কার্গিলের সঙ্গে এবারের মিল ও অমিল

কার্গিলের সঙ্গে এবারের মিল ও অমিল

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


 

  • সুমন ভট্টাচার্য

আর এক মে। আবার ভারতের প্রত্যাঘাত।

কার্গিল যুদ্ধ বা ‘অপারেশন বিজয়’-এর সঙ্গে কতটা তফাত এবারের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর? ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নিরিখে আমি মনে করি, কার্গিলের ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা অসম ছিল। তখন পাক হানাদার বাহিনী তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থান দখল করে ছিল|

কারণ ১৯৯৯-এর সেই শীতে ‘মুজাহিদিন’-দের ছদ্মবেশে পাক সেনাবাহিনীরই নর্দার্ন লাইট ইনফ্যান্ট্রির জওয়ানরা ঢুকে পাহাড়ের শৃঙ্গগুলো দখল করে বসে গিয়েছিল। ফলে ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রা কিংবা ক্যাপ্টেন কণাদ ভট্টাচার্যদের কাজটা অনেক কঠিন ছিল। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ ভারতীয় সেনা নিজেদের আকাশসীমার ভিতরে থেকে পাকিস্তানে এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীরে প্রত্যাঘাত করেছে।

আমার কার্গিল যুদ্ধ দেখা এবং বিদেশনীতি জানার অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যতই ভারতীয় আক্রমণকে ‘শেম’ বলে মন্তব্য করুন, অজিত দোভালরা মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা এবং ইজরায়েলের ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্কের সাহায্য পেয়েছে। সেই কারণেই এত নিপুণভাবে লাহোরের অনতিদূরে ভাওয়ালপুরে জইশ-ই-মহম্মদের ঘাঁটিতে কিংবা মুরিদকেতে লস্কর-ই-তৈবার সদর দপ্তরে ভারতীয় মিসাইল ফেলায় এত সফল।

রাজনৈতিকভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, ১৯৭১-এর যুদ্ধের পর এই প্রথম ভারত পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডে আক্রমণ চালাল। যতই নয়াদিল্লির তরফে বলা হোক, তারা শুধুমাত্র জঙ্গিঘাঁটিকেই নিশানা করেছে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর কোনও প্রতিষ্ঠান বা অন্য কিছুতে আক্রমণ চালানো হয়নি, এটা আমাদের বুঝতে হবে, ভাওয়ালপুর কিংবা মুরিদকেতে আক্রমণ করা মানে পাক-পাঞ্জাবে আক্রমণ! আর কে না জানে পাকিস্তানের রাজনীতির ভরকেন্দ্র বা নিউক্লিয়াস হচ্ছে সেদেশের পাঞ্জাব।

পাক সেনাবাহিনীকে তারা নিয়ন্ত্রণ করে, পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের শীর্ষকর্তাদের অধিকাংশই পাঞ্জাবি। বুধবার ভারতীয় আক্রমণের পর টিভিতে দেখলাম পাক-পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম শরিফকে, যিনি নওয়াজ শরিফের কন্যা এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের ভাইঝি| ইসলামাবাদের প্রতিক্রিয়া বা মরিয়মের পালটা হামলার হুঁশিয়ারি আসলে বুঝিয়ে দেয় পাকিস্তানের শক্তির ভরকেন্দ্র কতটা কেঁপে গিয়েছে।

কার্গিল যুদ্ধ ছিল তৎকালীন পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পিঠে সেই সময়কার সেনাপ্রধান পারভেজ মুশারফের গুঁজে দেওয়া ‘খঞ্জর’। কার্গিলের কিছুদিন আগেই নওয়াজের ডাকে অটলবিহারী বাজপেয়ী লাহোর বাসযাত্রা করেছিলেন এবং নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদের মধ্যে সম্প্রীতির হাওয়া বইছিল। বাজপেয়ীর সেই বিখ্যাত লাহোর যাত্রার পরে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে কী কী চালু করা যায়, যেমন ট্রেন, বাস, তা নিয়ে চর্চার অন্ত ছিল না।

আমাদের পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশে ‘এস্টাবলিশমেন্ট’ বলতে যা বোঝায়, অর্থাৎ সেনাবাহিনী, গুপ্তচর সংস্থা এবং আরও অনেক কিছু মিলিয়ে যে তথাকথিত ‘প্রতিষ্ঠান’ নামে জিনিসটি রয়েছে, তারা স্বভাবতই নওয়াজ শরিফের ভারতীয় অতিথিদের কাবাব খাওয়ানোর ভিজুয়ালস কিংবা ‘মেহমানগিরি’র উদাহরণে খুশি ছিল না। তারই ফলস্বরূপ এসেছিল কার্গিল। মুশারফ সেবার নওয়াজ, তাঁর ‘রাজনৈতিক বস’-কে একেবারে রান আউট করে দেওয়ার জন্য নর্দার্ন লাইট ইনফ্যান্ট্রির সেনাদেরই পাহাড়ের মাথায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। জাতীয় সড়ক ‘ওয়ান এ’, যা আসলে লে-র সঙ্গে শ্রীনগরের সংযোগ রক্ষা করে, যা দিয়ে শুধু লাদাখের পণ্য যেত না, ভারতীয় সেনার জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জামও যেত, সেই রাস্তাই চলে গিয়েছিল পাক বাহিনীর গোলার নিশানায়।

গত ২৫ বছরে শতদ্রু, ঝিলম দিয়ে অনেক জল বয়েছে। পাকিস্তানে শুধু শরিফরা না, ভুট্টো পরিবারও এখন সেনাবাহিনীর ‘হাতের পুতুল’ মাত্র। সেনার মদতেই ক্ষমতায় আসা এবং সেনার অসন্তুষ্টিতেই ক্ষমতা হারানো পাকিস্তানের বিশ্বকাপজয়ী ক্রিকেট অধিনায়ক ইমরান খানের জেলবন্দি হওয়ার ঘটনা বলে দিয়েছে, ইসলামাবাদে ‘এস্টাবলিশমেন্ট’-ই শেষ কথা। সেই কারণে আবারও সেই নওয়াজের দাওয়াতে মোদিও আচমকা পাকিস্তান ঘুরে এলেও ভালো করে বোঝেন পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশের মন বোঝা বড় দুষ্কর। শরিফদের খাওয়ানো কাবাবে সবসময়েই ‘হাড্ডি’ পাক সেনাবাহিনী। এটা বোঝেন বলেই নরেন্দ্র মোদির এনডিএ সরকার এর আগে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করেছে, আর এবারে একেবারে পাক-পাঞ্জাবে বিস্ফোরণের শব্দ শুনিয়ে দিয়েছে।

কার্গিলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর লড়াইটা মূলত ছিল ‘হ্যান্ড টু হ্যান্ড ব্যাটল’। অর্থাৎ শেষপর্যন্ত পাহাড়ের ওপরে উঠে দখলদারদের হাত থেকে প্রতিটি বাংকার দখলের জন্য হাতাহাতি লড়াই করতে হয়েছিল। কার্গিলের পর্বতশৃঙ্গগুলির অবস্থান যেরকম উঁচু এবং যেরকম সুবিধাজনক জায়গায় পাক হানাদার বাহিনী ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল, তাতে তাদের মেশিনগানের গুলিকে অতিক্রম করে হেঁটে পর্বতশৃঙ্গে পৌঁছে বাংকার দখল করা ছাড়া যুদ্ধ জয়ের আর কোনও উপায় ছিল না।

আমার স্যাটেলাইট ফোন থেকে মাঝেমধ্যেই প্রেমিকা ডিম্পল চিমাকে ফোন করা বিক্রম বাত্রা আমাদের সেই হাতাহাতি যেসব যুদ্ধের বিবরণ শোনাতেন। তেমনই গল্প শুনেছিলাম কার্গিল যুদ্ধের আর এক বীর সেনানী ক্যাপ্টেন শচীন নিম্বলকরের কাছ থেকে। অর্থাৎ লড়াইটা ছিল অনেক মুখোমুখি, অনেক ‘ব্যক্তিগত’ এবং অনেক রক্তাক্ত। সেই জন্যই কার্গিলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি ছিল। ভারতীয় তরফে শহিদ হয়েছিলেন অনেকে।

‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর সেনার প্রেস বিবৃতি যতটা নির্মেদ বা সোফিয়া কুরেশি ও উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিংদের প্রেস ব্রিফিং যতটা সংক্ষিপ্ত, অপারেশনও তত নিখুঁত এবং নির্ভুল। পাক সেনাবাহিনীর তরফে দাবি করা হয়েছে তারা ভারতের পাঁচটি যুদ্ধবিমানকে গুলি করে নামিয়েছে। কিন্তু ইসলামাবাদও স্বীকার করে নিয়েছে, ভারতীয় বিমানগুলি তাদের আকাশসীমার মধ্যেই ছিল। সংবাদ সংস্থা রয়টার্স কাশ্মীরের স্থানীয় সূত্র উদ্ধৃত করে তিনটি ভারতীয় ভেঙে পড়া যুদ্ধবিমানের ছবি দেখিয়েছে। কিন্তু ইসলামাবাদের কথা অথবা রয়টার্সের তথ্যকে যদি বিশ্বাসও করি, তাহলেও বলতে হবে ভারতীয় সেনা এবারে বড় কোনও ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়নি। পাকিস্তানের হাতে ভারতের কেউ যুদ্ধবন্দি হিসেবে নেইও। এটা অবশ্যই ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর একটা বড় সাফল্য।

আমাদের মনে রাখতে হবে, কার্গিল যুদ্ধের সময়ও যেমন বিমান আক্রমণ চালাতে গিয়ে নচিকেতা পাকিস্তানে আটক হয়েছিলেন, তেমনই যুদ্ধের একেবারে প্রথম দিকে লেফটেন্যান্ট সৌরভ কালিয়া এবং তাঁর চার সঙ্গীর করুণতম পরিণতি হয়েছিল।

এখনও মনে আছে সৌরভ কালিয়া এবং তাঁর সঙ্গী সেনা জওয়ানদের দেহ যেদিন পাকিস্তান ফেরত দিল, সেদিন ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য কী যন্ত্রণার দিন ছিল, তা আজও ২৫ বছরের ব্যবধানে আমার স্মৃতিতে রয়ে গিয়েছে। তরুণ অফিসারের ক্ষতবিক্ষত শরীর, খুবলে তুলে নেওয়া অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রাগকে আরও তীব্রতর করেছিল।

‘অপারেশন সিঁদুর’-এ লড়াইটা অনেক ‘যান্ত্রিক’। সেনাবাহিনীর বিবৃতির ভাষায় ‘প্রিসাইজ, টার্গেটেড’। অবশ্যই তাতে ব্যক্তিগত শৌর্য আছে, হয়তো যুদ্ধবিমান থেকে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে নির্ভুল নিশানায় জঙ্গিঘাঁটিতে আঘাত হানার মতো সক্ষমতা দেখিয়েছে, কিন্তু সামনাসামনি আকচা-আকচি নেই। কার্গিলে বহু বাংকার আমরা দখল করেছিলাম গোর্খা বা নাগা বাহিনীর সম্মুখসমরের অভিজ্ঞতা দিয়ে। কুকরি কিংবা বেয়নেটের জোরে। ‘অপারেশন সিঁদুর’ টার্গেট লক করা এবং লক্ষ্যবস্তুকে উড়িয়ে দেওয়ার অবিস্মরণীয় আখ্যান হয়ে রইল।

(লেখক সাংবাদিক। কার্গিল যুদ্ধ কভার করার অভিজ্ঞতা রয়েছে)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *