কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ভারত একদিকে দ্রুত অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের পথে এগোচ্ছে, অন্যদিকে বৈষম্য, কর্মসংস্থান সংকট এবং বৈশ্বিক ভূ–রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। সরকার এই বাজেটকে ‘অমৃত কাল’-এর রোডম্যাপ হিসেবে তুলে ধরেছে, যেখানে লক্ষ্য টেকসই প্রবৃদ্ধি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় এই বাজেট কি কেবল পরিসংখ্যান আর বড় বিনিয়োগের ভাষায় কথা বলবে, নাকি মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সত্যিকারের পরিবর্তনের ছোঁয়া আনতে পারবে?
বাজেট ২০২৬–এর শক্তিশালী দিক
এই বাজেটের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল পুঁজি ব্যয়ের ধারাবাহিক সম্প্রসারণ। জাতীয় সড়ক, রেলপথ, লজিস্টিক করিডর, নগর অবকাঠামো এবং ডিজিটাল সংযোগে বড় বরাদ্দ সরকারের দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো-নির্ভর উন্নয়ন কৌশলকে শক্তিশালী করেছে। লক্ষ্য স্পষ্ট, বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং বিভিন্ন খাতে লেনদেনের খরচ কমানো।
আরও পড়ুন:
উৎপাদন খাতে উৎপাদন-সংযুক্ত প্রণোদনা প্রকল্প, সেমিকন্ডাক্টর বিনিয়োগ ও রপ্তানিমুখী শিল্প গুচ্ছ ভারতের বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলে গভীর সংযুক্তির ইঙ্গিত দেয়। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ও পিএলআই প্রকল্প সম্প্রসারণ দীর্ঘমেয়াদে শিল্পায়নের জন্য সহায়ক হতে পারে। সবুজ হাইড্রোজেন মিশন ও নবায়নযোগ্য শক্তিতে বাড়তি বরাদ্দ জলবায়ু-সঙ্গত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে।
কৃষিতে উচ্চ-মূল্যের ফসল, কৃষি-প্রযুক্তি এবং বাজার সংযুক্তির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যার উদ্দেশ্য কৃষকের আয় বৈচিত্র্যময় করা ও আমদানি নির্ভরতা কমানো। গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক সংকেত। ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার আরও বিস্তৃত হয়েছে, যা পরিষেবা সরবরাহ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে জোরদার করছে। সম্মিলিতভাবে এগুলো একটি সুসংগত সরবরাহ-পক্ষীয় কাঠামো গড়ে তুলেছে যা বাজেটের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য সাফল্য।
কৃষিতে উচ্চ-মূল্যের ফসল, কৃষি-প্রযুক্তি এবং বাজার সংযুক্তির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যার উদ্দেশ্য কৃষকের আয় বৈচিত্র্যময় করা ও আমদানি নির্ভরতা কমানো। গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক সংকেত।
‘অনুপস্থিত চাহিদার’ গল্প
তবে বাজেট ২০২৬–এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো শক্তিশালী সরবরাহ-পক্ষের বিপরীতে চাহিদা-পক্ষের কৌশলের অভাব। ভারতের জিডিপির মেরুদণ্ড বেসরকারি ভোগব্যয় হলেও পরিবারগুলোর জন্য উল্লেখযোগ্য স্বস্তি নেই। মধ্যবিত্ত কর সংস্কার, বাড়তি ছাড় বা ভোগ প্রণোদনার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
১৭টি ক্যান্সার ও বিরল রোগের ওষুধ শুল্কমুক্ত করা হয়েছে এবং দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে ১০,০০০ কোটি টাকার ‘বায়োফার্মা শক্তি’ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিছু কাঁচামালের শুল্ক কমিয়ে নির্দিষ্ট খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের দাম নামানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যদিও এলপিজি ও অ্যালকোহলের দাম বাড়তে পারে। বিদেশ ভ্রমণ ও শিক্ষায় টিসিএস কমানো সামান্য স্বস্তি দিলেও শক্তিশালী আয় সহায়তা বা কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়া এগুলো ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে যথেষ্ট নয়। এই সরবরাহ-চাহিদার অসামঞ্জস্য বাজেটের অন্যতম কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্ব।
ভারতের জিডিপির মেরুদণ্ড বেসরকারি ভোগব্যয় হলেও পরিবারগুলোর জন্য উল্লেখযোগ্য স্বস্তি নেই। মধ্যবিত্ত কর সংস্কার, বাড়তি ছাড় বা ভোগ প্রণোদনার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
দারিদ্র্য হ্রাস বনাম বাড়তে থাকা বৈষম্য
ভারতের উন্নয়ন কাহিনিতে একটি গভীর বৈপরীত্য দেখা যায়। বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন, আবাসন ও ডিজিটাল সংযোগের প্রসারে বহুমাত্রিক দারিদ্র্য কমেছে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে।
তবে বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন দেখাচ্ছে আয় ও সম্পদের কেন্দ্রীকরণ বাড়ছে। ক্ষুদ্র এক অভিজাত শ্রেণি জাতীয় সম্পদের বড় অংশ দখল করছে, যখন বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আয় স্থবির। বাজেট দারিদ্র্য হ্রাসের কথা বললেও বৈষম্য মোকাবিলায় শহুরে কর্মসংস্থান, আয় হস্তান্তর বা সামাজিক সুরক্ষার মতো নীতিতে সীমিত জোর দেওয়া হয়েছে। প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, সমতা যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসবে, এমন ধারণাই প্রাধান্য পেয়েছে।
রাজস্ব ও মুদ্রানীতি
সুদ, পেনশন, ভর্তুকি ও প্রশাসনিক খরচ রাজস্বের বড় অংশ গ্রাস করলেও এসব বাধ্যতামূলক ব্যয় সংস্কারের বিষয়ে বাজেট প্রায় নীরব। ফলে সামাজিক ব্যয় বাড়ানোর আর্থিক জায়গা সংকুচিত থাকে। একই সঙ্গে বৈদেশিক খাতে চাপ বাড়ছে। অস্থির মূলধন প্রবাহ ও চলতি হিসাব ঘাটতির আশঙ্কা টাকার ওপর চাপ তৈরি করছে। এতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে, সুদের হার কমালে মূল্যস্ফীতি ও পুঁজি বহিঃপ্রবাহের ঝুঁকি, বাড়ালে দুর্বল ভোগব্যয় আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফিউচার ও অপশন লেনদেনে এসটিটি বাড়ানো বাজারে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আর্থিক নীতির ভার অনেকটাই মুদ্রানীতির ওপর পড়ছে, যা শক্তিশালী সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
বেসরকারি খাত ও অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন
বাজেট ২০২৬ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব, নিয়ন্ত্রক শিথিলতা ও প্রণোদনার মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর বড় আস্থা প্রকাশ করেছে। অবকাঠামো ও উৎপাদন সম্প্রসারণে বেসরকারি পুঁজি গুরুত্বপূর্ণ হলেও, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছাড়া বাজারনির্ভর উন্নয়ন সাধারণত ইতিমধ্যেই সমৃদ্ধ অঞ্চল ও খাতেই কেন্দ্রীভূত হয়। এর ফলে আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়ার আশঙ্কা থাকে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগ, অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার ও গ্রামীণ অর্থনীতি প্রায়ই প্রবৃদ্ধির মূলধারা থেকে পিছিয়ে পড়ে।
একই সঙ্গে, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব প্রকল্পে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকলে “ক্ষতি সামাজিকীকরণ ও লাভ বেসরকারিকরণ”-এর ঝুঁকি থেকেই যায়। পুঁজি-নির্ভর প্রবৃদ্ধির তুলনায় স্বাস্থ্য ও শিক্ষা এখনও গৌণ অবস্থানে রয়েছে, অথচ মানব পুঁজি উন্নয়ন ছাড়া টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি আবারও সেই পরিচিত ধারাকেই অনুসরণ করছে, আগে বিনিয়োগ, পরে অন্তর্ভুক্তি যা অতীতে প্রায়শই অসম উন্নয়নের জন্ম দিয়েছে।
উপসংহার: প্রবৃদ্ধি আছে, ভারসাম্য নেই
কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬ অবকাঠামো ও শিল্প বিনিয়োগের মাধ্যমে ভারতের প্রবৃদ্ধির গল্পকে জোরদার করলেও এটি এমন এক উন্নয়ন মডেল প্রকাশ করে যা সরবরাহ-পক্ষের সম্প্রসারণে ঝুঁকে আছে এবং ভোগব্যয় পুনরুজ্জীবন, বৈষম্য ও রাজস্ব কাঠামোর দিকে কম নজর দেয়। অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৬ যে দুর্বল ভোগব্যয়, অসম কর্মসংস্থান ও বাড়তে থাকা বৈষম্যের কথা বলেছিল, বাজেট তার সমাধানে কার্যত নীরব থেকেছে।
শক্তিশালী আয় সহায়তা ও শ্রমবাজার সংস্কার ছাড়া পুঁজি ব্যয়ভিত্তিক প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক উৎপাদন বাড়ালেও অন্তর্নিহিত দুর্বলতা থেকেই যাবে, যা “অমৃত কাল”-এ ভারতের উন্নয়ন যাত্রার স্থায়িত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
লেখক: শোভিক মুখার্জ্জী
অর্থনীতির অধ্যাপক
সেন্ট জেভিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়, নিউ টাউন,
কলকাতা ৭০০ ১৬০।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
