জাতীয়করণ আর বেসরকারিকরণের বৃত্ত

জাতীয়করণ আর বেসরকারিকরণের বৃত্ত

শিক্ষা
Spread the love


সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

ব্যাংককর্মী স্বামী সুব্রতর (অনিল চট্টোপাধ্যায়) আয় যথেষ্ট নয়৷ সংসারের কথা ভেবে রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহবধূ আরতি (মাধবী মুখোপাধ্যায়) সওদাগরি অফিসে সেলসের চাকরি নেন৷ চাকরি করতে বেরিয়ে আরতি তাঁর নবলব্ধ আর্থিক ও মানসিক স্বাধীনতাটি পুরোদমে উপভোগ করতে শুরু করেন। কিন্তু বাড়ির লোকেদের বিশেষত বৃদ্ধ শ্বশুরের ভীষণ অমত বৌমার এভাবে চাকরি করতে বাড়ির বাইরে যাওয়া৷ অগত্যা স্বামীর সঙ্গে কথা বলে তিনি ঠিক করেন চাকরি ছেড়ে দেবেন৷ কিন্তু যেদিন চাকরি ছাড়ার কথা জানাতে অফিসে যান সেদিনই হঠাৎ সুব্রতদের ব্যাংক ফেল করায় তিনি বেকার হয়ে পড়েন৷ সুব্রত ফোন করে আরতিকে জানান আপাতত চাকরি না ছাড়তে৷ এই গল্প কারও অজানা নয়৷ যেহেতু সত্যজিৎ রায়ের ‘মহানগর’ সিনেমাটি অনেকেরই দেখা৷ ছবির পটভূমি পাঁচের দশকের কলকাতা। গত শতাব্দীর ছয়ের দশকে মুক্তি পাওয়া ছবিটি নরেন্দ্রনাথ মিত্রের কাহিনী অবলম্বনে তৈরি।

আসলে বর্তমান প্রজন্ম সেভাবে পরিচিত নয় ‘ফেল’ কথাটার সঙ্গে৷ কিন্তু স্বাধীনতার আগে বলে নয়, তার পরেও বেশ কয়েক বছর এদেশে হঠাৎ হঠাৎ ব্যাংকে তালা পড়ত৷ সেজন্য একদিকে কাজ হারাতেন সেই ব্যাংকের কর্মীরা (যেমন মহানগর ছবিতে কাজ হারিয়েছিলেন সুব্রত) তেমনই আবার অন্যদিকে সেখানে সঞ্চিত টাকা রেখে সর্বস্ব খুইয়ে পথে বসতেন গ্রাহক বা আমানতকারীরা৷ স্বাধীনতার পর থেকে জাতীয়করণের ঠিক আগে পর্যন্ত ৩৫০–এর বেশি ব্যাংক ফেল করেছিল৷ সেখানে ব্যাংক জাতীয়করণের পরে ব্যতিক্রমী কিছু ঘটনা ছাড়া এখন সেভাবে ব্যাংক ফেল হতে দেখা যায় না৷ তেমন কিছু আঁচ পেলেই কেন্দ্রীয় সরকার এবং রিজার্ভ ব্যাংক পরিত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে কোনও শক্তিশালী ব্যাংককে দিয়ে ওই দুর্বল ব্যাংককে অধিগ্রহণ করিয়ে নেয়৷

জাতীয়করণের আগে দেখা গিয়েছিল, ব্যাংক নিছক পুঁজিপতিদের স্বার্থে কাজ করছে এবং কৃষক ও প্রান্তিক মানুষজনের কথা ভাবছে না৷ ব্যাংক ছোট ব্যবসায়ী, কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে না৷ অর্থাৎ সকলের কাছে ব্যাংক ব্যবস্থা যাচ্ছিল না৷ যদিও ব্যাংক অধিগ্রহণের বিরোধী ছিলেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী তথা উপপ্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই৷ তবে মোরারজির মতকে অগ্রাহ্য করে ১৯৬৯ সালের ১৯ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি জনস্বার্থে ব্যাংক জাতীয়করণ করার কথা ঘোষণা করেন৷ তবে মোরারজি যাতে এই ব্যাপারে কোনও বাধা সৃষ্টি করতে না পারেন তার জন্য কয়েকদিন আগেই তাঁর কাছ থেকে অর্থমন্ত্রক কেড়ে নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছিলেন ইন্দিরা৷ অবশ্য সেই সময় থেকেই ইন্দিরা বিরোধীরা বলে আসত, আদৌ কোনও জনস্বার্থ নয়, ক্ষমতা কুক্ষিগত করার উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী ব্যাংক জাতীয়করণ করেছেন৷ পরবর্তীকালে বিরোধীরা প্রচার চালায়, ইন্দিরা গান্ধির জাতীয়করণ নীতি বিশেষত ব্যাংকের রাষ্ট্রায়ত্তকরণ একটি ভয়ানক অর্থনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত৷ কিন্তু মনে রাখা উচিত, জাতীয়করণের ফলে সকলের কাছে ব্যাংক পরিষেবা না পৌঁছালেও মোটামুটি প্রতি পাঁচজনের মধ্যে চারজনের কাছে তা পৌঁছেছিল৷ দূরদূরান্তের গ্রামে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক শাখা খুলতে এগিয়ে আসে৷ তার আগে লাভজনক নয় বলে এভাবে গ্রামীণ শাখা খুলতে আগ্রহী ছিল না বেসরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলি৷

আবার নানাভাবে সমালোচকরা আঙুল তোলেন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলির বিরুদ্ধে। একদিকে রাজনৈতিক প্রভুদের ফোনকলের উপর ভিত্তি করে দেওয়া ঋণের জেরে এই ব্যাংকগুলির প্রচুর লোকসান হয়েছে, অন্যদিকে কোনওরকম প্রতিযোগিতার অভাবে এইসব ব্যাংকের কর্মীরা অদক্ষ হয়ে গিয়েছেন আর পরিষেবা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ১৯৯১ সালের পর থেকে মুক্ত অর্থনীতির দিকে দেশ ঝোঁকে৷ এর কিছুদিনের মধ্যেই নতুন প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংকের জন্ম হতে থাকে এবং শুরু হয়ে যায় ধাপে ধাপে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শেয়ার বিক্রি৷ বর্তমান মোদি সরকারকেও রাজকোষের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক, বিমা ও অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নিকরণের দিকে ঝুঁকতে দেখা গিয়েছে৷ পাশাপাশি, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে অধিগ্রহণ অথবা সংযুক্তিকরণের মাধ্যমে৷ বর্তমান সরকারের এমন আর্থিক নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন ব্যাংকের কর্মী ও অফিসাররা৷ জনমত তৈরি করতে কিছুদিন আগে থেকেই ‘ব্যাংক বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ নামে স্লোগান তুলে নতুন মঞ্চ গড়ে উঠেছে।

বেসরকারিকরণের সমর্থকরা প্রচার করেন, সরকারি সংস্থা মানে অপদার্থ এবং বেসরকারি মানেই তা দক্ষ৷ বাস্তব কি সেকথা বলে? নইলে ১৯৯৪ সালের পরে বেশ কয়েকটি ঝাঁ চকচকে বেসরকারি ব্যাংকের আবির্ভাব ঘটলেও সেগুলির অনেকগুলিকেই এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ব্যর্থ হওয়ায় সেগুলিকে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে অন্য কোনও শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে৷ ২০০৮ সালে মার্কিন মুলুকে এআইজি এবং লেম্যান ব্রাদার্সের পতনের জেরে, শুধু সে দেশ নয় গোটা দুনিয়ার অর্থ ব্যবস্থা কেঁপে উঠেছিল৷ তখন বহু বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক সংস্থায় লালবাতি জ্বলেছিল৷ সেই সংকটকালে অন্য দেশের তুলনায় ভারতের অর্থনীতি তেমন কোনও আঘাত পায়নি কারণ এ দেশের ব্যাংকগুলির মালিকানা মোটের উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণে ছিল৷ তারপরে অবশ্য দেড় দশকেরও বেশি সময় কেটে গিয়েছে। ভারতের ব্যাংক ব্যবস্তাতেও অনেক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে৷ এখন আর তখনকার মতো সরকারের হাতে ব্যাংকের ততটা মালিকানা নেই৷

বর্তমানে এদেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রধান দুশ্চিন্তার বিষয় অনুৎপাদক সম্পদ বৃদ্ধি৷ যে কোনও ঋণ মকুবই ব্যাংকের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর৷ কিন্তু কৃষকদের ঋণ মকুবের কথা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই ফলাও করে প্রচার করা হলেও তার চেয়ে অনেক বড় অঙ্কের টাকা শিল্পপতিদের ঋণের জন্য মকুব করা হলে তা রাজনৈতিক কারণেই চেপে যেতে দেখা যায়৷ ঋণ না মেটাতে পেরে কৃষক আত্মহত্যার ঘটনা প্রায়ই ঘটে৷ যদিও ব্যতিক্রমী দু’-একটা ঘটনা বাদ দিলে সেভাবে কোনও শিল্পপতিকে ঋণের টাকা মেটাতে না পেরে আত্মহত্যা করতে দেখা যায় না৷ বরং রাজনৈতিক নেতাদের ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী হওয়ায় ব্যাংকের পাওনা না মিটিয়ে সহজেই দেশ ছেড়ে পালাতে পারেন বিজয় মালিয়া, নীরব মোদির মতো কর্পোরেট জগতের তারকারা৷

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ত্রুটিমুক্ত নয় ঠিকই৷ সরকারি নিয়ন্ত্রণের দরুন ব্যাংকের কার্যকলাপ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়৷ তবু রাষ্ট্রায়ত্ত থাকলে সরকারের একটা দায়বদ্ধতা থাকে যার ফলে গ্রাহক বা আমানতকারীদের টাকা সুরক্ষিত থাকে৷ কিন্তু ব্যাংক বেসরকারিকরণ হলে সেই দায়টা সরকার সহজেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে৷ ব্যাংক ফেল করলে গ্রাহক বা আমানতকারী আগে সর্বোচ্চ এক লক্ষ টাকা পেতেন, সেটা কিছুদিন আগে বাড়িয়ে পাঁচ লক্ষ করা হয়েছে৷ এই ঘটনায় ব্যাংক ফেলের আশঙ্কা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে- যখন এক লক্ষ টাকা ধার্য করা হয়েছিল তখনকার বাজারদরের সাপেক্ষে আজকের বাজারদরে পাঁচ লক্ষ টাকা আদৌ যথেষ্ট কি না? সব মিলিয়ে আর্থিক নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেকেই ইন্দিরার ব্যাংক জাতীয়করণ নীতি ফের আঁকড়ে ধরতে চাইছেন৷ ব্যাংক জাতীয়করণ আর বেসরকারিকরণের বৃত্ত যেন চক্রাকারে ঘুরে চলেছে৷

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *