ধোঁয়াশা বর্ণের মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি – Uttarbanga Sambad

ধোঁয়াশা বর্ণের মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি – Uttarbanga Sambad

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


  • শ্রীপর্ণা মিত্র

মানুষের জীবন প্রকৃতি দ্বারা প্রভাবিত। কারণ মানুষ নিজেই প্রকৃতির অংশ এবং প্রকৃতি ও ঋতু হল এক ও অবিচ্ছেদ্য। তাই এরা একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সৃষ্টির সময়কাল থেকে। মনে পড়ে ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে শীত আসত কাঁপুনি দিয়ে বলা হত ‘হাড় কাঁপানো শীত’। দুর্গাপুজোর পর থেকেই শীতের প্রচ্ছন্ন প্রভাব লক্ষ করা যেত গ্রামাঞ্চলে। আগমনী শরতের পর, প্রৌঢ় হেমন্তকে বিদায় জানিয়ে চলে আসত জবুথবু শীত ঋতুর নির্মম বার্ধক্য।

কবিগুরু তাঁর বোধন কবিতায় লিখেছেন –

 ‘‘নির্মম শীত তারি আয়োজনে

এসেছিল বনপারে।

মার্জিয়া দিল শ্রান্তি ক্লান্তি,

মার্জনা নাহি কারে।’’

শিল্প, সংস্কৃতি, সাহিত্য, চলচ্চিত্র  হল  প্রকৃতি ও মানুষের এক নিবিড় অনুভূতির প্রকাশ। তাই বাংলার  শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্রেও শীতের বহুমাত্রিক রূপ অঙ্কিত হয়েছে। তারই মধ্যে একটি রূপ শুষ্ক, কঠিন, রিক্ত, নিঃস্ব। আসলে শীত এখানে জীবনের একটি পর্যায় ভিন্ন আর কিছু নয়। শীতের কাঁপুনি, নিস্তব্ধতা, জড়তা এবং বিষাদের সুর শীতকে বার্ধক্য পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে, বয়স এবং জীবনের ভারে ক্লান্ত সে যেন এক বৃদ্ধ নাগরিক, হতাশা এবং শূন্যতা দিয়ে তার অভিজ্ঞতার ঝুলি ভর্তি। কবি জীবনানন্দ দাশ যার কলমের প্রতিটা অক্ষরে বাংলার অনন্য রূপ ফুটে উঠেছে তাঁর কাছেও শীত কিন্তু শুধুমাত্র ঋতু নয়। তাঁর লেখায় শীতের নীরবতা, পাতা ঝরা, কুয়াশা মানুষকে নিয়ে যায় চিরমুক্তির তেপান্তরে। তাই তিনি লিখেছেন– ‘এই সব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে।’ এই মৃত্যু তো আসলে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়ার মুক্তি।

চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম লক্ষ করা যায় না। ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রে সামাজিক ও মানসিক সংকটকে গভীরভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য শীতকে উপস্থাপন করা হয়েছে। ‘সুবর্ণরেখা’ বা ‘মেঘে ঢাকা তারা’-তে যা স্পষ্ট দেখা যায়। এছাড়াও বিভিন্ন চলচ্চিত্রে কুয়াশাকে কখনও মৃত্যু, কখনও সময়ের ক্ষয় বা কখনও প্রকৃতির বুকে লীন হয়ে যাওয়ার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কখনও কুয়াশা এক রহস্যময় আবরণ।

চিত্রকলার ক্ষেত্রেও শীতকাল মানেই ঘোলাটে নীল সাদা আকাশের নীচে ধোঁয়াশা বর্ণের মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি। এ যেন এক বর্ণহীন, রংহীন, অনুজ্জ্বল কিছু রংয়ের খেলা- যেন রংহীন, বর্ণহীন হয়ে এক নারীর  বৈধব্য যাপন। শীতে শরীরের রুক্ষতা কি আমাদের মনকেও এতটাই রুক্ষ করে দেয় যে আমরা রংয়ের ক্ষেত্রেও কার্পণ্য করি? এখানেই শীত আমাদের কাছে রিক্ততার প্রতীক হিসেবে উদযাপিত হয়ে উঠেছে।

কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপটে শীত কি এতটাই মলিন আমাদের জীবনে? তবে তার জন্য কেন এত তীব্র অপেক্ষা? কেন কবির কলমে উঠে এসেছে ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা?’ এই প্রকৃতিই আবার শীতকে নিয়ে গেয়েছেন জীবনের জয়গান- উৎসব এবং ঐতিহ্যের মধ্যে দিয়ে। শীত মানেই- ফলের পসরা, সবজির মেলা, ফসল তোলার গান, নবান্ন, পিঠেপুলি, খেজুরের রস, নলেন গুড়, পরিযায়ী পাখি, শীতের শহরে সাহিত্যের উষ্ণ ছোঁয়া নিয়ে বইমেলা, কুয়াশার মায়ায় মাখানো নরম রোদে পিঠ দিয়ে ছাদে বসে টেস্ট পেপার সলভ, মায়ের কাঁথা সেলাই, বড়ি দেওয়া বা সোয়েটার বোনা, বাহারি রং নিয়ে পৌষমেলা, কল্পতরু উৎসব, প্রেমের বার্তা নিয়ে সরস্বতীপুজো, ভ্যালেন্টাইন্স ডে। এই শীতই তো আমাদের আবেগ, উষ্ণতার অনুভূতিকে সিক্ত করে প্রতিনিয়ত। তাই কবি মহাদেব সাহা শীতকে তাঁর আরোগ্যের মলম হিসেবে বর্ণনা করেছেন ‘শীতের সেবায় তবে সেরে উঠি’। এই শীতই তো আগমনী বার্তা বহন করে গাছে সবুজ পাতার জন্ম নেওয়ার। কবি রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘এসেছে শীত, গাহিতে গীত বসন্তেরই জয়’, ‘শীতের হাওয়ায় লাগলো নাচন আমলকির এই ডালে ডালে’, ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে আয়রে ছুটে আয় আয় আয়’।

বিখ্যাত বাংলা সাহিত্যিক অভিজিৎ সেন মহাশয়ের সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে বারবার একটি প্রশ্ন আমার মনকে নাড়া দিতে থাকে, বাংলা সাহিত্যে শীতের বর্ণনা নিয়ে এই  যে বহুমাত্রিক চিত্রকল্প আমাদের সামনে ফুটে ওঠে, একজন সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর কী মনে হয়, এর কারণ কী? তাঁর কথায়, ‘আসলে এখানে কবি বা সাহিত্যিক বা শিল্পী নিজেদের অবস্থানকে কেন্দ্র করে তার শিল্প বা সাহিত্য ভাবনায় আবর্তিত হয়ে থাকেন। কেউ প্রকৃতির রুক্ষ ও শীতল রূপের মাধ্যমে জীবনের একাকিত্বকে তুলে ধরেন আবার অন্য শিল্পীর চোখে এই শীতই তার শিল্পের অনুপ্রেরণার উৎস। এখন শহরের তীব্র আলোর ঝলসানিতে যেমন শীতকে বিবর্ণ মনে হয় না কিন্তু অতীতের গ্রাম্য জীবনের কথা মনে পড়লে মনে হয় শীত কষ্টের, বেদনার।’

আসলে পরিশেষে বলতে হয় রিক্ত বা সিক্ত দর্শনের মধ্যে দিয়ে আমরা শীতকে যেভাবেই দেখি না কেন তাতে সত্যিই কি শীতের কিছু আসে বা যায়? সে প্রকৃতির নিয়মমতো আসবে আবার চলে যাবে, মানুষের ভাবনা বা দর্শনের প্রতিচ্ছবি হয়ে তার আসা বা চলে যাওয়া কোনওটাই থেমে থাকবে না। বরং সিক্ত ও রিক্ত এই দুই বিপরীতধর্মী দিক দিয়ে শীতকে আমরা আমাদের জীবনে নব নব রূপে বারবার গ্রহণ করব।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *