ভারতের রাজনীতিতে অন্যতম বড় ধাঁধার নাম নীতীশ কুমার। তাঁকে নিয়ে শাসক এবং বিরোধী, উভয় শিবিরই বিভ্রান্ত। তিনি কখন কোন পক্ষে থাকবেন, কোন শিবিরকে বুড়ো আঙুল দেখাবেন, বলা যেন শিবেরও অসাধ্য। বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর এই আয়ারাম-গয়ারাম রাজনীতির চালে নিজের রাজ্যের তো বটেই, সর্বভারতীয় রাজনীতিবিদরা একাধিকবার কুপোকাত হয়েছেন। অথচ নীতীশকে পুরোপুরি বর্জন করা কঠিন। একপ্রকার অসম্ভবও বটে।
বিহারে আগামী অক্টোবর-নভেম্বর নাগাদ বিধানসভা ভোট হওয়ার কথা। সেদিকে লক্ষ রেখে নীতীশের নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার এখন তাদের কাজের ফিরিস্তি তুলে ধরছে। উলটোদিকে আরজেডি-কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী মহাজোট প্রচারে শাসকের ত্রুটিবিচ্যুতি উঠে আসছে। দুই শিবিরের লড়াই ধীরে ধীরে জমে উঠতে শুরু করলেও নীতীশকে নিয়ে সংশয় যথারীতি বহাল। কারণ, তাঁর অতীত রেকর্ড।
সঙ্গী বদলানোর জন্য নীতীশকে কখনও বড় কারণ খুঁজতে হয় না। তিনি সামান্য কারণে অতীতে বিজেপির সঙ্গ ছেড়েছিলেন। আবার কোনও কারণ ছাড়াই আরজেডি-কংগ্রেসের হাত ছেড়েছিলেন। সদ্য মণিপুরে এন বীরেন সিংয়ের সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করেও পিছু হটে নীতীশ কুমারের দলের কাণ্ড বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বের রাতের ঘুম কেড়েছে। মণিপুরে একজন মাত্র বিধায়ক জেডিইউয়ের। ওই বিধায়ক বিরোধী আসনে বসেন।
গত বুধবার মণিপুরের রাজ্যপালকে জেডিইউয়ের রাজ্য সভাপতি চিঠি লিখে জানিয়ে দেন, তাঁরা এন বীরেন সিংয়ের সরকারকে সমর্থন করছেন না বলে পুনরায় জানানো হল। ওই চিঠির পর ইম্ফলের রাজনীতিতে তো বটেই, যেন ভূকম্পন শুরু হয়ে যায় পাটনা এবং নয়াদিল্লির রাজনীতিতে। শেষমেশ মণিপুরে দলের রাজ্য সভাপতিকে বরখাস্ত করে জেডিইউ এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্ব স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, তারা কেন্দ্র, বিহার এবং মণিপুরে বিজেপির সঙ্গেই রয়েছে।
প্রশ্ন হল, নীতীশকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে তাঁর দলের কোনও রাজ্য সভাপতির বিজেপির সঙ্গ ত্যাগ কতটা বিশ্বাসযোগ্য? সত্যি সেটা হয়ে থাকলে দলে নীতীশের বজ্রমুষ্টি আলগা হওয়ার ইঙ্গিতবাহী। তা তো হয়নি। তাহলে মণিপুরে কাণ্ডটি ঘটল কেন? আর শুধু মণিপুর তো নয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদ্য প্রকাশিত খসড়া নিয়ে বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলি আপত্তি তুললেও এনডিএ-র অন্য শরিকদের মুখে কুলুপ। বেসুরো শুধু নীতীশের দল।
নীতীশ প্রথমবার এনডিএ ছাড়ার সময় কারণ ছিল নরেন্দ্র মোদিকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে মেনে নিতে আপত্তি। গত বছর ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সঙ্গ ছাড়ার সময় তাঁর গোসার কারণ বিরোধীদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং জোটের মুখ নির্বাচনে সিদ্ধান্তহীনতা। তারপর থেকে একাধিকবার বিজেপি নেতৃত্বকে নীতীশ বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, তিনি এনডিএ-তে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন।
তাঁর ওই বার্তা সত্ত্বেও কিন্তু নীতীশকে নিয়ে গুঞ্জন বন্ধ হয়নি। ইতিমধ্যে লালুপ্রসাদ যাদবের মতো পোড়খাওয়া নেতা জানিয়েছেন, তাঁর পুরোনো সহযোদ্ধার জন্য মহাজোটের দরজা খোলাই আছে। নীতীশের আয়ারাম-গয়ারাম রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য বিহারের মুখ্যমন্ত্রিত্বের পথে নিজেকে নিষ্কণ্টক রাখা। বিনা প্রতিরোধে তিনি আবার ওই কুর্সিতে বসতে চান।
নরেন্দ্র মোদির উত্থানের আগে বিজেপির সঙ্গে সমস্যা হয়নি নীতীশের। ২০১৪ থেকে ছবিটা বদলে যায়। তাছাড়া বিহারের রাজনীতিতে লালুপ্রসাদ যাদবের ছেলে তেজস্বীর উল্কার গতিতে উত্থান নীতীশের অস্বস্তি আরও বাড়ায়। ‘ইন্ডিয়া’ জোটে ‘মুখ’-এর আধিক্যে নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন নীতীশ। আসলে যে শিবির তাঁকে বিহারের অবিসংবাদিত নেতা মেনে নেবে, যতক্ষণ মেনে নেবে, ততক্ষণই তিনি সেই শিবিরের সঙ্গে থাকবেন।
বিজেপির বিহারের নেতারা নীতীশকে মুখ তুলে ধরে প্রচার চালাচ্ছেন। সমস্যাটা আসলে অন্য। আসন সংখ্যায় পিছিয়ে থেকে রাজনীতির ময়দানে যে চিরদিন ছড়ি ঘোরানো যায় না, সেটা নীতীশ কুমারের মতো দুঁদে রাজনীতিক বিলক্ষণ জানেন। তাই ভোটের আগে বিহারের ‘সুশাসনবাবু’-কে নিয়ে এত ধন্দ!
