এই দুনিয়ায় নাকি সবাই সবাইকে ভুল বোঝে। আজ বলে নয়, চিরকালীন ইতিহাসেই ‘ভুল বোঝাবুঝি’ এক নিত্য সমস্যা। দূরত্ব বাড়ে, ভেঙে যায় সম্পর্ক। চেনা সমাজের কাছে অপরিচিত হয়ে ওঠেন খুব কাছের মানুষ। পৃথিবীর গণ্ডি পেরিয়ে মহাশূন্যে পাড়ি দেওয়া সম্ভব হলেও ভুল ভাঙানোর কোনও যন্ত্র আজ পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি। সেটা হলে কি গৌতম গম্ভীর একবার পরখ করে দেখতে চাইতেন না? এই যে তাঁকে নিয়ে এতো সমালোচনা, এতো আক্রমণ; আজ কোচ হিসেবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ একবারও কি মনে হচ্ছে না সবাইকে চিৎকার করে বলেন, আপনারা আমাকে ‘ভুল’ বুঝেছিলেন।
এই বিষয়ে আরও খবর
উত্তরটা এক কথায় দেওয়া মুশকিল। ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে ‘ভুল বোঝা’ খেলোয়াড়দের তালিকায় সবার উপরে থাকতে পারে তাঁর নাম। অন্তত ভারতের ক্ষেত্রে তো বটেই। বীরপূজার ঢক্কানিনাদ থেকে অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ। তাঁকে নিয়ে বিতর্ক আছে। সে কথা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। মাঝে পাঁচবছরের একটা রাজনৈতিক জীবন আছে। অসংখ্য অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য আছে। মাঠের মধ্যে বা বাইরে আগ্রাসী মেজাজে অকারণে জড়িয়ে পড়া গণ্ডগোল আছে। যা তাঁর ‘হিরো ইমেজ’-কে যমুনার জলে ভাসিয়ে দিয়েছে।
আসলে রাজা হওয়ার সাধ কোনওদিনই ছিল না হয়তো। চেয়েছিলেন শুধু দেশের জয়, দলের জয়। সেসব তাঁর অর্জন করা হয়ে গিয়েছে বহু আগেই। দুটো বিশ্বকাপ ফাইনালে তাঁর দুর্ধর্ষ ইনিংসের কথা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। ২০১১-তে দেশের জার্সিতে কাদার দাগ অনেক না বলা কথা বলে দেয়। তারপর আইপিএল জিতেছেন। অধিনায়ক হিসেবে, মেন্টর হিসেবে। কোচ হয়ে ভারতকে এশিয়া কাপ, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ও অবশেষে বিশ্বকাপ জেতালেন। কখনও কোনও ফাইনালে তিনি হারেননি। ভারত তথা বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে আর কেউ নেই, যাঁর ঝুলিতে এতো সাফল্য। তবু হয়তো তিনি বিশ্বাস করেন, প্রাপ্য সম্মান পাননি।
স্বীকার করে নিতে অসুবিধা নেই যে, হ্যাঁ, পাননি। অভিমান-অনুযোগে ছুড়ে দেওয়া কথাগুলোর জন্য ক্রিকেটমোদি আমজনতার সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে। ধোনিকে নিয়ে মন্তব্য না করলে, বিরাটের সঙ্গে ঝামেলা না পাকালে হয়তো-বা তবু কিছু ক্রেডিট পেতেন। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছেন ‘ভিলেন’ হওয়া। তিনি কারও নয়নের মণি হতে চাননি। চেয়েছেন, যেটা তাঁর ন্যায্য মনে হয়েছে, সেটা সোচ্চারে বলতে। তাই মেসি-রোনাল্ডোর মধ্যে আচমকা মার্কাস র্যাশফোর্ডকে বেছে নিতে পারেন। আরে, সত্যিই যদি কাউকে ভালো মনে হয়, বলতে পারব না? অন্যের মন জুগিয়ে চলতে হবে? সব সময় খোপের মধ্যে থাকতে হবে?
তিনি বেছে নিয়েছেন ‘ভিলেন’ হওয়া। তিনি কারও নয়নের মণি হতে চাননি। চেয়েছেন, যেটা তাঁর ন্যায্য মনে হয়েছে, সেটা সোচ্চারে বলতে। তাই মেসি-রোনাল্ডোর মধ্যে আচমকা মার্কাস র্যাশফোর্ডকে বেছে নিতে পারেন। আরে, সত্যিই যদি কাউকে ভালো মনে হয়, বলতে পারব না?
যতদিন তিনি একজন প্রাক্তন ক্রিকেটার হিসেবে সেই কথাগুলো বলতেন, ততদিন অসুবিধা ছিল না। কিন্তু সমস্যা বাঁধল ভারতের কোচ হওয়ার পর। এ তো শুধু কোচিং নয়, সরু সুতোর উপর ঝুলে থেকে জীবন-যুদ্ধ। আপনার প্রতিটি মন্তব্যের প্রতিটি শব্দকে আতস কাচের তলায় বিশ্লেষণ করা হবে। আপনার প্রতিটি আচরণের ব্যাখ্যা চাইবে দেশের ক্রিকেটজনতা। অভিষেক-তিলকদের কোচিং করাতে হবে। রোহিত-বিরাটদের ম্যানেজ। শুধু ট্রফি জিতলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে না। বেলা শেষে পরীক্ষা হবে বহু স্তরে। তাই রাহুল দ্রাবিড়, রবি শাস্ত্রীরা বীরের মর্যাদায় আসীন। গ্রেগ চ্যাপেল আজও ভিলেন।
Gautam Gambhir as a coach
-Champions Trophy Last 2025 – Gained ✅
-Asia Cup Last 2025 – Gained ✅
-T20 World Cup Last 2026 – Gained ✅Apologies must be louder than the criticism 🔥🇮🇳 pic.twitter.com/xR3r58tk96
— META_07 (@PankajSard27965) March 8, 2026
ঢাকঢোল পিটিয়ে টিম ইন্ডিয়ার হেডকোচ হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল গৌতম গম্ভীরকে। তিনি তাঁর পছন্দমতো ‘টিম’ নিয়েই যাত্রা শুরু করেছিলেন। নির্বাচক প্রধান অজিত আগরকরও কার্যত গম্ভীরের পছন্দমতো দল করেছেন। কিন্তু গম্ভীর নিজের বিপদ নিজে ডেকেছেন। টেস্টে দেশের মুখ পুড়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে চরম লজ্জার শিকার হয়েছেন জশপ্রীত বুমরাহরা। ২০২৪-এ নিউজিল্যান্ড, ২০২৫-এ দক্ষিণ আফ্রিকা। অস্ত যায় ভারতের দেশের মাটিতে টেস্ট আধিপত্যের গর্ব। ২৫ বছর পর ভারতের মাটিতে ভারতকেই হোয়াইটওয়াশ করে টেম্বা বাভুমার দল। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, এশিয়া কাপ জেতার পরও টেস্টের দুরবস্থার কথা উঠেছে।
এর মধ্যে সমস্যা হয়েছে মাঠের বাইরেও। রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি টেস্ট ছাড়ার পর প্রশ্ন উঠেছে, এসব কি গম্ভীরের অঙ্গুলিহেলনে হয়েছে? এবার কি গম্ভীর-আগরকররা ওয়ানডে থেকেও রো-কো’কে বাদ দিতে চান? কোচ তখন ভিলেন নম্বর ওয়ান। দুই মহাতারকা রানে ফিরলে আলোচনা হয়, ভারত জেতেনি, গম্ভীর হেরেছেন। রোহিত শর্মাকে সরিয়ে কেন শুভমান গিলকে অধিনায়ক করা হবে? হর্ষিত রানাকে তো গম্ভীরের ‘সন্তানসম’ বানিয়ে ছেড়েছে নেটদুনিয়া। প্রশ্ন, সমালোচনা, বিতর্ক- কোচ গম্ভীরের সঙ্গে নিত্য যোগাযোগ। সমস্যাগুলো হয়তো কায়দা করে সমাধান করা যেত। গম্ভীর সেই ‘কূটনীতিবিদ’ নন। সেটা ঠিক হলে ঠিক, ভুল হলে ভুল। নিজেকে বদলানোর কথা তিনি ভাবেন না।
রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি টেস্ট ছাড়ার পর প্রশ্ন উঠেছে, এসব কি গম্ভীরের অঙ্গুলিহেলনে হয়েছে? এবার কি গম্ভীর-আগরকররা ওয়ানডে থেকেও রো-কো’কে বাদ দিতে চান? কোচ তখন ভিলেন নম্বর ওয়ান। দুই মহাতারকা রানে ফিরলে আলোচনা হয়, ভারত জেতেনি, গম্ভীর হেরেছেন।
তাঁর জীবনদর্শনটাই এরকম। এবারও তার ব্যতিক্রম হল না। প্রমাণ করে দিলেন খেলাটা খাতায়-কলমে হয় না। হয় মাঠে। যেখানে প্রতিটা দিন শুরু করতে হয় শূন্য থেকে। প্রতিটা দিন ঝরাতে হয় ঘাম-রক্ত। টেস্টে যা ব্যর্থতাই থাক না কেন, টি-টোয়েন্টি দলটাকে নিজের হাতে গড়েছেন। কোথাও গিয়ে যেন প্রমাণ করে দিলেন, তারকা সংস্কৃতিকে ‘বন্ধ’ করে তিনি ঠিকই করেছেন।
এই বিষয়ে আরও খবর
এই সাফল্য নিশ্চয়ই তাঁর চোখ ধাঁধিয়ে দেবে না। বরং স্বভাবসিদ্ধ হাসি হেসে ডুব দেবেন পরের পরিকল্পনায়। মনে পড়ছে নাইটদের মেন্টর থাকার সময় এক সমর্থক চোখের জলে গম্ভীরকে জানিয়েছিলেন, “তোমায় হৃদমাঝারে রাখব, ছেড়ে দেব না।” আর আজ এটা সব সমর্থকেরই মনের কথা। গম্ভীরের এখন দেশবাসীর ‘মনহরা’। একটু অস্বস্তি হয়তো হতে পারে জিজি-র। কিন্তু কী করা যাবে? ভারতবাসী তো এরকমই। আপন করে রাখতে জানে। বক্ষমাঝে রাখতে জানে। একবার নাহয় দলের সঙ্গে নিজেও ভালোবাসার মুকুট পরে তিনি দেখতেই পারেন। কেউ ‘ভুল’ বুঝবে না।
সর্বশেষ খবর
