কেন প্রতীক উররা চলে যান!

কেন প্রতীক উররা চলে যান!

স্বাস্থ্য/HEALTH
Spread the love


কেন এই তরুণ অাদর্শবাদী নেতার মত বদলে গেল, তা মূল‌্যায়ন করবে পার্টি। তৃণমূলের সঙ্গে টাকা ও পদের ডিল হয়েছে বলে দাগিয়ে দেওয়া খুব সহজ। কিন্তু একজন আদর্শবাদী ছেলের রাতারাতি বিপক্ষ শিবিরে চলে যাওয়া মোটেই সোজা ব‌্যাপার নয়। প্রতীক উর ভুল করেননি। তিনি বিজেপিকে হারাতে চান– যে কথা সৈফুদ্দিন বলেছিলেন।

আমি প্রতীক উর রহমানকে চিনি না। কখনও দেখাও হয়নি। কিন্তু গত ক’-দিন ধরে তঁাকে নিয়ে সোশ‌্যাল মিডিয়ায় এমন খবরের ঝড় বয়ে গেল যেন আর একজন সৈফুদ্দিন চৌধুরীকে হারিয়ে ফেলেছে সিপিএম! রাজ‌্য নেতৃত্ব ও যুবনেতাদের প্রতিক্রিয়া শুনে মনে হচ্ছে প্রতীকের প্রতীক বদলে তঁারাও খুব হতাশ। পরে তীব্র ভাষায় প্রতীক উরকে অাক্রমণ করা হল। তিনি যেভাবে সিপিএম নেতাদের দ্বারা ট্রোলড হলেন, বিজেপিতে যাওয়া শংকর ঘোষ, বঙ্কিম ঘোষরা হননি তো! প্রতীক উর সংখ‌্যালঘু, তৃণমূলকে বেছে নিলেন বলে কি বিষ নজরে পড়ে গেলেন?

সিপিএম ছিল পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে শক্তিশালী পার্টি। প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি পাড়ায় লাল পতাকা ছিল। পর-পর ভুল সিদ্ধান্তের ফলে গোটা দেশে বাম ভোটব‌্যাঙ্কে ধস নেমেছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিধানসভা এবং সংসদে এখন সিপিএমের অার কোনও প্রতিনিধি নেই। নৌকা ডুবছে বুঝে অনেকেই ঝঁাপ মেরেছেন এদিক-ওদিক। গত ১৫ বছরে তাবড় সব নেতা ‘দাস ক‌্যাপিটাল’-এর অাদর্শ ছুড়ে ফেলে ঘাসফুলে লুটিয়ে পড়েছেন, নতুবা ইন্টারন‌্যাশনাল ভুলে স্লোগান তুলেছেন ‘জয় শ্রীরাম’। সিপিএম থেকে এসেছেন বলেই কি না জানি না, নতুন দলে তঁারা যথেষ্ট সমাদরও পেয়েছেন। কেউ বিধায়ক, মন্ত্রী হয়েছেন, কেউ হয়েছেন সাংসদ। বহু দিন অাগে সিপিএম ছেড়েছিলেন তাত্ত্বিক নেতা সাংসদ সৈফুদ্দিন চৌধুরী ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা পার্টির জেলা সম্পাদক সমীর পুততুণ্ড। হইচই পড়ে গিয়েছিল।

সফি-সমীরের নীতি ছিল, বিজেপি বাড়ছে, কংগ্রেসের সঙ্গে শত্রুতার দিন ভুলতে হবে। পার্টি তখন ক্ষমতায়। পাত্তাই দেওয়া হয়নি। সেই কংগ্রেসের হাত ধরতে এখন সিপিএম মরিয়া, সফি-সমীর চলে গিয়েছেন বহু দূরে। ভাল ভাল বহু নেতা সিপিএম ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছেন। সুজিত বসু, রেজ্জাক মোল্লা, অাবু অায়েস মণ্ডল, রাধিকারঞ্জন প্রামাণিক, খগেন মুর্মু, বঙ্কিম ঘোষ, শংকর ঘোষ, তালিকাটা দীর্ঘ। অনেকেই পার্টি ছেড়ে অন‌্য দলে গিয়ে জনপ্রতিনিধি হয়েছেন।
ওজনে কারও সঙ্গে প্রতীক উরের তুলনাই আনা উচিত না। তদুপরি এই নবীন নেতার দলবদল নিয়ে এত অালোচনা কেন?

খেঁাজ নিয়ে জানলাম, প্রতীক উর খুবই সাধারণ পরিবার থেকে উঠে অাসা এক তরতাজা যুবক। সংগঠক, সুবক্তা, ডাকাবুকো। এসএফঅাই করতে করতে উত্থান। সিপিএম রাজ‌্য কমিটিতে স্থান পান। এখনও ট্রেনে চড়েই দক্ষিণ ২৪ পরগনার গ্রাম থেকে শহরে অাসেন। তারপর শিয়ালদহ স্টেশন থেকে পায়ে হেঁটে অাচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোডের পার্টি অফিস। তঁাকে গত লোকসভা নির্বাচনে ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্রে প্রার্থী করে সিপিএম। দরিদ্র ঘরের ছেলে হলেও সিপিএম রাজনীতিতে তঁার উত্থান উল্কার মতোই। পার্টির সুদিন থাকলে প্রতীকের সামনে সুযোগ হয়তো অাসত না।

২০২১ সালে বিপর্যয়ের পর পার্টি নেতারা বুঝতে পারেন, মুখ বদল চাই। নতুন ছেলেমেয়েদের সামনে অানতে হবে। সংগঠনে জায়গা করে দিতে হবে। দিতে হবে ভোটের টিকিট। সেই স্রোতেই শতরূপ ঘোষ, মীনাক্ষী মুখোপাধ‌্যায়, দীপ্সিতা ধর, সৃজন ভট্টাচার্য, সায়ন বন্দে‌্যাপাধ‌্যায়দের উত্থান। সিপিএমের বর্তমান নেতৃত্বের মধে‌্য বিমানদা, সুজনদা, সেলিমদা, সূর্যদাদের দেখেছি সাংবাদিকতা জীবনের শুরুর দিন থেকে। সবাই পার্টিঅন্ত প্রাণ। শাসক থেকে বিরোধী হলেও দলত‌্যাগ করেননি। দলত‌্যাগ করলে মন্ত্রিত্ব, রাজ‌্যসভার সদস‌্য পদ মিলে যেত। দীর্ঘ দিন বামফ্রন্ট সরকারে মন্ত্রী ছিলেন সূর্যকান্ত মিশ্র। মহম্মদ সেলিম বিধায়ক-মন্ত্রী-রাজ্যসভা-লোকসভা সর্বত্র ছিলেন। সুজন চক্রবর্তী দাপুটে ছাত্রনেতা থেকে বিধায়ক।

যদিও অনেক আগে তঁার মন্ত্রিত্ব পাওয়া উচিত ছিল। ৮৬ বছরের ‘তরুণ’ বিমান বসু অবশ্য চিরদিন সংসদীয় রাজনীতির বাইরে। পার্টিই তঁার পরিবার। সুখের সময় তঁারা দেখেছেন। এখন দুঃসময়েও অাছেন পার্টিতে। রাজ‌্য রাজনীতির যা পরিস্থিতি তাতে তঁাদের আর ‘শাসক’ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ভোটব্যাঙ্কে ধস রাতারাতি মেরামতি হবে না। তবু তঁারা পার্টি করবেন। কিন্তু প্রতীক উরদের মত বদল হচ্ছে, কেন হচ্ছে? একটা সময় আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে বিকেলে ব্রিফিংয়ে নিয়মিত যেতাম। খুব মিস করি অনিলদাকে। অনিল বিশ্বাস ছিলেন সিপিএমের ভোটকুশলী, তুখড় রাজনীতিবিদ। খুবই বাস্তববাদী।

তঁাকে দেখেছি রাজনীতিকের বাইরে একশো শতাংশ সাংবাদিক। ‘গণশক্তি’ তঁার হাতে শক্তি পেয়েছে। অনিলদা খবর বুঝতেন। কোনটা কখন বলতে হবে জানতেন। আলিমুদ্দিনে আমাদের সঙ্গে মিট করার সময় বলে দিতেন আগের দিনের প্রেস কনফারেন্সে তঁার বক্তব্য থেকে কে কে নিউজ লাইন ধরতে পারেনি। সিপিএমের এই প্রজন্মের শতরূপ ছাড়া বাকি কারও সঙ্গে আমার আলাপ নেই। তবে সায়ন-সৃজন, দীপ্সিতা-মীনাক্ষীদের দেখে ভাল লাগে। রাজনীতিতে অল্পবয়সি ছেলেমেয়েদের সব দলে দরকার। তৃণমূলেও একঝঁাক নতুন ছেলেমেয়ে আছে। অভিষেক বন্দে‌্যাপাধ‌্যায় বড় উদাহরণ। সারা দেশ তঁাকে চিনে গিয়েছে। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে বিরাট উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন নিজেকে। মমতা বন্দোপাধ‌্যায়ের দলে তিনিই ভবিষ‌্যৎ। তুলনায় বিজেপি ও কংগ্রেসে নতুন ছাত্র যুব নেতৃত্বের অভাব। অল্পবয়সি তেমন কোনও সম্ভাবনাময় নেতা দেখা যাচ্ছে না। ভরসা পুরনোরা।

প্রতীক উরের দলবদল নিয়ে তোলপাড় রাজনীতির কারণ কী? কেনই বা তাকে দলে িনতে অামতলা পার্টি অফিসে গেলেন অভিষেক? উত্তর সিপিএমকেই অাগে দিতে হবে। কেন এই তরুণ অাদর্শবাদী নেতার মত বদলে গেল, তা মূল‌্যায়ন করবে পার্টি। তৃণমূলের সঙ্গে টাকা ও পদের ‘ডিল’ হয়েছে বলে দাগিয়ে দেওয়া খুব সহজ। কিন্তু একজন ‘অাদর্শবাদী’ ছেলের রাতারাতি বিপক্ষ শিবিরে চলে যাওয়া মোটেই সোজা ব‌্যাপার নয়। অভিষেক অবশ‌্য প্রতীক উরকে নেওয়ার কারণ বলে দিয়েছেন। তঁার মূল‌্যায়ন, তৃণমূলের বয়সে ঊর্ধ্বসীমা নিয়ে তিনি তঁার মত দিয়েছেন। তিনি চান নতুন ছেলেমেয়েরা রাজনীতিতে অাসুক। সিপিএম থেকে কেন, যে কানও দল থেকে ভাল ছেলেমেয়েরা অাসতে চাইলে দলের দরজা খোলা। অভিষেক বুঝিয়ে দিলেন, এমএলএ নয়, তঁার চাই নবীন প্রজন্ম– যারা হবে তঁার অাগামী দিনের টিম। তাই প্রতীক উর ভুল করেননি।

তিনি বিজেপিকে হারাতে চান– যে কথা সৈফুদ্দিন বলেছিলেন। প্রতীক উর দেখছেন তঁার দল বাবরি মসজিদ গড়তে যাওয়া ব‌্যক্তির সঙ্গে জোট চাইছে। বিজেপি নয়, শত্রু মমতা। অামি দীর্ঘদিন ধরে বলার চেষ্টা করছি, সিপিএমের ভোটব‌্যাঙ্কের এই ধসের কারণ, অন্ধ মমতা বিরোধিতা। মমতা বন্দে‌্যাপাধ‌্যায় মুখ‌্যমন্ত্রী। তঁার বিরুদ্ধে অবশ‌্যই লড়তে হবে। কিন্তু দেখতে হবে মমতার বিরোধিতা করতে গিয়ে বিজেপির সুবিধা হচ্ছে কি না। কমরেডরা হারের প্রতিশোধে অন্ধ! বিজেপিকে ছেড়ে তৃণমূলকে প্রধান শত্রু বানিয়ে নিল। ধসে গেল ভোটব‌্যাঙ্ক। ইতিহাস বলছে এই রাজে‌্যর ধর্মনিরপেক্ষাতার চেতনা বহুকাল ধরে মজবুত। পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ মানুষ অসাম্প্রদায়িক। সেই জন‌্য মুসলিম লিগ যেমন এই রাজ‌্য থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে, তেমনই শ‌্যাম‌াপ্রসাদের মাটি হয়েও বাংলায় বহু দিন মাথা তুলে দঁাড়াতে পারেনি অারএসএস।

শত শত দাঙ্গা দেখা বাঙালির রক্তে অসাম্প্রদায়িকতার বীজ কতদূর প্রোথিত সেটা তো সাম্প্রতিক বাংলাদেশের ভোটে দেখা গেল। অাওয়ামী লীগের সমর্থকরা বিএনপির প্রার্থীদের ভোট দিয়ে জেতালেন। পাকপন্থী রাজাকার জামাতকে রুখে দিলেন পদ্মাপাড়ের সাধারণ মানুষ। বিএনপির কিছুই ছিল না। তারেক রহমান ১৭ বছর পর দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলেন।

বাংলায় কীভাবে সিপিএমের ভোট ব‌্যাঙ্ক ধসে গেল দেখুন। ২০১৬ সালে বিধানসভা ভোটে হারার পর ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটে তৃণমূলের বিরোধিতা করতে হবে বলে বাম ভোট পড়ে বিজেপিতে। ফলে যে দলের ’১৬ সালে ছিল ১০.১৬ শতাংশ ভোট, সেই বিজেপি সহসা পেয়ে গেল ৪০.৬৪ শতাংশে। ’১৬ সালে সিপিমএম-কংগ্রেস জোট ছিল। সিপিএমের ভোট ১৯.৭৫ ও কংগ্রেস ১০ শতাংশ। বাম ভোট বিজেপিতে চলে যাওয়ায় ’১৯ সালে সিপিএমের ভোট নেমে গেল ১০ শতাংশের নিচে। একটিও লোকসভা তারা জিততে পারল না। বাম ভোটের ভাঙনের মূল কারণ সেবার স্লোগান দেওয়া হয়েছিল ‘উনিশে রাম, একুশে বাম’। কিন্তু ২০২১ সালে কী হল সবাই দেখল। সিপিএমের ভোট ৫ শতাংশে নামল। বিজেপিতে যে ভোট গিয়েছিল অার ফিরে এল না। পক্ষান্তরে মমতা কী করলেন? বিজেপির বিরুদ্ধে তিনিই লড়ছেন বার্তা দিয়ে সমস্ত সংখ‌্যালঘু ভোট তঁার পক্ষে নিয়ে এলেন। সংখ‌্যালঘুদের একটি বড় অংশ বরাবর সিপিএমকে ভোট দিত। একদিকে সিপিএমের উদ্বাস্তু ভোট কেড়ে নিল বিজেপি। তৃণমূল কেড়ে নিল সংখ‌্যালঘু ভোট ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির সমর্থন। এরপর কঙ্কালটাই পড়ে থাকে।

এই অবস্থায় দঁাড়িয়ে সিপিএম পার্টি কি নতুন পথ নিতে পারছে? পারছে না। সেজন‌্য ভোট কমছে, সমর্থন কমছে, নেতৃত্বের মধে‌্য হতাশায় দলত‌্যাগের প্রবণতা বাড়ছে। এমন চললে অারও অনেক প্রতীক উরকে হারাতে হবে।

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *