবাড়িতে ২০টি পরিবারকে ত্রাণ শিবিরে সরিয়ে আনে প্রশাসন।
গত ৫ অক্টোবরের প্লাবনে সমতলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল জলপাইগুড়ির নাগরাকাটা, ময়নাগুড়ি ও ধূপগুড়ি ব্লকের কিছু এলাকা। মন্থার প্রভাব কতটা পড়বে, তা নিয়ে আশঙ্কায় ছিল জেলা প্রশাসন। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে নদী তীরবর্তী জলঢাকা, তিস্তা, ডায়নার তীরবর্তী এলাকার গ্রামগুলি থেকে প্রায় তিন হাজার মানুষকে ত্রাণশিবিরে সরিয়ে আনা হয়।
এদিকে গত ৫ অক্টোবর প্লাবনে ময়নাগুড়ি ব্লকের আমগুড়িতে জলঢাকা নদীর ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত করা হলেও সেখানে রেইনকাট দেখা দিয়েছে। ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে নির্মাণ করা বাঁধের অংশ।
নাগরাকাটার বামনডাঙ্গা চা বাগান, টন্ডুবস্তির গোট লাইন, কালিখোলাবস্তি, খেরকাটা গ্রাম, মাঝিয়ালিবস্তি, জিতি চা বাগান মিলিয়ে মোট পাঁচটি ত্রাণশিবিরে ৮০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। জলঢাকা, গাঠিয়া, ডায়না, কুজি ডায়নার মতো বিভিন্ন নদীতে জলস্তর বাড়লেও তা বিপদসীমার কাছে পৌঁছায়নি।
আমগুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের তারারবাড়ি ও খাটোরবাড়ির মতো এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কে বৃহস্পতিবার রাতেই জলঢাকা বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছিলেন। ওই এলাকা থেকে প্রায় ৩০০ জনকে এদিন ব্লক প্রশাসন ও পুলিশ চারেরবাড়ি নগেন্দ্রনাথ উচ্চবিদ্যালয় ও আমগুড়ি রামমোহন উচ্চবিদ্যালয়ে সরিয়ে আনে৷ ধূপগুড়ি ব্লকের বগরিবাড়ি, হোগলাপাতা এলাকার গ্রামবাসীদেরও তিনটি ত্রাণশিবিরে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে প্রশাসন। প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে খবর, প্রায় ১১০টি পরিবারকে ত্রাণশিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়। বানারহাট ব্লকের আংরাভাসা নদীর জল বাড়তেই নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসা হয়েছে। অন্যদিকে, ফের চিলার ঘাটে বাঁশের সাঁকো ভেসে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ধূপগুড়ি, বানারহাট ও ফালাকাটা ব্লকের কিছু এলাকা। বিন্নাগুড়ির বন্যাপ্রবণ এলাকা থেকে ৪০ জন বাসিন্দাকে কমিউনিটি হলে সরানো হয়েছে। ক্রান্তির চেংমারি গ্রাম পঞ্চায়েতের সাহেববাড়ি ও দোলাইগাঁও এলাকায় প্রায় ৭৮টি পরিবারকে স্থানীয় এসএসকে এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অস্থায়ী ত্রাণশিবিরে রাখা হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে কোচবিহার জেলাজুড়ে ধান ও সবজি চাষ ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। কোচবিহার -১, মাথাভাঙ্গা ১ ও ২, তুফানগঞ্জ ১ ও ২, দিনহাটা-১ এবং হলদিবাড়ি ব্লকে চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে জমিতে কেটে রাখা আমন ধানের। আরও দু’-তিনদিন বৃষ্টি হলে ক্ষতির পরিমাণ ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা চাষিদের। এদিন বৃষ্টিতে কোচবিহার শহর লাগোয়া ফাঁসিরঘাটের সাঁকো ভেসে যায়। মালদার কালিয়াচকেও প্রায় একই অবস্থা। কালিয়াচক-৩ ব্লকেও জমিতে কেটে রাখা আমন ধান বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ায় শোচনীয় অবস্থা হয়েছে কৃষকদের।
প্রশাসন সূত্রে খবর, পাহাড়ে তিস্তা ব্যারেজ থেকে দু’দফায় ১৫২৪ কিউমেক এবং ১৬২৪ কিউমেক জল ছাড়া হয়েছে। অন্যদিকে, কালিঝোরা ব্যারেজ থেকে প্রথম দফায় ১৩৩৬ কিউমেক এবং দ্বিতীয় দফায় ১৫৮৮ কিউমেক জল ছাড়া হয়েছে। সিকিমের আবহাওয়া আধিকারিক ডঃ গোপীনাথ রাহা বলেন, শনিবারও বৃষ্টি থাকবে। তবে তীব্রতা কমবে। রবিবার থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
