গণসংযোগের অভাবেই বিপাকে আন্দোলন?

গণসংযোগের অভাবেই বিপাকে আন্দোলন?

ব্লগ/BLOG
Spread the love


ক্ষীরোদা রায়

উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক আন্দোলনগুলি আজ এক অস্তিত্ব সংকটের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। কামতাপুর কিংবা গোর্খাল্যান্ড—বঞ্চনা, ভাষা ও পরিচয়ের দাবিতে গড়ে ওঠা এই লড়াইগুলোর ঐতিহাসিক যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের অবকাশ নেই। কিন্তু বড় প্রশ্নটি অন্যত্র—এই আন্দোলনগুলি কি সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে? নাকি কার্যকর গণসংযোগের অভাব আর নেতৃত্বের অদূরদর্শিতায় এগুলো বারবারই কক্ষচ্যুত হচ্ছে? রাজনীতিতে আবেগ জ্বালানি হিসেবে কাজ করলেও, নিরন্তর জনসংযোগ ছাড়া কোনও আন্দোলনই দীর্ঘজীবী হয় না। নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর অস্পষ্ট প্রচারের ফলে আন্দোলনের মূল লক্ষ্য আজ অনেকটাই কুয়াশাচ্ছন্ন।

বঞ্চনার ক্যানভাস ও সামাজিক বিচ্ছেদ

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, আঞ্চলিক আন্দোলনগুলির সঙ্গে বৃহত্তর সমাজের এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আন্দোলনের ভাষা আজও একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভাবাবেগেই আটকে আছে; অথচ বঞ্চনার ক্ষত উত্তরবঙ্গ ও পাহাড়ের প্রতিটি স্তরেই সমানভাবে গভীর। উন্নয়নের প্রশ্নে এই ক্ষোভ কেবল কামতাপুরিদের নয়, বরং প্রান্তিক কৃষক, চা শ্রমিক, কর্মহীন যুবসমাজ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও। উত্তরবঙ্গে এখনও এইমসের মতো কোনও বিশেষায়িত চিকিৎসা পরিকাঠামো গড়ে না ওঠা কিংবা শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ির রেল আধুনিকীকরণের স্বপ্নটি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকা—এই বঞ্চনাগুলো সর্বজনীন। অথচ তিনটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রবেশদ্বার হিসেবে এই অঞ্চলের বাণিজ্যিক গুরুত্ব আন্তর্জাতিক মানের।

কৃষিপণ্য ও শিল্পের পদ্ধতিগত অবহেলা

উত্তরবঙ্গের কৃষি ও শিল্প আজও এক পদ্ধতিগত অবহেলার শিকার। মালদার আম, দিনাজপুরের লিচু কিংবা ডুয়ার্সের আনারস—আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবল চাহিদা থাকলেও এই কৃষিপণ্যগুলিকে কেন্দ্র করে কোনও সংগঠিত প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে ওঠেনি। ধান, পাট বা সুপারির বিপুল ফলন থাকলেও মূল্য সংযোজন ও বাজার সম্প্রসারণের কোনও দিশা নেই। ব্রিটিশ আমলের পুরোনো হাট-বাজারগুলো আজ জরাজীর্ণ। বিপরীতে, দেশভাগের পরবর্তী প্রেক্ষাপটে দক্ষিণবঙ্গে যোগাযোগ ও বাজার ব্যবস্থার যে বৈপ্লবিক প্রসার ঘটেছে, উত্তরবঙ্গ সেই উন্নয়নের আলোকবৃত্ত থেকে অনেক দূরেই রয়ে গিয়েছে।

বেকারত্বের বিষাদ ও নতুন সামাজিক অসুখ

উন্নয়নের এই খরা সবচেয়ে বড় আঘাত হেনেছে উত্তরবঙ্গের যুবসমাজে। কর্মসংস্থানের অভাবে জন্মভিটে ছেড়ে পরিযায়ী হওয়ার সিদ্ধান্ত আজ আর কারও শখ নয়, বরং এক যন্ত্রণাদায়ক বাধ্যবাধকতা। এর চেয়েও ভয়ংকর সামাজিক বাস্তবতা হল—স্থায়ী উপার্জনের পথ না পেয়ে অনেক তরুণ-তরুণী ভার্চুয়াল জগতের অন্ধকার গলিতে পা বাড়াচ্ছেন, জড়িয়ে পড়ছেন কুরুচিকর কনটেন্ট তৈরির পথে। এটি কেবল নৈতিক অবক্ষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের উন্নয়ন-ব্যর্থতার এক বিকৃত প্রতিফলন। এই বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে রাজনৈতিক নেতৃত্বের মৌন অত্যন্ত পীড়াদায়ক। অথচ ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতিকে কার্যকর করে পর্যটন ও বাণিজ্যের যে করিডর তৈরির সম্ভাবনা ছিল, তা আজও হিমাঙ্কিত হয়ে আছে।

পরিচয়ের রাজনীতি বনাম উন্নয়নের ভাষা

এই সামগ্রিক বঞ্চনাই কামতাপুর ও গোর্খা আন্দোলনের জ্বালানি। কিন্তু আন্দোলনের কুশীলবরা আজও এই বাস্তবতাকে আধুনিক রাজনৈতিক ভাষায় রূপ দিতে পারেননি। কেবল পরিচয়ের রাজনীতি দিয়ে পেটের খিদে মেটানো সম্ভব নয়—প্রয়োজন প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও কর্মসংস্থানের ব্লু-প্রিন্ট। গণসংযোগের পথ আজ আর কেবল সভা-মিছিলে সীমাবদ্ধ নেই; সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে নিরন্তর সংলাপই পারে আন্দোলনের গুরুত্বকে প্রাসঙ্গিক রাখতে। উত্তরবঙ্গের মানুষ আজ নিছক মানচিত্রের বিভাজন নয়, বরং চায় এক সম্মানজনক ও সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ। নেতৃত্বের দূরদর্শিতা ও গণসংযোগের সক্ষমতা ছাড়া এই বঞ্চনার ইতিহাস মুছে ফেলা কঠিন।

(লেখক লীলাবতী মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *