মৌমিতা আলম
ওরা বলে
একজন নারী হয়ে আরেকজন নারীকে ভালবাসা হারাম।
আমি বলি
হারামের স্বাদ কেমন?
ওরা বলে
পাখি হয়ে অন্য পাখিকে খাওয়ার স্বাদ যেমন।
আমি বলি আমি যখন তাঁর কপালে চুমু খাই
আমার মনে হয় প্রথম বর্ষার ফোঁটা আমায় সিক্ত করে
আমার ভিতরে অঙ্কুরোদ্গম হয় হাজার হাজার সবুজ বীজের
আমি দেখতে পাই একটি খাঁচাভাঙা পাখি
পাড়ি দেয় দূরদেশে মুক্ত আকাশে
আচ্ছা একটি পাখিকে মুক্তির আস্বাদ দেওয়াও কি হারাম?
(হারাম কবিতাটির ভাবানুবাদ)
১৯৯৭ থেকে ২০১২-র মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্ম হল জেন জেড প্রজন্ম। অর্থনৈতিক উদারীকরণের মধ্যে, মোবাইল নামক যন্ত্র হাতে নিয়ে জন্ম এই প্রজন্মের। একদিকে তথ্যের বন্যা হাতে, অন্যদিকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিউক্লিয়ার পরিবারের সন্তান হওয়ায় আইসোলেশন– অদ্ভুত এক দোলাচল। ভারতের জেন জেড হল সেই প্রজন্ম যারা বাবরি মসজিদ ভাঙার পরবর্তী রাজনীতির সময় তাদের কৈশোর বয়স পার করেছে। ভারতের বামপন্থী আন্দোলন কিংবা সোশ্যালিস্ট ঘরানা এরা দেখেইনি। এদের বড় হওয়ার সময়ই বাংলায় পতন হয়েছে লালদুর্গের। এসেছে ডানপন্থী দল আর তার পরেই উত্থান বিজেপির। জমি নিয়ে আন্দোলন, শিল্পের আন্দোলন-উত্তর সময়ে বড় হয়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গের জেন জেডদের। বলা যেতে পারে প্রতিযোগিতামূলক কমিউনালিজম বুকে নিয়ে এদের জন্ম। এই সময়েই ক্লাস স্ট্রাগল-এর ভাষা কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতা-র ভাষার বদলে যোগ হয়েছে চরম ঘৃণার ভাষা।
তবে ফেমিনিস্ট বলে নিজেদের দাবি করতে চাওয়া আগের প্রজন্মের দ্বিধা কাটিয়ে এই প্রজন্ম ভাষার শৃঙ্খল থেকে অনেক বেশি মুক্ত। আর সামাজিক মাধ্যম তাদের সেই স্বাধীনতা দিয়েছে। নিজেদের সেক্সুয়াল আইডেন্টিটি-ক্রাইসিস থেকে নিজেদের সেক্সুয়ালিটি ক্লেম করা– সবকিছুতেই তারা সরব। পূর্ববর্তী সাদা পশ্চিমা নারীবাদী তত্ত্বে আটকে না থেকে জেন জেড প্রজন্ম জানে ও বোঝে ইন্টারসেকশনাল ফেমিনিজমকে। কে নারী?– এই প্রশ্নে জেন জেড প্রজন্মের অবস্থান ও ব্যাপ্তি তার আগের জেনারেশনের তুলনায় অনেক বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক। এই প্রজন্মের কাছে নারী দিবস মানে কেবল নারী অধিকার নয়, বরং ‘জেন্ডার ফ্লুইডিটি’, ‘ইন্টারসেকশনাল ফেমিনিজম’ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে নারীত্বের সম্পর্ক। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে উদাসীন আগের প্রজন্মের থেকে জেন জেড প্রজন্ম মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে যেমন অনেক বেশি সচেতন তেমনি অন্যদিকে আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক বেশি মানসিক চাপেও ভুগছে এই প্রজন্ম।
জেন্ডার বা লিঙ্গর দ্বিমূল তত্ত্বে আবদ্ধ না থেকে জেন জেড প্রজন্ম হয়ে উঠেছে অনেক বেশি বর্ণময়, যেন বর্ণালি বা রামধনু। জেন্ডার ফ্লুইড, ডেমিবয়, ডেমিগার্ল, জেন্ডার ক্যুইয়ার-এর মতন অনেক শব্দ ঢুকেছে তাদের অভিধানে। আরোপিত পাপ-পুণ্য দেখার চোখ পালটে জেন জেড প্রজন্ম দেখতে নারীর মতন হলেই তাকে নারী বলে দাগিয়ে না দিয়ে খুব স্বাবলম্বীভাবে দৃঢ়তার সঙ্গে ডেটিং অ্যাপ-এর প্রোফাইলে আকছার লিখছে– প্রেফার্ড জেন্ডার – She/they অথবা ডেটিং এর শুরুতেই—- What’s your pronoun? জিজ্ঞেস করাটা এই প্রজন্মের কাছে খুবই স্বাভাবিক বিষয়।
জেন জেডদের দাবি ও প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেই কেরলে কিছু স্কুল সবার জন্য একই স্কুল পোশাক নিয়ে এসেছে। কিছু স্কুল লিঙ্গসমতাকে জায়গা দিয়ে she/he সর্বনাম-এর সাথে they সর্বনামকে জায়গা দিয়েছে পাঠক্রমে।
কিন্তু লড়াইটা কতটা আলাদা আগের প্রজন্মের নারীদের থেকে?
এই প্রশ্নে খুব দুঃখের সঙ্গে স্বীকার করে নিতেই হয়, জেন জেড নারীদের লড়াই কিন্তু তাদের আগের প্রজন্মের নারীদের থেকে আরও বেশি কঠিন। পুঁজিবাদী সমাজ ও ভোগবাদের কোলে জন্ম নেওয়া প্রায় ৩১% জেন জেড পুরুষ মনে করেন নারীদের পুরুষদের কথা শুনে অবশ্যই চলা উচিত। এই সংখ্যাটি আগের প্রজন্মে ছিল অনেকটাই কম। যেখান ১৩% বেবি বুমারস (যাদের জন্ম ১৯৪৬-’৬৪), ২১% জেন এক্স (যাদের জন্ম ১৯৬৫-১৯৮০), ২৯% মিলেনিয়ালাস (যাদের জন্ম ১৯৮০-’৯৭) মনে করতেন স্ত্রীদের উচিত স্বামীদের সেবা করা। আপাতদৃষ্টিতে নারীদের অবস্থা উন্নত মনে হলেও পরিসংখ্যান কিন্তু বলছে পিতৃতন্ত্র বাড়ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। কোনও নিস্তার নেই নারীর। বেবি বুমার্স, মিলেনিয়াল কিংবা জেন এক্স-এর সঙ্গে তাই আজও একই লড়াইয়ে দাঁড়িয়ে জেন জেড নারীরাও। যে সাদা নারীবাদ থেকে এগিয়ে গিয়ে বিবর্তিত পরিস্থিতিতে এসেছে ইন্টারসেকশনাল ফেমিনিজম, সেই সাদা পশ্চিমা নারীবাদ যে আজও কতটা স্ব-রূপে বিদ্যমান তার প্রমাণ ইরানের উপর আমেরিকার আগ্রাসন। সাদা পশ্চিমা নারীবাদ মনে করে বোমা ফেলে মুক্ত করা সম্ভব ইরানীয় নারীদের! তাই খামেনেইয়ের ছবি জ্বালিয়ে যখন ধূমপান করে এক ইরানীয় নারী– সেটা পশ্চিমা সাদা নারীবাদীরা সেলিব্রেট করে, কিন্তু আমেরিকার বোমা যখন ইরানের স্কুলে পাঠরতা দুশোর কাছাকাছি বাচ্চা মেয়েকে হত্যা করে তখন পশ্চিমা নারীবাদ চুপ করে থাকে।
ক্রমশ বাড়তে থাকা দূষণ, ক্যাপিটালিজমের হাত ধরে বাড়তে থাকা দক্ষিণপন্থী একনায়কতন্ত্রর উত্থানে বিপর্যস্ত জেন জেড নারীরা।
পুঁজিবাদ-এর হাত ধরে বাড়ছে একনায়কতন্ত্র ও মৌলবাদ– যা আখেরে লড়াই কঠিন করে দিচ্ছে জেন জেড নারীদের জন্য। হোমো ক্যাপিটালিজম নিজের লাভের জন্য নতুন নতুন পদ্ধতিতে গিলে ফেলতে চাইছে পুঁজিবাদ বিরোধী আন্দোলনকেও। এর এক অন্যতম উদাহরণ পিঙ্ক ওয়াশিং : লাভের জন্য বড় বড় সংস্থার দেখনদারি সমর্থন এলজিবিটিকিউ প্লাস কমিউনিটিকে।
সরকারি চাকরির সংখ্যা কমছে। তাঁর সঙ্গে কমছে জীবনের নিশ্চয়তা। নারী ও পুরুষের মধ্যেকার আয়ের বৈষম্য আছেই। এখনও জেন জেড পুরুষরা একই কাজ করে নারীদের থেকে বেশি আয় করে। তার সঙ্গে আছে গিগ ইকনমি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যারা ডেলিভারি করছে আর যারা অর্ডার করছে– এই দুই চরম অর্থনীতিক, সামাজিক বৈষম্যপূর্ণ ভারতবর্ষে বাস করছে জেন জেডরা, একদিকে সব আছে আরেকদিকে কিছুই নাই-এর ভারতবর্ষ। চা শিল্প থেকে বিড়ি বাঁধা, গার্মেন্টস থেকে পরিচারিকা, কিংবা পরিযায়ী — জেন জেড শ্রমিক মেয়েদের ভিড় বাড়ছে, মজুরি আর নিরাপত্তা কমছে। তাদের রঙিন স্বপ্ন বাড়িয়ে চলেছে পুঁজিবাদ, কিন্তু সঞ্চয় নেই! ব্যবস্থার ক্লেদ চাপা দিতে আর জিনিসের বিক্রি বাড়াতে শ্রমজীবী নারী দিবস থেকে প্রায়ই ছেঁটে দেওয়া হয় শ্রমজীবী কথাটা। জেন জেড শ্রমিক মেয়েদের তো আর ছেঁটে ফেলা যাবে না, তাই ছেঁটে দাও তার ছুটি বা সামাজিক সুরক্ষা, কিংবা শখ-আহ্লাদগুলো। শ্রেণির শিখরে বসা জেন জেড নারীরা গে, লেসবিয়ান, ডেমি সেক্সুয়াল কিংবা হোমো সেক্সুয়াল বলেও টিকে থাকার সুযোগ যতটা, নিম্নবর্গীয় শ্রেণিতে সেই সুযোগ নেই বললেই চলে। তাই আজকের নারী দিবসে জেন জেড নারীর জন্য সুবিধে যে তারা অন্ততপক্ষে ডেটিং অ্যাপ-এ গিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলে এক সঙ্গী জোগাড় করে নিতে পারে, কিংবা হাত ধরে বড় শহরের ভিড়ে হারিয়ে যেতে পারে কিন্তু বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিজের পছন্দের স্বাধীনতার দাবি ততটাই কঠিন, যতটা আগে ছিল। আর্থিক স্বাধীনতা ছাড়া লিঙ্গসমতা, বর্ণসমতা সম্ভব নয়। আর এইসব সমতার দাবিতে একত্রে আন্দোলনের জন্য দরকার সঠিক রাজনীতির পাঠ। সেই রাজনীতির পাঠ তো কোনও হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি দেবে না। তবুও আশা জোগায় গ্রেটা থুনবার্গ-এর মতো লোকজন বা সেই নারী বন্ধুটি, যে মেনকা গুরুস্বামী রাজ্যসভায় প্রার্থী হয়েছেন শুনে খুশি হয়ে প্রশ্ন করে, এবার কি ভারতে সেম সেক্স বিবাহ আইনসিদ্ধ হবে? মেনকা কি এই প্রশ্ন তুলবেন? আশা জোগায় দুজন নারীর ভালোবাসা নিয়ে accused-এর মতো মেইনস্ট্রিম সিনেমা। যা কিছুদিন আগেও ছিল কল্পনার অতীত।
আসলে এই যে প্রশ্ন করতে পেরেছেন, পারছেন এটাই আশা জোগায়। যুগের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে জেন জেড নারীরা নিশ্চিত আগের প্রজন্মের থেকে ব্যাটন তুলে নিয়ে আরও তীব্র বেগে দৌড়াবেন। আশা তো করাই যায়। নারী দিবসে জেন জেড নারীকে এই শুভেচ্ছা জানানো ছাড়া এক মিলেনিয়াল নারীর আর কী-ই বা করার থাকতে পারে?
(লেখক শিক্ষক ও অক্ষরকর্মী)
