গণতন্ত্রের অপরিহার্য অঙ্গ ভোট। স্বচ্ছ, অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোট গণতন্ত্রের ভিত্তিকে মজবুত করে। ভোট প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ রাখতে ভোটার তালিকা ত্রুটিমুক্ত হওয়া উচিত। এই গুরুদায়িত্বটি নির্বাচন কমিশনের। সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজটি নির্বিঘ্নে সেরে ফেলাই দস্তুর। অতীতে তেমনই হত।
কিন্তু এবার পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) নিয়ে নির্বাচন কমিশন এবং রাজ্য সরকারের দ্বৈরথ নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিটি পদক্ষেপে কমিশন বনাম রাজ্যের দ্বন্দ্ব খবরের শিরোনাম হচ্ছে। বিএলও-দের আত্মহত্যা থেকে খসড়া তালিকা থেকে নাম বাদ, আধিকারিক নিয়োগ থেকে শুনানি- সবেতেই বেনজির সংঘাত ঘটছে।
সুপ্রিম কোর্ট একারণে হতাশা ও বিরক্তি প্রকাশ করে বকেয়া শুনানির ভার দিয়েছে বিচার বিভাগের ওপর। এতে ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের তারিখ নির্ধারিত থাকলেও শুনানি প্রক্রিয়ার জটের নিষ্পত্তি করে সময়ে প্রকাশ করা যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকে যাচ্ছে। প্রকাশিত হলেও হয়তো সেটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা হবে না। ফলে রাজ্যের ভোটারদের মনে অনিশ্চয়তার মেঘ জমাট বেঁধেছে।
পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে দেশের আরও ১১টি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর হচ্ছে। বিহারে নির্বাচনের ঠিক আগেও এসআইআর হয়েছিল। সেখানে বেশ কিছু খামতিও ধরা পড়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কমিশন বনাম রাজ্য সরকারের সংঘাত যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা অন্য কোনও রাজ্যে দেখা যায়নি।
তামিলনাডুর ভোটার তালিকা থেকে ৭৪ লক্ষ নাম, গুজরাটে বাদ পড়েছে ৬৮ লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম। মধ্যপ্রদেশে ৩৪ লক্ষের বেশি, কেরলে প্রায় ৯ লক্ষ বাদ পড়েছে। কিন্তু কোনও রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের মতো শোরগোল নেই। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে তামিলনাডু এবং কেরলে বিধানসভা ভোট হওয়ার কথা। বাংলার মতো ওই দুটি রাজ্যে বিজেপি বিরোধী সরকার রয়েছে।
অথচ সব রাজ্যকে ছাপিয়ে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এ সর্বাধিক জটিলতা, বিতর্ক, সংঘাত এবং চাপানউতোর চলছে। এসআইআর চলাকালীন বিএলও-দের আত্মহত্যার ঘটনা বাংলার পাশাপাশি অন্য কিছু রাজ্যেও হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিতর্ক চরমে। অথচ এসআইআর-এর মতো একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ঘিরে এত বিতর্ক হওয়ার কথাই নয়।
গত কয়েকমাস ধরে রাজ্যজুড়ে এই সংঘাতের দায় নির্বাচন কমিশনও এড়িয়ে যেতে পারে না। কমিশনের তৎপরতা ঘিরে যেসব প্রশ্ন উঠছে, তার গুরুত্ব আছে। কমিশনের দায়িত্বশীলতাও প্রশ্নের মুখে। অন্যদিকে, এসআইআর-এর অজুহাতে বিজেপির লাগাতার পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে রোহিঙ্গা, অনুপ্রবেশকারীদের তাড়ানোর হুমকি বাস্তবসম্মত ছিল না।
তাছাড়া নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগও কম নয়। ভোট চুরির মতো মারাত্মক অভিযোগও উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর প্রতিটি ধাপে কমিশনের গাজোয়ারি মনোভাবও দেখা গিয়েছে। যাতে মনে হতে পারে, কমিশন দেশের মানুষকে বিশ্বাস করে না। সুপ্রিম কোর্টে একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কমিশনের বিরুদ্ধে গুচ্ছ গুচ্ছ নালিশ জানানোয় বুঝতে অসুবিধা হয় না, কমিশনের সঙ্গে রাজ্যের পারস্পরিক বিশ্বাসের ঘাটতি কোন উচ্চতায় চলে গিয়েছে।
স্বাধীন ভারতে নির্বাচন করানোর যে ইতিহাস ও পরম্পরা আছে, তার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে বাংলায় এসআইআর হয়নি বলেই শেষলগ্নে বিচার বিভাগকে এই প্রক্রিয়ায় শামিল করাতে হয়েছে। এসআইআর-এর মতো একটি সময়সাপেক্ষ কাজকে দ্রুততার সঙ্গে শেষ করার প্রয়োজন ছিল না। বরং আরও আগে থেকে কাজটি শুরু করলে এই বেনজির সংঘাত হয়তো এড়ানো যেত।
কমিশনের কথায় ও কাজে নিরপেক্ষতা না থাকার অভিযোগ ওঠা এই সংঘাতের বড় কারণ। অন্যদিকে, কমিশনকে নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বিজেপির রে রে করে ওঠা পক্ষপাতের ধারণাকে জোরালো করছে। তৃণমূল এবং বিজেপি- উভয় পক্ষই দলীয় স্বার্থ চরিতার্থ করতে এসআইআর-কে ব্যবহার করছে। সবকিছুতেই রাজনীতির ছোঁয়ার পরিণাম এটাই।
