উদ্বেগের কোনও কারণ ছিল না। অথচ ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) হয়ে গেল আতঙ্কের সমার্থক। দুই বুথ লেভেল অফিসারের (বিএলও) আত্মহত্যার অভিযোগ, এক বিএলও’র হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু, আরও একজনের অসুস্থতা সেই আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়াও একের পর এক সাধারণ মানুষের হয় আত্মহত্যা অথবা মৃত্যুর সঙ্গে এসআইআর-এর নাম জড়িয়ে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও ঘোরালো করে তুলেছে।
আতঙ্কের কারণ পুরোপুরি অনিশ্চয়তার আবহ। অনিশ্চয়তা কেন? প্রথমত, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ চলে যাবে কি না! দ্বিতীয়ত, কোনও জটিলতায় আপনজন কেউ শেষপর্যন্ত ভোটার হতে পারবেন কি না! চতুর্থত, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ গেলে ভবিষ্যৎ কী হবে! দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে নাকি ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রাখা হবে ইত্যাদি ইত্যাদি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। কোনও বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকে বৈকি!
এসআইআর নিয়ে কিন্তু এত অনিশ্চয়তা থাকার কারণ নেই। ২০০২ সালে সর্বশেষ এসআইআর হয়েছিল দেশে। কিন্তু তা নিয়ে এত হইচই, উদ্বেগ তখন দেখা যায়নি। আদমশুমারির মতো এই প্রক্রিয়া নির্বিবাদে হয়েছিল। এসআইআর হয় নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর এসআইআর একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। চলতি এসআইআর তার ব্যতিক্রম নয়। এই প্রক্রিয়ার জন্য জাতীয় নির্বাচন কমিশনের নির্দেশিকা উদ্বেগ প্রশমনের জন্য যথেষ্ট।
ওই নির্দেশিকায় স্পষ্ট যে, সর্বশেষ এসআইআর-এ নাম না থাকলেও দুশ্চিন্তার কোনও কারণ নেই। ১১টি নথির উল্লেখ আছে ওই নির্দেশিকায়, যেগুলির মধ্যে অন্তত একটি থাকলেই সেই নাগরিকের ভোটার তালিকায় নাম তুলতে কোনও বাধা থাকার কারণ নেই। দীর্ঘদিন ভারতে বসবাসকারীদের ওই ১১টি নথির অন্তত একটিও না থাকার কোনও কারণ নেই। যাঁদের তা নেই, নিশ্চিতভাবে তাঁরা ভিনদেশি বা তাঁদের এদেশের নাগরিকত্ব নেই।
মৃত ও যদি ভুয়ো ভোটার থাকে, তাঁদের পাশাপাশি এধরনের ভিনদেশিদের চিহ্নিত করাই তো এসআইআরের উদ্দেশ্য। ফলে এতে দেশের সাধারণ নাগরিকের দুশ্চিন্তার কোনও কারণ থাকতে পারে না। বরং দেশের স্বার্থে ভোটদানের মতো উৎসাহের সঙ্গে এসআইআর-এ অংশগ্রহণ করা সমস্ত নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। তাহলে এসআইআর নিয়ে এত গেল গেল রব কেন? কারণ একটাই- এই উদ্বেগ ও আতঙ্ক চাগিয়ে তোলা হয়েছে।
অনিশ্চয়তার সেই কালো মেঘ চাগিয়ে তোলার পিছনে আছে রাজনৈতিক দলগুলির তৎপরতা। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে যুযুধান দুই প্রধান দল তৃণমূল ও বিজেপি এজন্য সর্বার্থে দায়ী। বিজেপি প্রাথমিকভাবে শোরগোল তৈরির নেপথ্যে। এসআইআর হলে অন্তত দু’কোটি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে বলে শুভেন্দু অধিকারীদের আস্ফালন এমনকি প্রকৃত নাগরিকদের মনেও ভীতি জাগিয়ে তোলে। এমন একটা আবহ তৈরি করা হয় যাতে মনে হতে থাকে, দলে দলে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হবে এসআইআর-এ।
আতঙ্কের এই আবহ আরও উসকে ওঠে বিজেপির এই অবস্থান-বিরোধী তৃণমূলের শোরগোলে। ‘আমি থাকতে একজন ভোটারকেও বাদ দিতে দেব না’ বলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রচার এই বিভ্রম তৈরি করে যে, এসআইআর তাহলে সত্যিই ভয়ের ব্যাপার। নির্বাচন কমিশনের কর্তাদের বিভিন্ন বক্তব্য সেই ভয়ের আবহকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যাঁরা এনুমারেশন ফর্ম ইতিমধ্যে জমা দিয়েছেন, তাঁদের মনেও অনিশ্চয়তা। এরপর কী হবে- এই প্রশ্ন তাঁদের মধ্যে।
আসলে স্বাভাবিক প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের বদলে এসআইআর-কে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার নামান্তর করে তোলা হয়েছে। ভয় চাগিয়ে তোলা সেই রাজনৈতিক কৌশলের অঙ্গ। দুর্ভাগ্যজনক হল, একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে প্রশাসনিক নিয়মে নির্বিঘ্নে করার বদলে নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপ ও বক্তব্য অস্বাভাবিক শোরগোলের জন্ম দিয়েছে। এসআইআর-কে রাজনৈতিক কর্মসূচি বানিয়ে দিতে কমিশনের ভূমিকা তাই যথেষ্ট।
