ধর্মের নামে অধর্ম

ধর্মের নামে অধর্ম

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


জোর করে জয় শ্রীরাম বলানোর প্রবণতায় লাগাম নেই। নতুন করে ওডিশা, এমনকি পশ্চিমবঙ্গে এমন দুটি ঘটনা ঘটেছে। ওডিশার সম্বলপুরে নিগৃহীত হয়ে ফিরে এসেছেন হুগলির গোঘাটের এক বাসিন্দা। অন্যদিকে, বোলপুরে শুধু জয় শ্রীরাম ধ্বনি নয়, হনুমান চালিশা পড়ার জন্য মারধর করা হয়েছে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী কয়েকজনকে। জয় শ্রীরাম বলতে যাঁরা বাধ্য হন, তাঁরা যে আন্তরিকভাবে বা শ্রদ্ধার সঙ্গে ওই ধ্বনি উচ্চারণ করেন না- তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই।

একইভাবে কোথাও যদি আল্লাহ আকবর ধ্বনি দিতে ভিনধর্মী কাউকে বাধ্য করা হয়, তাহলে ইসলাম ধর্মের প্রতি অনুরাগ জন্মানোর কোনও কারণ নেই। বরং জয় শ্রীরাম হোক বা আল্লাহ আকবর বলতে বাধ্য করা হলে ঘৃণাভরে উচ্চারণ করাই স্বাভাবিক। তাতে সেই ধ্বনির পবিত্রতা, বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়। ফলে যাঁরা এসব ধ্বনি দেওয়ার জন্য বলপ্রয়োগ করেন, তাঁদের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন নতুন কিছু নয়। কিন্তু ভিনধর্মীদের অন্যের ধর্মীয় ধ্বনি উচ্চারণ করানোর এই প্রবণতা আসলে রাজনীতির ধর্মীয়করণ। ধর্মের নামে অধর্মের এই প্রয়াস ক্রমশ বাড়ছে। শুধু ভারতে নয়, বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডে। ক্ষমতার কারবারিদের কাছে ধর্মীয় মৌলবাদ এখন অত্যন্ত সহজ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। মানুষকে বেশি প্রভাবিত করা সম্ভব হচ্ছে বলে এই অস্ত্রকে আঁকড়ে ধরছে ক্ষমতার সিন্ডিকেটগুলি।

মুক্তমনা পরিবেেশ বড় হয়ে ওঠা বা উদার, মানবতাবাদী প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে অনেক রাজনীতিবিদ এই স্বার্থে ধর্মকে বিকৃতভাবে ব্যবহার ও অন্য ধর্মের অমর্যাদা করে চলেছেন। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের মতো উচ্চশিক্ষিত মানুষ এর ব্যতিক্রম নন। বরং ধর্মীয় মৌলবাদকে প্রশ্রয় দিয়ে তিনি ক্ষমতায় নিজেকে ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। ওসমান হাদির মতো কট্টর মৌলবাদী ভারতবিরোধীর মৃত্যুর পর তিনি সেই কারণে তাঁকে বীরের মর্যাদা দিয়ে রাষ্ট্রীয় শোকপালনে উদ্যোগী হলেন।

বাংলাদেশে আওয়ামী লিগের শাসনে হিন্দু নিগ্রহ তুলনায় কম হলেও শেখ হাসিনা মৌলবাদীদের মন জুগিয়ে ক্ষমতায় নিজেকে নিষ্কণ্টক রাখার চেষ্টা করেছেন। সেদেশের ক্ষমতার অঙ্কে বিএনপি বরাবরই কার্যত মৌলবাদের সমার্থক। একসময় জামায়াতে ইসলামির সঙ্গে জোট করে সরকার গড়েছিল বিএনপি। জামায়াতে খোলাখুলি ধর্মীয় মৌলবাদের প্রবক্তা। যে মৌলবাদ সরাসরি অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, হিংসায় উসকানি দেয়।

আপাতত জামায়াতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও ক্ষমতার প্রয়োজনে বিএনপি যে মৌলবাদের সঙ্গে সহাবস্থান করে চলবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ফলে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এককভাবে জিতে বিএনপি ক্ষমতায় এলেও বাংলাদেশের আপাতত ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তির হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার উপায় নেই। মৌলবাদ ভারতের ক্ষমতার অলিন্দকেও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। তাতে শাসকের প্রশ্রয় আছে বলেই জোর করে জয় শ্রীরাম উচ্চারণ করানোর মতো ঘটনা বাড়ছে।

বিরোধী পক্ষ আবার বিপরীত মৌলবাদী শক্তিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। সেই শক্তির জোরে ভোটে বা সংগঠনে উতরানোর চেষ্টা করছে। পশ্চিমবঙ্গে সেই কারণে তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোষণের রাজনীতির অভিযোগ জোরালো হাওয়া পায়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখে একারণে ‘দুধেল গাই’ শব্দবন্ধটির উচ্চারণ শোনা যায়। সর্বভারতীয় শাসকের পালের হাওয়া কাড়তে তিনি হিন্দুত্বের ভজনা করে ভারসাম্যের খেলায় ব্যস্ত এখন।

সর্বভারতীয় শাসকদল বিজেপি সরাসরি ইসলামফোবিয়া সৃষ্টি করে দেশের ধর্মীয় সংখ্যাগুরুদের সমর্থন নিশ্চিত করতে সচেষ্ট। এব্যাপারে সরকার, প্রশাসন, বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থাকেও খোলাখুলি ব্যবহার করা হচ্ছে। মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেও বাম ও কংগ্রেস এই প্রবণতার কট্টর বিরোধিতার পথে না গিয়ে উলটে কিছু ক্ষেত্রে মৌলবাদের দাবার বোড়ে হয়ে যাচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার ভাবনাটি এভাবে বিপন্ন হয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মনেও ক্রমে জাঁকিয়ে অনুপ্রবেশ করছে ধর্মীয় মৌলবাদ।

 



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *