জল বাঁচলে বাঁচবে জীবন

জল বাঁচলে বাঁচবে জীবন

শিক্ষা
Spread the love


 

  • সৈয়দ তানভীর নাসরীন 

২০১৯ সালে জলসংকটের সময় চেন্নাইয়ের এক আবাসন একটি সদ্য তৈরি হওয়া ‘স্টার্ট-আপ’-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে। ‘স্টার্ট-আপ’-টির নাম ছিল ‘উই গট অ্যাকুয়া সিস্টেম’। যদি কেউ ২০১৯-এর চেন্নাই শহরের সেই ভয়ংকর সংকটের কথা মাথায় রাখেন, তাহলে বুঝতে পারবেন কতটা সংকটে পড়ে তামিল ভূমের অধিবাসীরা ওই প্রযুক্তিবিদদের সাহায্য নেওয়ার কথা ভেবেছিলেন! ওই নতুন ‘স্টার্ট-আপ’ সংস্থাটি আবাসনে এক ধরনের মিটার বসিয়ে দেয়। ঠিক এক মাসের মাথায় দেখা যায়, ওই আবাসন দিনে যত জল ব্যবহার করত তার প্রায় অর্ধেক কমে গিয়েছে। অর্থাৎ, এক ধাক্কায় দৈনিক গড়ে মাথাপিছু ২৩৪ লিটার জল খরচ কমে এসে দাঁড়িয়েছে ১১৯ লিটারে। শুধু আবাসনটিকে যদি উদাহরণ হিসেবে, মানে ‘স্যাম্পল সার্ভে’-র স্যাম্পল হিসেবে নেওয়া যায়, তাহলে ওই ‘স্টার্ট-আপ’-এর আধুনিক প্রযুক্তির দৌলতে চেন্নাইয়ের ওই আবাসন বছরে ৪ লক্ষ ৮০ হাজার লিটার জল বাঁচাচ্ছে।

চেন্নাই, হায়দরাবাদ কিংবা বেঙ্গালুরু, দক্ষিণের যে তিন শহর বা বলা ভালো আধুনিকতম ‘মেট্রোপলিস’ জলের অভাবে ধুঁকছে, সেই তিনটি শহরের বাস্তব অভিজ্ঞতাই আমাদের বলে দেয় যে, জলবায়ু পরিবর্তন আর শুধু বইয়ের পাতায় আটকে নেই, আমাদের নিত্যদিনের জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। দক্ষিণের ওই শহরগুলিকে যাঁরা চেনেন, যেমন কর্মসূত্রে আমি খুব ঘনিষ্ঠভাবে দক্ষিণ ভারতকে চিনি, তাঁরা জানেন যে, ওখানে জলসংকটের সমাধানের জন্য কত ‘হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ’ চলে বা ফেসবুকে আজ এক বালতি জলের দাম কত যাচ্ছে, তার আপডেট দেওয়াটা কত নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সেই কারণেই চেন্নাই এবং বেঙ্গালুরু ‘উরাভা ল্যাব’ কিংবা ‘অ্যাকভো’ সৌরশক্তিচালিত যন্ত্র নিয়ে এসেছে, যা বাতাস থেকে জল তৈরি করছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ২০১৯ সালে চেন্নাইয়ের মাটির তলার জলস্তর একেবারে শুকিয়ে যাওয়ার পর কিংবা বেঙ্গালুরুতে সাম্প্রতিককালে সব ঝগড়া ভুলে মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া এবং উপমুখ্যমন্ত্রী ডিকে শিবকুমার জলসংকট মেটাতে নেমে পড়লেও আসলে সমস্যার মূল আরও অনেক গভীরে। ভারতবর্ষের প্রায় কোনও শহরের ভূগর্ভে আর জল নেই। দিল্লি, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, চেন্নাই সব শহরেই অবস্থাটা মূলত এক।

‘নো ওয়ান ইজ টু স্মল’, গ্রেটা থুনবার্গের বিখ্যাত বই। সত্যিই তো সুইডেনের পার্লামেন্টের বাইরে প্রতি শুক্রবার দাঁড়িয়ে যে ছাত্রীটি ‘ফ্রাইডে ফর ফিউচার’, আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল, সেই সময় কে ভেবেছিল এক একক ছাত্রীর আন্দোলন গোটা বিশ্বের তরুণদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবে? পরবর্তী প্রজন্মরা ভাবতে শুরু করবে আজকের লাভের বিনিময়ে, আজকের ‘প্রফিট ম্যাক্সিমাইজেশন’ বা ‘সর্বোচ্চ লাভের আশা’ ভবিষ্যতের পায়েই কুড়ুল মারা হচ্ছে না তো? গ্রেটা থুনবার্গ নিশ্চয়ই আন্দোলন শুরুর সময়ে সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই বিখ্যাত কবিতা পড়েননি আর তখনও তো তাঁর ১৮ বছর বয়সই হয়নি! কিন্তু গ্রেটা থুনবার্গ ২০১৮ থেকে যে কথাগুলো বলতে শুরু করলেন, তা ইউরোপের তরুণ প্রজন্মকে নতুনভাবে ভাবতে শেখাল। ইউরোপের বড় বড় শহরে পরিবেশের জন্য যে আন্দোলন গড়ে উঠল, তা তৈরি হল ওই বিশ্বাস থেকে, ‘নো ওয়ান ইজ টু স্মল’।

চিনের তিয়েন আনমেন স্কোয়ারে গণতন্ত্রকামী ছাত্রদের আন্দোলন থামাতে ট্যাংক পাঠানোর সেই কালো দিনগুলির কথা যদি কারও মনে থাকে, তাহলে ওই ভিজুয়ালসটাও নিশ্চয়ই মনে আছে! ট্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক সাহসী চরিত্রের অদমনীয় জেদের আবছা ভিজুয়াল। যা ছিল গ্রেটা থুনবার্গের একক আন্দোলন, তাই ইউরোপ-আমেরিকার বুকে সমষ্টির আন্দোলন হয়ে প্রতিরোধের মশাল জ্বালিয়ে দিল। সংগত কারণেই গ্রেটা থুনবার্গ যেমনভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বেঁধেন, তেমনই তিনি শি জিনপিংকে, চিনের একনায়কতন্ত্রী শাসককেও পরিবেশকে নষ্ট করে দেওয়ার দায়ে কাঠগড়ায় তোলেন। আমরা যারা এশিয়ায় থাকি, তারা যখন চিনের চোখধাঁধানো উন্নয়নের কথা শুনি, তখন হয়তো সবসময় বুঝতে পারি না বিরাট শহর, আটতলা ফ্লাইওভার আর বাঁধের পরে বাঁধ দিয়ে ‘লাল চিন’ আসলে দক্ষিণ এশিয়ার পরিবেশকে কতটা বিপন্ন করে তুলেছে। একটা সহজ পরিসংখ্যান দেওয়া যাক। দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান ২০টি নদী যেসব হিমবাহ থেকে বেরিয়েছে সেইসব হিমবাহই চিনে রয়েছে। তাই বেজিংয়ের বাঁধ দেওয়ার সিদ্ধান্ত যতটা ভারতকে বিপন্ন করে, ততটাই কমিউনিস্টশাসিত ভিয়েতনামের সঙ্গেও মেকং নিয়ে সংঘাত তৈরি করে রেখেছে।

চিন, আমেরিকার পরিবেশ নিয়ে ভ্রান্ত নীতি, যাকে গ্রেটা বলেছেন সবচেয়ে বেশি ‘গ্লোবাল সাউথ’ বিপন্ন করছে, সেই বাস্তবতাকে বৃহৎ চিত্রের মধ্যে রেখে একটু আমাদের দেশের লড়াইগুলিকে দেখা যাক। এবং আমাদের দেশের লড়াইকে দেখতে গেলে যেটা আমাকে সবচেয়ে ভালো লাগায়, তা এই লড়াইয়ের একেবারে সামনের সারিতে রয়েছেন মহিলারা। সুমাইরা আব্দুল্লালি তাঁর ‘আওয়াজ’ নামে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিয়ে মুম্বইতে যে লড়াই দিয়েছেন, তাকেই হয়তো আর একটু প্রসারিত করেছেন নর্মা আলভারেজ, গোয়ার যে আইনজীবী উপকূল বাঁচাতে বা সমুদ্র তীরবর্তী ‘ইকো সিস্টেম’ রক্ষায় একের পর এক মামলা করে গিয়েছেন। বেঙ্গালুরুর গর্বিতা গুলাঠির কথাই ধরুন, যাঁর ‘হোয়াই ওয়েস্ট?’ প্রচারাভিযান দেখাল যে, রেস্তোরাঁয় ৭০ শতাংশ জল নষ্ট হয় আর শহরের প্রান্তিক মানুষ জল পাচ্ছেন না। আমি সবসময় বিশ্বাস করি, দৈনন্দিন গৃহস্থালি সামলাতে সামলাতে মহিলারা যে ‘ম্যানেজমেন্ট’ শেখেন, যে পরিচালন দক্ষতা তাঁদের করায়ত্ত হয়, তাই আসলে তফাত বদলে দিতে পারে। বেঙ্গালুরুর সেইসব ‘স্টার্ট-আপ’-এর কথা ধরুন, যারা আবাসনের পর আবাসনে প্রয়োগ করে দেখাল যে, অন্তত ৭০ শতাংশ ‘নষ্ট জল’ পরিশোধন করে পুনরায় ব্যবহার করা যায়। সত্যিই তো, বাগান পরিচর্যার নামে, গাড়ি ধোয়ার নামে এমনকি শাওয়ার থেকে শরীর ভেজানোর ছলে যে জল বয়ে যায়, তাকে পুনর্ব্যবহার করতে পারলে তো বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদের মতো শহরে জলসমস্যার অনেকটাই সমাধান হয়ে যাবে। বেঙ্গালুরুর এই ‘স্টার্ট-আপ’-গুলো দেখিয়েছে যে, আমরা প্রতিদিন যে জল ব্যবহার করি, তার মধ্যে ৩০ শতাংশ একেবারে বর্জ্য। অর্থাৎ, ‘সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’ ছাড়া সেই জলকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা যাবে না। কিন্তু বাকি ৭০ শতাংশ জলকেই সামান্য উদ্ভাবন শক্তি ব্যবহার করে, সামান্য যন্ত্রপাতি দিয়েই আবার নিজেদের প্রয়োজনে লাগানো যেতে পারে।

তাহলে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে? ট্রাম্প এবং শি জিনপিং যখন অন্তর থেকে পরিবেশবাদী যে কোনও আন্দোলনকে অপছন্দ করেন, তখন ভারতবর্ষের অতি দক্ষিণপন্থী রাজনীতিও কি পরিবেশ সংক্রান্ত প্রশ্নকে ‘বুলডোজার’-এ গুঁড়িয়ে দিয়ে, উন্নয়নের ‘রোল মডেল’ সামনে আনতে চায় না? নিশ্চয়ই চায়। কিন্তু একইসঙ্গে সত্যি, ভারতবর্ষের তরুণ প্রজন্মও ভাবছে, হয়তো গ্রেটা থুনবার্গের মতো করেই ভাবছে, হয়তো ইউরোপের তরুণ প্রজন্মের মতো করেই প্রশ্ন তুলছে, আজকের কথা ভাবতে গিয়ে ভবিষ্যৎ বরবাদ হয়ে যাচ্ছে না তো? সেইজন্যেই নির্বাচনের প্রতিশ্রুতিতে পরিবেশের কথা আসছে, দাবিপত্রে বনাঞ্চল এবং উপকূল অঞ্চলকে বাঁচানোর তীব্র আর্তি জায়গা করে নিচ্ছে। এই যে যশোর থেকে বারাসাতের রাস্তাকে সুগম করতে যশোর রোডের বিশাল বিশাল গাছগুলি কেটে ফেলা হল না, সেটা তো এই পরিবেশ সচেতনতারই উদাহরণ। একদিকে যেমন দক্ষিণের শহরগুলি প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানকে ব্যবহার করছে সমস্যার মোকাবিলায় তেমনই পরিবেশ বাঁচাতে তরুণ প্রজন্মের স্বরও ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।

(লেখক বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *