কূটনৈতিক সম্পর্কে কিছু বিধি ব্যবস্থা আছে। বিভিন্ন দেশে অন্য রাষ্ট্রের দূতাবাসের নিরাপত্তা রক্ষা সেই বিধি ব্যবস্থার অন্যতম। দুই দেশের সম্পর্কে যতই টানাপোড়েন থাক, দূতাবাস ও রাষ্ট্রদূতদের নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করা আন্তর্জাতিক বিধির মধ্যে পড়ে। সম্পর্ক বেশি তিক্ত হলে অন্য দেশের দূতাবাসের কর্মীদের দেশে ফিরে যেতে বলা যেতে পারে, কিন্তু তাঁদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুদায়িত্ব।
ইনকিলাব মঞ্চ নামে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে এখন ভারত-বাংলাদেশের চরম টানাপোড়েন চলছে। দুই দেশেই একদল উন্মত্ত জনতা দূতাবাসগুলিকে নিশানা করছে। বাংলাদেশে ভারতের বিভিন্ন হাইকমিশনের দপ্তরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভারতেও বাংলাদেশের হাইকমিশনগুলি নিয়ে অনুরূপ ঘটনা ঘটছে। কিন্তু উভয় দেশ এখনও পর্যন্ত পরস্পরের দূতাবাসগুলির সুরক্ষা সুনিশ্চিত করেছে। দুটি দেশেই দূতাবাসমুখী মিছিল ও বিক্ষোভের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু সুরক্ষায় বিঘ্ন ঘটেনি।
বিক্ষোভকারী যিনি বা যাঁরাই হোন না কেন, এক্ষেত্রে সরকারের কর্তব্য তাঁদের বাধা দেওয়া। দিল্লি বা কলকাতা- সব জায়গায় সরকার সেই কাজটা নিয়ম মেনে করছে। বিক্ষোভকারীরা গেরুয়া শিবিরের সমর্থক বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দল হলেও দিল্লিতে তাদের বাংলাদেশের দূতাবাসের কাছে ঘেঁষতে দেয়নি কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের পুলিশ। কলকাতায় সেই কাজটা করছে তৃণমূল সরকারের পুলিশ।
বিরোধী দলনেতা হিসাবে শুভেন্দু অধিকারী সরকারের এই কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা জানেন। তবুও তিনি সাধুদের মিছিলে গিয়ে বাধা পেয়ে কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনের দপ্তরের পথে অবস্থানে বসে পড়েছিলেন। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, বাংলাদেশের ঘটনায় হিন্দুত্বের আবেগ উসকে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে এটা একটি কৌশল। কয়েক মাসের মধ্যে যেহেতু বিধানসভা নির্বাচন আছে বাংলায়, তাই এই কৌশলে ভোটে সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্য আছে।
শুধু দূতাবাসের সামনে ধর্না, বিক্ষোভ বা স্মারকলিপি দেওয়ার চেষ্টা নয়, বাংলাদেশের ঘটনাবলি এপার বাংলায় রাজনৈতিক হাতিয়ার করে তোলার মরিয়া প্রয়াস চলছে। ওপার বাংলার ময়মনসিংহ জেলায় দীপুচন্দ্র দাস নামে এক হিন্দু তরুণকে পিটিয়ে খুন ও দেহ জ্বালিয়ে দেওয়ার নৃশংস ঘটনা সেই প্রয়াসকে জোরালো করার সহায়ক হয়ে উঠেছে। দূতাবাসমুখী মিছিল বা বিক্ষোভ যখনই আটকে দেওয়ার চেষ্টা করছে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ, তখন এই সরকার হিন্দু-বিরোধী বলে ন্যারেটিভ বানানোর কৌশল চোখে পড়ছে।
কিন্তু এই কৌশল অভূতপূর্ব বিপদ ডেকে আনতে পারে। মৌলবাদীদের হাতে নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার যে বিপদ এখন বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে, তা এভাবেই বছরের পর বছরের চেষ্টায় ডেকে আনা হয়েছে। ভোটের অঙ্কে সেদেশের রাজনৈতিক দলগুলি ও সরকার সেই চেষ্টাকে প্রশ্রয় দিয়েছে বরাবর। বিশেষ করে মুজিবুর রহমান পরবর্তী সময়ে মৌলবাদী শক্তিগুলির তৎপরতা অবাধে চলতে দেওয়া হয়েছে।
সেই তৎপরতায় সাধারণ মানুষের এবং শিক্ষক সমাজের মগজধোলাই হয়েছে। সরকার নীরব দর্শক থাকায় এবং সরকারবিরোধী অসন্তোষের সুযোগে ইসলামের নামে উগ্র ধর্মান্ধতা কীভাবে সেদেশে জাঁকিয়ে বসেছে, তা এখন চোখের সামনে স্পষ্ট। ভারতে সব ধর্মের উগ্র মৌলবাদী শক্তি এই ধর্মান্ধতার বিষ ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট। ইসলামিক ও হিন্দুত্বের নামে দুই ধরনের মৌলবাদী শক্তি এখন কাজ করে যাচ্ছে ভারতে।
এতে কোনও কোনও রাজনৈতিক দলের আগামী কয়েকটি ভোটে লাভ হতে পারে সত্য। কিন্তু আমজনতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ধর্মান্ধতার নামে বিদ্বেষ ও বিভাজন তৈরি হয়ে গেলে, তার খেসারত দিতে হবে গোটা দেশকে। সেরকম পরিস্থিতি তৈরি হলে দেশের নিয়ন্ত্রণ যে মৌলবাদীদের হাতে চলে যায়, তার প্রমাণ বাংলাদেশ। যে দেশটায় এখন অরাজকতা চলছে। ফলে অর্থনীতির সর্বনাশ ঘটছে। সময় থাকতে সাবধান না হলে ভারতেও সেই বিপদ আসতে পারে।
