কিমচি থেকে কে-পপ : বাঙালির হৃদয়ে কোরিয়া

কিমচি থেকে কে-পপ : বাঙালির হৃদয়ে কোরিয়া

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


সায়ন্তন চট্টোপাধ্যায়

উত্তরবঙ্গের অসম লাগায়ো ছোট্ট সীমান্ত শহরটা সন্ধে নামলেই ঝিমিয়ে পড়ত। মধ্যবিত্ত ড্রয়িংরুমে তখন রাজত্ব করত শাশুড়ি-বৌমার কূটকচাল আর পরকীয়ার চেনা ছক। সায়নী বর্মন তখন একাদশ শ্রেণিতে। সেই বয়সে, যখন মনটা একটু অন্যরকম কিছু খোঁজে, তখনই এক বন্ধুর মুখে প্রথম শোনা— ‘বিটিএস’। সাতজন কোরিয়ান তরুণ, যাঁদের গান নাকি জাদুর মতো। প্রথমে পাত্তা দেয়নি মিষ্টু। ভেবেছিল, ওই আর পাঁচটা ব্যান্ডের মতোই হবে। কিন্তু যেদিন কানে হেডফোন গুঁজে প্রথম গানটা শুনল, সেদিনই বদলে গেল তার জগৎ। একটা গান থেকে আরেকটা, তারপর আরেকটা। সুরগুলো যেন তার মনের কথাই বলছে। শুধু গান নয়, এরপর এল কোরিয়ান ড্রামা বা কে-ড্রামা। একটা শেষ তো আরেকটা শুরু। সায়নী এখন চব্বিশের তরুণী, পেশায় কনটেন্ট রাইটার। জীবন ব্যস্ত হয়েছে, কিন্তু সেই কোরিয়ান প্রেম কমেনি। ১৫০-র বেশি কে-ড্রামা দেখা শেষ, আর প্লে-লিস্টে বিটিএস তো আছেই।

সায়নী একা নন। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, ডুয়ার্স থেকে দার্জিলিং পাহাড়ের আনাচে-কানাচে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে এই কোরিয়ান ঢেউ বা ‘হালু’-র গর্জন। স্মার্টফোনের স্ক্রিন থেকে কলেজ ক্যান্টিন, শপিং মল থেকে রান্নাঘর— সর্বত্রই এখন কোরিয়ার জয়জয়কার। কিন্তু কেন? কেন হাজার হাজার মাইল দূরের একটা দেশ, যাদের ভাষা আমাদের অজানা, সংস্কৃতি আলাদা, তারা এমনভাবে আমাদের মনের দখল নিল? এটা কি শুধুই হুজুগ, নাকি এর শিকড় আরও গভীরে?

অলীক কল্পনা নাকি আবেগের আশ্রয়?

কলকাতার লরেটো কনভেন্টের ছাত্রী, ১৬ বছরের কৃত্তিকা বসু। ক্লাসে সবার মুখে বিটিএস-এর নাম শুনে কৌতূহলবশত ইউটিউবে সার্চ করেছিল। আটকে গেল গানের লিরিক্সে। বিটিএস-এর বিখ্যাত গান ‘ম্যাজিক শপ’। সেখানে একটা লাইন আছে— ‘তুমি আমাকে আমার সেরাটা দিয়েছ, তাই তুমিও তোমার সেরাটা পাবে।’ কৃত্তিকা বলছে, ‘অনেক সময় নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হয়, মনে হয় হারিয়ে যাই। তখন এই গানগুলো আমাকে শক্তি দেয়।’

আসলে, কে-পপ বা কে-ড্রামা শুধু বিনোদন নয়, এটা একটা ‘ইমোশনাল শেলটার’ বা আবেগের আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলিউডের নায়করা যখন সিক্স-প্যাক অ্যাবস দেখিয়ে ভিলেন পেটায়, কিংবা টলিউডের সিরিয়ালে যখন অকারণ ষড়যন্ত্র চলে, তখন কে-ড্রামার নায়ক অন্য রূপে ধরা দেয়। তারা কাঁদে, তারা প্রেমিকার জন্য অপেক্ষা করে, তারা মেয়েদের সম্মান করে।

কলকাতার ইশিকা সিনহা সিঙ্গাপুরে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর কথায়, ‘কে-ড্রামা অনেকটা ২০০০ সালের আগের বলিউড রোমান্টিক সিনেমার মতো। সেই স্নিগ্ধতা, সেই প্রেম, যা এখনকার ভারতীয় কনটেন্টে আর পাওয়া যায় না।’ ‘ক্র্যাশ ল্যান্ডিং অন ইউ’-এর মতো সিরিজে উত্তর কোরিয়ার সেনা অফিসার আর দক্ষিণ কোরিয়ার ধনী তরুণীর প্রেম শুধু রোমান্স নয়, সেখানে রয়েছে পরিবারের প্রতি সম্মান, বয়োজ্যেষ্ঠদের ভয়— যা ভারতীয় মূল্যবোধের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। ইশিকার মতে, ‘পশ্চিমী সিরিজে মা-বাবার প্রতি যে ভয় বা ভক্তি দেখানো হয়, তা আমাদের সঙ্গে মেলে না। কিন্তু কোরিয়ান ড্রামায় যখন দেখি মায়ের ভয়ে সন্তান তটস্থ, তখন আমরা রিলেট করতে পারি। মনে হয়, এ তো আমাদেরই গল্প!’

পাহাড় যখন গেটওয়ে

গোটা ভারত আজ যখন কোরিয়ান জ্বরে কাঁপছে, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং দার্জিলিং-সিকিমের পাহাড় কিন্তু এই ঢেউয়ে ভেসেছে অনেক আগেই। জগদীশ রেড্ডি, যিনি কোরিয়ান কালচার সেন্টারের প্রাক্তন কিউরেটর, তিনি বলছেন, ‘ভারতের মূল ভূখণ্ডে কে-পপ ঢোকার অনেক আগেই মণিপুর, নাগাল্যান্ড এবং আমাদের পাহাড়ের মানুষ পাইরেটেড সিডি বা কেবলের মাধ্যমে কোরিয়ান ছবি দেখত।’

দার্জিলিং, কালিম্পং বা শিলিগুড়ির হংকং মার্কেটে যাঁরা নিয়মিত যান, তাঁরা জানেন কোরিয়ান ফ্যাশন সেখানে নতুন কিছু নয়। সেখানকার তরুণ-তরুণীদের চুলের ছাঁট থেকে জুতোর স্টাইল— সবেতেই কে-পপ আইডলদের ছায়া। দিল্লির গবেষক বিবেক শর্মার মতে, এই সাংস্কৃতিক রপ্তানি কিন্তু আকস্মিক নয়। দক্ষিণ কোরিয়া খুব সচেতনভাবে তাদের সংস্কৃতিকে পণ্য হিসেবে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে। তাদের জনসংখ্যা কমছে, তাই তারা চায় তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি বেঁচে থাকুক বিদেশের মাটিতে। আর সেই কৌশলেই আজ শিলিগুড়ির বা জলপাইগুড়ির কোনও কিশোরী অনর্গল কোরিয়ান শব্দ ‘আন্নিওংহাসেও’ (হ্যালো) বা ‘সারানঘে’ (ভালোবাসি) বলছে। ডুয়োলিঙ্গোর রিপোর্ট বলছে, ভারতে এখন কোরিয়ান ভাষা শেখার আগ্রহ মারাত্মক হারে বেড়েছে। ইংরেজি বা হিন্দির পরেই তরুণ প্রজন্মের পছন্দ এখন কোরিয়ান ভাষা।

ড্রয়িংরুমের বিপ্লব

মুম্বইয়ের ২৫ বছরের অ্যাভ্রিল পেরেইরার গল্পটা বেশ মজার। ইনস্টাগ্রাম রিলস দেখতে দেখতে কে-ড্রামায় আসক্তি। এখন সপ্তাহান্তে তাঁর বাড়িতে মেনু— কোরিয়ান রামেন, কিমচি আর কোরিয়ান ফ্রায়েড চিকেন। তবে চমকটা অন্য জায়গায়। অ্যাভ্রিলের বাবা, ৫৪ বছরের অসি পেরেইরা, যিনি পেশায় অ্যাকাউন্ট্যান্ট, তিনিও এখন কে-ড্রামার ভক্ত। শুরুতে মেয়েকে বকাঝকা করতেন, ‘কী সব চিনে-জাপানি দেখিস সারাদিন?’ কিন্তু একদিন ইউটিউবে একটা ক্লিপ দেখে কৌতূহল জাগল। এখন বাবা-মেয়ে মিলে দেখেন ‘দ্য গ্লোরি’ বা ‘মাই ডিমন’-এর মতো সিরিজ। এমনকি তাদের পোষ্য কুকুরটির নাম রাখা হয়েছে কোরিয়ান ড্রামার নায়িকার নামে— ‘দো দো হি’।

হায়দরাবাদের ৩২ বছরের অভ্যুদয়া যেমন বলছেন, ‘আগে যা পেতাম তাই দেখতাম। এখন বেছে দেখি। কে-ড্রামায় একটা অদ্ভুত শালীনতা আছে। ঝগড়া হচ্ছে, রাগারাগি হচ্ছে, কিন্তু একটা লক্ষ্মণরেখা কেউ পার করে না। ভারতীয় সিরিয়ালে বা ওয়েব সিরিজে আজকাল অশালীন ভাষা বা উগ্রতা বড্ড বেশি। সেখানে কোরিয়ান ড্রামা যেন এক পশলা শান্ত বাতাস।’

বাস্তব বনাম ফ্যান্টাসি

কিন্তু সবটাই কি ভালো? এই অন্ধ ভক্তি বা ‘অবসেশন’ অনেক সময় বিপদও ডেকে আনছে। গাজিয়াবাদের সাম্প্রতিক ঘটনা তার মর্মান্তিক উদাহরণ। তিন বোনের আত্মহত্যা এবং তাদের সুইসাইড নোটে লেখা— ‘আমরা কোরিয়ানদের ভালোবাসি… আমাদের বিয়ে দিও না।’ এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, ফ্যান্টাসি আর বাস্তবকে গুলিয়ে ফেলাটা কতটা ভয়ানক হতে পারে। টিনএজাররা অনেক সময় কে-ড্রামার চকচকে জগৎটাকে ধ্রুবসত্য বলে মেনে নিচ্ছে।

ইশিকা যখন সিঙ্গাপুরে ছিলেন, তখন কোরিয়ান সহপাঠীদের কাছে শুনেছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার আসল পরিস্থিতির কথা। সেখানে নারীবাদী আন্দোলন চলছে, যেখানে মহিলারা বিয়ে, সন্তান এবং ডেটিং— সব কিছুকে ‘না’ বলছেন। ইশিকা অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। যে দেশে ড্রামায় এত রোমান্স, বাস্তবে সেখানকার মহিলারা পুরুষদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কেন? আসলে, স্ক্রিনে যে নায়ককে আদর্শ প্রেমিক হিসেবে দেখানো হয়, বাস্তবে কোরিয়ার সমাজ ব্যবস্থা এখনও অনেকটাই পুরুষতান্ত্রিক। কে-ড্রামা হল সেই কঠোর বাস্তব থেকে পালানোর একটা রঙিন চশমা মাত্র। কিন্তু ভারতের কিশোর-কিশোরীরা সেই চশমাটাকেই আসল চোখ ভেবে ভুল করছে।

বাণিজ্যের বসন্ত

আবেগের পাশাপাশি পকেটের কথাও বলতে হবে। ‘সুইগি’ এবং ‘কার্নি’-এর রিপোর্ট বলছে, ২০২২ সালের পর থেকে ভারতে কোরিয়ান খাবারের অর্ডার বেড়েছে প্রায় ১৭ গুণ! ভাবা যায়? আমাদের পাড়ার মোড়ের দোকানটাতেও এখন ‘কোরিয়ান স্পাইসি নুডলস’ বা ‘রামেন’ পাওয়া যাচ্ছে। ম্যাগি-র একচ্ছত্র বাজারে ভাগ বসিয়েছে মশলাদার কোরিয়ান রামেন। ম্যাকডোনাল্ডস পর্যন্ত বিটিএস মিল বা কোরিয়ান বার্গার আনছে।

শুধু খাবার নয়, প্রসাধনী বা বিউটি প্রোডাক্টের বাজারেও এখন কোরিয়ার দাপট। কোরিয়ান নায়িকাদের মতো ‘গ্লাস স্কিন’ বা কাচের মতো স্বচ্ছ ত্বক পাওয়ার আশায় ভারতীয় মেয়েরা হাজার হাজার টাকা খরচ করছে। শামুকের লালা দিয়ে তৈরি সিরাম বা বিশেষ সানস্ক্রিন— যার দাম আকাশছোঁয়া, তবুও বিক্রি হচ্ছে দেদার। ডাটাম-এর রিপোর্ট বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতে কে-বিউটি বা কোরিয়ান প্রসাধনীর বাজার ১.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। জিনগতভাবে ভারতীয় আর কোরিয়ানদের ত্বক আলাদা, আবহাওয়াও ভিন্ন। তবুও, বিজ্ঞাপনের জাদুতে মোহগ্রস্ত সবাই।

পর্দার আড়ালে একাকিত্বের সঙ্গী

কোভিড অতিমারি বা প্যানডেমিক এই কে-ওয়েভকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। যখন ঘরবন্দি ছিল পৃথিবী, তখন নেটফ্লিক্স বা এমএক্স প্লেয়ারে ডাবিং করা কে-ড্রামাগুলোই ছিল মানুষের সঙ্গী। ‘স্কুইড গেম’ বা ‘অল অফ আস আর ডেড’-এর মতো থ্রিলার যেমন মানুষকে উত্তেজিত করেছে, তেমনই ‘রিপ্লাই ১৯৮৮’-র মতো ফ্যামিলি ড্রামা মানুষকে শিখিয়েছে— জীবনে বড় কিছু না করলেও চলে, শুধু ভালো মানুষ হয়ে পাশে থাকাটাই আসল।

সায়নী বর্মন এখন আর আগের মতো পাগলের মতো ড্রামা দেখেন না। কিন্তু খারাপ দিনে, যখন অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে ফেরেন, তখন কানে বাজে বিটিএস-এর গান ‘জিরো ও’ ক্লক’। গানের কথা— ‘আর তুমি সুখী হবে।’ এই ছোট্ট আশ্বাসটুকুই তাঁকে পরের দিনের জন্য তৈরি করে।

কোরিয়ান কালচার বা ‘হালু’ এখন আর কোনও বহিরাগত সংস্কৃতি নয়, এটি ভারতীয় পপ কালচারের একটা অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি জেন জেড-এর কাছে ফ্যাশন, গৃহিণীদের কাছে অবসরের সঙ্গী, আর একাকিত্বে ভোগা মানুষের কাছে বন্ধু। বলিউড বা হলিউডের সমান্তরালে নিজের জায়গা করে নিয়েছে সিওল।

তবে মনে রাখতে হবে, স্ক্রিনের ওপাশের জগৎটা সাজানো। রামেন খেতে বা কে-পপ শুনতে কোনও বাধা নেই, কিন্তু সেই রঙিন জগৎকে নিজের জীবনের একমাত্র সত্য ভাবলে গাজিয়াবাদের মতো অন্ধকার নেমে আসতে পারে। বিনোদনকে বিনোদন হিসেবে দেখাই বুদ্ধিমানের কাজ।

তবুও, রবিবারের দুপুরে একবাটি ধোঁয়া ওঠা রামেন আর টিভিতে প্রিয় কে-ড্রামা— এই কমফর্ট জোনটুকু থেকে বাঙালিকে এখন কে বের করবে? উত্তরটা সম্ভবত, কেউ না। এই প্রেম, আপাতত ‘ফর লাইফ’।

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *