- হেমা মালিনী
রাজস্থানের প্রখর রোদে শুটিং। সবাই ক্লান্ত, আমি প্রায় মাথা ঘুরে পড়ার উপক্রম। তখনই দেখলাম ধরমজি নিজের ছাতা আমার মাথার ওপর ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। যেন সেটাই তাঁর কর্তব্য। বলে উঠলেন, ‘হেমাজি, এবার একটু ছায়ায় দাঁড়ান।’
কত বড় মানুষ হলে এমনটা হতে পারে? ওই সরল, যত্নশীল মানুষটাকেই আমি প্রথম সত্যিকারের হৃদয়ে অনুভব করেছিলাম।
জীবন একটা চলমান পথ। সেই পথ চলায় আর পাঁচটা মানুষের মতো আমার জীবনেও স্বাভাবিকভাবেই এসেছেন বহু মানুষ। বহু স্মৃতি বয়ে চলেছি হৃদয়ে-মনে। কিন্তু এমন একজন মানুষ এসেছিলেন আমার জীবনে, যাঁকে ছাড়া আমার জীবনের গল্প কখনোই সম্পূর্ণ হয় না—ধর্মেন্দ্রজি। আমাদের প্রথম পরিচয় ১৯৬৫ সালে। তখন আমি একেবারে নতুন, আর তিনি তখন সফল অভিনেতা। ‘ফুল অউর পাত্থর’, ‘আনপড়’, ‘আয়ি মিলন কি বেলা’র সফল নায়ক।
সেদিন প্রথম সেটে গিয়ে দেখলাম তাঁকে। নিতান্ত সহজ–সরল হাসি, কোনও তারকাসুলভ ক্যারিশমা দেখানো নয়, কোনও দূর গগনের তারা নয়; যেন বহুদিনের পরিচিত কেউ আমায় স্বাগত জানাচ্ছেন।
এই সরল-সুন্দর-স্বাভাবিক আচরণই আমাকে তাঁর দিকে প্রথম আকৃষ্ট করেছিল।
আমাদের প্রথম কাজ ‘শরাফত’ ছবিতে। সেটা ১৯৭০ সাল। এই ছবির শুটিংয়ের সময় আমি অনুভব করি, ধর্মেন্দ্রজি কী অসাধারণ সংবেদনশীল একজন সহ অভিনেতা। সংলাপ বলার আগে তিনি দৃশ্যটি মন দিয়ে শোনেন, তারপর যেভাবে চরিত্রের গভীরে ঢুকে পড়েন, তা আমাকে বিস্মিত করেছিল।
শরাফত ছবিতে একটি দৃশ্যে আমাকে কাঁদতে হত। আমি তখন নতুন, অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে। ধর্মেন্দ্রজি ক্যামেরার বাইরে দাঁড়িয়ে নীরবে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন— সেই দৃষ্টিতে এমন এক সহানুভূতি ছিল যে আমার চোখে সত্যিই জল এসে গিয়েছিল। সেদিন বুঝেছিলাম, ওঁর মধ্যে কোনও কৃত্রিমতা নেই। অভিনয় তাঁর কাছে শুধু শিল্প নয়, এক বিশেষ অনুভূতি।
এরপর বলি ‘তুম হাসিন ম্যায় জওয়ান’ ছবির কথা। এটিও ১৯৭০ সালের ছবি। হিমাচলের বরফে জমে থাকা স্মৃতি আজও টাটকা। সেকথাই বলি। হিমাচলে শুটিং চলছিল। তুষারপাত হচ্ছে। বাতাস কেঁপে কেঁপে উঠছে। আমরা পাতলা পোশাকে নাচের দৃশ্যের শুটিং করছি। এত ঠান্ডা যে, আমি প্রায় জমে যাচ্ছিলাম। তখন ধর্মেন্দ্রজি নিজের শালটি আমার কাঁধে জড়িয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘তুমি আগে শরীরটাকে একটু গরম করে নাও, শট পরে হবে।’ আপনারা হয়তো বলবেন, একজন নায়কের এটাই তো ভদ্রতা, কিন্তু আমি বলব, এটা হচ্ছে একজন ভালো মানুষের মানবিকতা।
আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ছবিগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘সীতা অউর গীতা’। সাল ১৯৭২। এই ছবিতে আমি দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করছিলাম— সীতা এবং গীতা। কাজের চাপ ছিল প্রচুর। ধর্মেন্দ্রজি প্রায় প্রতিদিন আমাকে উৎসাহ দিতেন। একটা অ্যাকশন দৃশ্য ছিল, যেখানে আমাকে দড়িতে ঝুলে মারামারি করতে হয়েছিল। আমি ভয় পাচ্ছিলাম। ধর্মেন্দ্রজি বলেছিলেন, ‘হেমাজি, আপনি পারবেন। আমি এখানেই আছি।’ সেই আশ্বাসেই আমি দৃশ্যটি নিখুঁতভাবে করতে পেরেছিলাম।
কথায় কথায় ‘শোলে’ ছবির কথা এসেই পড়ে। ১৯৭৫-এর কথা। রামগড়ের পাহাড়ে ধরমজির সঙ্গে তৈরি হয়েছিল এক অদ্ভুত আবেগময় নীরবতার গল্প। সত্যি বলতে, শোলে আমাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ছবি। রামগড়ের ফাঁকা মাঠ, পাহাড়ি এলাকা, সোনালি সন্ধ্যা— সব আজও চোখে ভাসে।
বসন্তী চরিত্রে আমাকে যতটা চঞ্চল দেখায়, পর্দার বাইরে আমি ততটাই শান্ত। ধর্মেন্দ্রজি তা জানতেন। শুটিং শেষে যখন আমরা ক্লান্ত হয়ে পাহাড়ের ধারে বসে পড়তাম, তিনি তখন দূরে তাকিয়ে থাকতেন। সেই নীরবতার মধ্যেই ছিল এক গভীর টান, যা কোনও শব্দ ছাড়াই আমি বুঝতে পারতাম। ‘শোলে’ ছবির শুটিংয়েই বুঝেছিলাম, ধর্মেন্দ্রজি শুধু পর্দার বীর নন; প্রকৃতপক্ষে তিনি অত্যন্ত স্নেহশীল, সংযত, হৃদয়বান মানুষ।
১৯৭২ সালের ছবি ‘রাজা জানি’। অন্যদিকে ‘নসিব’ ছবিটি ১৯৮১ সালের। ‘রাজা জানি’তে তিনি ছিলেন আমাদের অদ্ভুত এনার্জির উৎস। গানগুলির শুটিংয়ে তাঁর ছেলেমানুষি পুরো ইউনিটকে হাসিতে ভরিয়ে রাখত। ‘নসিব’ ছবির শুটিংয়ের সময় আমি খুব ব্যস্ত ছিলাম। একদিন আমার গলা বসে গিয়েছিল। ধরমজি নিজে হাতে গরম কাবুলি চা নিয়ে এলেন। বললেন, ‘এটা খেলে তোমার গলা ঠিক হয়ে যাবে।’ এইরকম ছোট্ট ছোট্ট কত যত্নের কথা যে আজ মনে পড়ছে, তার ইয়ত্তা নেই। আর এই যত্নগুলিই আমাকে তাঁর প্রতি বেজায়রকম আকৃষ্ট করেছিল।
আমাদের জুটির সবচেয়ে আলোচিত ছবি ‘ড্রিম গার্ল’। সিনেপ্রেমী মাত্রেই জানেন, ‘ড্রিম গার্ল’ নামটি ধর্মেন্দ্রজিই আমাকে দিয়েছিলেন। যদিও তিনি কখনও প্রকাশ্যে তা স্বীকার করতেন না।
এই ছবির প্রতিটি ফ্রেমে আমাদের বোঝাপড়ার ছাপ রয়েছে। কোনও সংলাপ নয়, শুধু চোখের ভাষাতেই দৃশ্য তৈরি হত।
আমাদের সম্পর্কের নীরব পরতগুলো যদি খুলে দেখি, তাহলে কত কথাই না ভিড় করে। ধর্মেন্দ্রজি তখন বিবাহিত। আমি এই সত্যকে সম্মান করতাম। কিন্তু তাঁর ছেলেমানুষি, সরলতা, উদারতা আমাকে কোনওভাবেই দূরে থাকতে দেয়নি। অবশ্য এটাও ঠিক, আমাদের সম্পর্ক কখনও উতল হাওয়ার মতো ঝড়ের গতিতে তৈরি হয়নি। ধীরে ধীরে, একটু একটু করে গড়ে উঠেছিল। তাছাড়া আমাদের প্রেমে আদিখ্যেতা দেখানোর মতোও তেমন কিছু ছিল না। দুজনেই দুজনকে মনে মনে চেয়েছি। শব্দেরা সেখানে খুব বেশি ভিড় করেনি। নীরবতাই বরং শব্দের ভাঁড়ার পূর্ণ করেছে। দুটি মানুষের মন বোঝার নীরব ক্ষমতাই দুজনকে কাছে এনেছিল। এটাও ঠিক যে, আমাদের সম্পর্ক নিয়ে অনেক ঝড় উঠেছিল বাইরের পৃথিবীতে— সমালোচনা, প্রশ্ন, বিতর্ক। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম একটিই কথা, এই মানুষটি সত্যিকারের ভালোবাসতে জানেন। তিনি কখনও আমাকে তাঁর জীবনের ঘেরাটোপে আবদ্ধ করেননি, বরং সবসময়ই আমার স্বাধীনতাকে সম্মান করেছেন। জীবনের বহু মোড় ঘুরে, হাজারো জটিল পথ পেরিয়ে আমরা একসঙ্গে হয়েছিলাম, হতে পেরেছিলাম। আমাদের সম্পর্ক ছিল হৃদয়ের সত্য সিদ্ধান্ত। ধর্মেন্দ্রজির পরিবারের প্রতি আমার সম্মান আজও সমানভাবে রয়েছে। আমি পরিবারের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। ধরমজির মা আমাকে প্রথম যেদিন দেখেছিলেন, বলেছিলেন, ‘এই মেয়ে খুব শান্ত।’ সুখে-শান্তিতে থাকার কথা বলেছিলেন তিনি। মায়ের সেই আশীর্বাদ আজও আমার মাথায় রয়েছে।
যদি জিজ্ঞেস করেন, আমার শিল্পীজীবনে তাঁর প্রভাব কেমন ছিল, এককথায় তা বলা খুব মুশকিল। তিনি কখনও আকাশ ফাটিয়ে বলেননি, ‘তুমি দারুণ করেছ।’ শুধু চোখের ঝিলিকেই বুঝিয়ে দিতেন, শটটা কেমন হয়েছে। অথবা তাঁর পছন্দ হয়েছে কি না! তাঁর চোখে চোখ রেখেই বুঝতে পারতাম, কোন বিষয়ে কী নিয়ে তিনি আমাকে নিয়ে গর্ববোধ করছেন। এই নীরব উৎসাহই আমাকে আরও ভালো অভিনেত্রী হতে সাহায্য করেছে।
আমাদের সংসারটা ছিল নিতান্তই সাদামাঠা। মানুষ ভাবেন, তারকাদের জীবন নিশ্চিতভাবে জাঁকজমকপূর্ণ, কিন্তু সত্যিটা তা নয়। আমাদের দিনের শুরু হত খুব সাধারণভাবে। সকালে উঠে তিনি খবরের কাগজ পড়তেন। মাঝে মাঝে ফল কাটতে গিয়ে আঙুল কেটে ফেলতেন। আর আমি বকাঝকা করলেই হেসে উঠতেন। আমি চা বানালে বলতেন, ‘তোমার হাতের চা না হলে দিনটাই শুরু হয় না।’ এই ছোট্ট ছোট্ট কথাই আমার সংসারের রঙিন আনন্দ।
আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, দেখি, ধর্মেন্দ্রজি আমার জীবনের সবটুকুজুড়ে রয়েছেন। তিনিই ছিলেন আমার বটবৃক্ষ। তিনি আমার সহ অভিনেতা, আমার বন্ধু, আমার পরামর্শদাতা এবং শেষপর্যন্ত—আমার জীবনের সঙ্গী।
রুপোলি পর্দায় আমি বহু ধরনের চরিত্র করেছি— রাজকন্যা, গ্রামের মেয়ে, দ্বৈত চরিত্র, নর্তকী। কিন্তু আমার নিজস্ব জীবনের সবচেয়ে সত্য চরিত্রটি— ধর্মেন্দ্রজির পাশে থাকা আমি।
আমার গল্প যে জায়গা থেকে শুরু হয়েছে, যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে— সব জায়গায় তিনি কোথাও না কোথাও আছেন। সবসময় হয়তো দৃশ্যমান নয়— কিন্তু তিনি রয়েছেন আমার অনুরাগে, অনুভবে। যতদিন বাঁচব, তাঁর উষ্ণ আলিঙ্গন বুকে নিয়েই বাঁচব।
(সংকলিত)
