চোখে বাত! প্রতিরোধ করবেন কীভাবে? – Uttarbanga Sambad

চোখে বাত! প্রতিরোধ করবেন কীভাবে? – Uttarbanga Sambad

শিক্ষা
Spread the love


অটোইমিউন বা রিউমাটোলজিক ডিজিজ শুধু জয়েন্টকেই টার্গেট করে না, বরং এই রোগের কারণে ইমিউন সিস্টেম ভুল করে সুস্থ টিস্যুকে আক্রমণ করে, যা চোখ সহ শরীরের যে কোনও অঙ্গে প্রভাব ফেলতে পারে। এই অবস্থায় চোখে প্রদাহ বা জ্বালার কারণে অস্বস্তি হতে পারে এবং দৃষ্টিশক্তি কমে যেতে পারে। এমনকি চিকিৎসা না করা হলে স্থায়ী ক্ষতিও হতে পারে। তাই বলে আতঙ্কিত হবেন না। ভালো খবর হল, দ্রুত রোগনির্ণয় এবং সঠিক যত্নের মাধ্যমে বেশিরভাগ জটিলতাই প্রতিরোধ করা যেতে পারে। লিখেছেন এশিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ইমিউনোলজি অ্যান্ড রিউমাটোলজির বিশেষজ্ঞ ডাঃ অর্ঘ্য চট্টোপাধ্যায়।

৫৪ বছর বয়সি বরুণ মিত্র। অফিস করে, আড্ডা মেরে, খেয়েদেয়ে দিব্যি কাটছিল জীবন। কিন্তু এমন মসৃণ জীবনে বাদ সাধল তাঁর চোখ। ছয় মাস ধরে চোখ প্রায়ই অল্পবিস্তর লাল হয়ে যাচ্ছিল। প্রথম প্রথম ওষুধের দোকান থেকে ড্রপ কিনে চোখে দিয়ে উপকার পেলেও শেষমেশ ডাক্তারবাবুর দ্বারস্থ হতে হয়। প্রথম ধাপে কনজাংটিভাইটিস বলেই ভাবা হয়েছিল। চার-পাঁচরকমের ড্রপ ব্যবহারেও যখন সমাধান হল না তখন বরুণবাবুর চিন্তা বাড়ল, চোখে কী এমন অসুখ ধরল যে কোনও ড্রপেই সারছে না। বরং দিনদিন চোখের ব্যথা, লালভাব বেড়েই চলেছে। এমনকি এখন ড্রপ দিয়েও আগের মতো আরাম পাওয়া যাচ্ছে না।

চোখের এমন অবস্থায় তিনি ছুটলেন দক্ষিণের চোখের হাসপাতালে। সেখানেও বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা করে নির্দিষ্ট কিছু পাওয়া গেল না। শেষে চোখে টিবি হয়েছে কি না সেই চিন্তা করে শুরু হল টিবির চিকিৎসা। কিন্তু তাতে বিপত্তি বাড়ল আরও। অবশেষে তাঁকে বলা হল চোখে বোধহয় বাত হয়েছে। রিউমাটোলজিস্টের কাছে যেতে হবে। চোখে বাত! শুনে তো বরুণবাবু আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন, ‘গাঁটে গাঁটে বাত হয় শুনেছি, কিন্তু চোখে বাত তো কখনও শুনিনি।’

বাত কীভাবে চোখে প্রভাব ফেলে?

অটোইমিউন ডিজিজের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রদাহ চোখের বিভিন্ন অংশে প্রভাব ফেলতে পারে। সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে –

ইউভাইটিস – চোখের ভেতরের অংশ ইউভিয়া, যেটা চোখে আলো প্রবেশের সঙ্গে খোলা-বন্ধ হয়। এখানে প্রদাহ হলে তাকে ইউভাইটিস বলে। এক্ষেত্রে প্রদাহের পাশাপাশি চোখ ব্যথা, লাল হয়ে যাওয়া, ঝাপসা দৃষ্টি, চোখের মধ্যে ছোট দাগ বা আলোয় অস্বস্তি হয়ে থাকে। এগুলো সাধারণত অ্যাঙ্কাইলজিং স্পন্ডিলাইটিস, জুভেনাইল ইডিওপ্যাথিক আরথ্রাইটিস (জেআইএ), সোরিয়াটিক আরথ্রাইটিস এবং ‘Behçet’s Illness’- এর সঙ্গে জড়িত।

ড্রাই আই সিনড্রোম – রিউমাটয়েড আরথ্রাইটিস, লুপাস এবং বিশেষ করে জোগ্রেন সিনড্রোমে এই লক্ষণ দেখা যায়। এতে চোখে তীব্র জ্বালা ও চোখে বালি থাকার অনুভূতি হতে পারে। শুষ্ক চোখের সমস্যা মারাত্মক হলে এবং চিকিৎসা না করালে কর্নিয়ার ক্ষতি হতে পারে।

স্ক্লেরাইটিস ও এপিস্ক্লেরাইটিস – চোখের সাদা অংশের নাম স্ক্লেরা। এই অংশে কোনও প্রদাহ হলে তাকে বলা হয় স্ক্লেরাইটিস। এক্ষেত্রে বেশ ব্যথা হয়। এই অবস্থা ভাসকুলাইটিস বা আরএ’র মতো গুরুতর সিস্টেমিক ইনফ্ল্যামেশনের ইঙ্গিত হতে পারে।

রেটিনাল ভাসকুলাইটিস বা অপটিক নিউরাইটিস – লুপাস বা বেকেটস ডিজিজের ক্ষেত্রে রেটিনার রক্তনালিতে বা অপটিক নার্ভে প্রদাহ হয়ে থাকে। দ্রুত রোগনির্ণয় না হলে দৃষ্টিশক্তি চলে যেতে পারে।

সিউডো টিউমার – এতে চোখের মধ্যে টিউমারের মতো মাংসপিণ্ড হতে পারে।

এছাড়া চোখের পাতা যে নার্ভের কার্যকারিতার জন্য খোলা-বন্ধ হয়, সেই নার্ভেরও অটোইমিউন ডিজিজের জন্য ক্ষতি হতে পারে। পাশাপাশি অটোইমিউন ডিজিজের কারণে শরীর থেকে প্রোটিন বেরিয়ে যেতে পারে। সে কারণে ঘুম থেকে উঠলে চোখ ফুলে থাকতে পারে।

কখন রিউমাটোলজিস্টের কাছে যাবেন

চক্ষুবিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, চোখের কিছু অবস্থা দৃঢ়ভাবে অন্তর্নিহিত সিস্টেমিক অটোইমিউন ডিজিজের উপস্থিতি নির্দেশ করে। চোখের ডাক্তার আপনাকে রিউমাটোলজিস্টের কাছে তখনই রেফার করতে পারেন যদি আপনার

  • ইউভিয়া অর্থাৎ চোখের মাঝের স্তরে বারবার প্রদাহ হয়
  • যন্ত্রণাদায়ক স্ক্লেরাইটিস বা এপিস্ক্লেরাইটিস বারবার হলে
  • চোখ ক্রমাগত ও অস্বাভাবিকভাবে শুকিয়ে গেলে, বিশেষ করে সঙ্গে যদি মুখ শুকিয়ে যায়
  • প্রদাহের লক্ষণ সহ দৃষ্টি পরিবর্তন বা দৃষ্টিশক্তি কমে গেলে
  • চোখের সমস্যার সঙ্গে পদ্ধতিগত কিছু লক্ষণ যেমন ক্লান্তি, ত্বকে র‍্যাশ, জয়েন্টে ব্যথা হলে

এছাড়া চোখের ক্ষেত্রে রক্তপরীক্ষার সময় যদি অটোইমিউন মার্কার দেখা যায় (যেমন HLA-B27, ANA, RF), তাহলে সম্পূর্ণ রোগনির্ণয় এবং সামগ্রিক অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে রিউমাটোলজি ইনপুট আবশ্যক।

রোগীদের জন্য যা গুরুত্বপূ্র্ণ –

১) অটোইমিউন ডিজিজ প্রায়শই চোখে প্রভাব ফেলে এবং কোনও প্রাথমিক লক্ষণ না-ও দেখা যেতে পারে।

২) যদি ইউভাইটিস, স্ক্লেরাইটিস ধরা পড়ে বা চোখ অস্বাভাবিকভাবে শুকিয়ে যায়, তাহলে আপনার চোখের ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুন রিউমাটোলজিস্টের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন আছে কি না।

৩) যাঁদের বাত সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে, তাঁদের চোখের সমস্যা না থাকলেও বছরে একবার চোখ পরীক্ষা করানো উচিত।

রোগ নিয়ন্ত্রণে সম্মিলিত চিকিৎসা পদ্ধতি-

চোখের এমন অবস্থায় ভূমিকা নিতে পারে যৌথ চিকিৎসা পদ্ধতি। অর্থাৎ চক্ষু বিশেষজ্ঞর চিকিৎসা পদ্ধতি এবং বিভিন্ন ডিজিজ মডিফাইং অ্যান্টি রিউম্যাটিক ড্রাগসের মাধ্যমে রিউমাটোলজিস্টের করা চিকিৎসায় রোগী দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে পারেন।

সম্প্রতি কলকাতায় আয়োজিত নবম বেঙ্গল ইউভাইটিস সামিট ২০২৫- এ এই সম্মিলিত চিকিৎসা পদ্ধতির ওপরই জোর দেওয়া হয়েছে। এবারের থিম ছিল ইউভিয়া-রিউমাটো ইন্টারফেজ। এশিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ইমিউনোলজি অ্যান্ড রিউমাটোলজি (এআইআইআর) এবং ইউভাইটিস সোসাইটি অফ বেঙ্গলের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মেলনে দৃষ্টিশক্তি প্রতিরোধে রোগীকে সঠিক বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো, সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও রোগীর সচেতনতার ওপর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। ভারত এমনকি বিদেশের শীর্ষস্থানীয় চক্ষু ও রিউমাটোলজি বিশেষজ্ঞরা এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন।

পরিশেষে বলব, চোখের যত্ন নিন। যদি আপনার অটোইমিউন ডিজিজ থাকে বা চোখে অস্বাভাবিক জ্বালাপোড়া হয়, লাল হয়ে যায়, র‍্যাশ হয় বা চোখ দিয়ে জল পড়ার সমস্যা বারবার ফিরে আসে তাহলে বিষয়টা ফেলে না রেখে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। কারণ, তা বড় কোনও রোগের ইঙ্গিত হতে পারে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *