কম্পনে সর্বোচ্চ ঝুঁকি উত্তরে, যথেচ্ছ নির্মাণ ও বৃক্ষচ্ছেদনে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

কম্পনে সর্বোচ্চ ঝুঁকি উত্তরে, যথেচ্ছ নির্মাণ ও বৃক্ষচ্ছেদনে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

খেলাধুলা/SPORTS
Spread the love


রাহুল মজুমদার, শিলিগুড়ি: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর উত্তরবঙ্গ। যেন ঢেলে সাজানো হয়েছে ডুয়ার্স, পাহাড়কে। সেই জনপদের শিয়রে এবার নতুন শঙ্কা।

ভারতীয় মান নির্ণায়ক সূচক (বিআইএস)-এর সাম্প্রতিক ঘোষিত ‘সিসমিক জোন’ (ভূমিকম্পপ্রবণ)-এর ম্যাপে ‘সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ (জোন ৬) হিসেবে চিহ্নিত হল তরাই, ডুয়ার্স (Dooars), দার্জিলিং (Darjeeling) ও কালিম্পং (Kalimpong)। একই তালিকায় নাম লিখিয়েছে সিকিমও (Sikkim)। এই জায়গাগুলো আগে সিসমিক জোনের ম্যাপে চতুর্থ স্থানে ছিল। নয়া ম্যাপ প্রকাশ হতেই উদ্বেগের সুর শোনা যাচ্ছে পরিবেশবিদ, ভূবিজ্ঞানীদের গলায়। বিষয়টিকে রেড অ্যালার্ট হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ম্যাপের যে জোনে ওই এলাকা অন্তর্ভুক্ত, রিখটার স্কেলে আট থেকে নয় মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সেখানে।

ভূবিজ্ঞানীদের মতে, এখন থেকেই সতর্ক হতে হবে প্রশাসনকে। নির্দিষ্ট পরিকল্পনামাফিক পদক্ষেপ না করলে ভবিষ্যতে ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই বেশি হতে পারে। অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এরাজ্যের কালিম্পং ও পড়শি সিকিমের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো। পাহাড়ে উন্নয়নমূলক কাজের ক্ষেত্রে আরও সাবধানী হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বলছেন, নির্মাণের জন্য আরও কঠোরভাবে গাইডলাইন তৈরি করে দেওয়া উচিত এখনই।

পদ্মশ্রীপ্রাপক পরিবেশবিদ শিলিগুড়ির একলব্য শর্মার বক্তব্য, ‘আমি বিআইএসের রিপোর্টটি দেখেছি। অবিলম্বে স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়ে গাইডলাইন তৈরি করে দেওয়া প্রয়োজন। পাহাড় ও তরাইয়ে চারতলার বেশি উঁচু ভবন নির্মাণ করা যাবে না। উন্নয়নমূলক কাজ যেন নিয়ম মেনে প্রযুক্তির সাহায্যে হয়। আমাদের পাহাড়ে এখনও প্রচুর গাছ রয়েছে, কিছুটা হলেও সেটা ভূমিধস রোধে সহযোগিতা করবে। তবে, বৃক্ষচ্ছেদন রুখতে হবে অবিলম্বে।’

ছয়টি ক্যাটিগোরিতে ভাগ করে ২৪ নভেম্বর বিআইএস সিকিম, দার্জিলিং, কালিম্পং, তরাই ও ডুয়ার্সকে ‘সিসমিক জোন ৬’ হিসেবে ঘোষণা করে। আগে এই এলাকা ভূমিকম্পপ্রবণ বলে চিহ্নিত ছিল। নতুন রিপোর্ট অনুযায়ী, সেটা বদলে হয়েছে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। যে ছয়টি মানদণ্ডের ওপর নির্ভর করে তালিকাটি তৈরি হয়েছে, তারমধ্যে অন্যতম পাহাড়ে মাথা তোলা উঁচু বিল্ডিং, পাহাড় কেটে একের পর এক নির্মাণ, ঝোরা ও পাহাড়ি নদীর গতিপথ পরিবর্তন। পরিবেশবিদরা মনে করছেন, সিকিম-রংপো রেলপ্রকল্প যদি ভূমিকম্পরোধক প্রযুক্তি মেনে তৈরি না হয়ে থাকে, তবে সেটিও বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে।

উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওলজির অধ্যাপক কৌশিক সাহা বলছিলেন, ‘আগের তুলনায় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা কিন্তু বেড়ে গেল। শিলিগুড়িতে ব্যাংয়ের ছাতার মতো বহুতল তৈরি হচ্ছে মূল রাস্তা থেকে অলিগলি, মর্জিমতো কাজ চলছে। জলাভূমির ওপর বিল্ডিং হচ্ছে। অথচ বহু জায়গার মাটি কিন্তু খুব বেশি শক্তিশালী নয়। পাহাড়ের ঢালে বাড়িঘর, হোমস্টে, রেস্তোরঁা তৈরির আগে ভাবতে হবে। ধস নামার সম্ভাবনা কিন্তু বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষত বর্ষাকালে এখানে ক্ষতির সম্ভাবনা অনেক বেশি।’

পাহাড় মূলত ডালিং ও দামুদা সিরিজের হয়। ডালিং অর্থাৎ নবীন, ভঙ্গুর ও ক্ষয়িষ্ণু পাথর দিয়ে তৈরি পাহাড়। এগুলো প্রতিনিয়ত নিজের উচ্চতা পরিবর্তন করছে। হিমালয় পাহাড় এর অধীনেই পড়ছে, যা ইন্ডিয়ান টেকটনিক প্লেটের ওপর দাঁড়িয়ে। এই প্লেট প্রতিবছর ইউরেশিয়ান প্লেটকে ধাক্কা মারছে। ফলে ইউরেশিয়ান পাঁচ সেন্টিমিটার করে পিছিয়ে ও ইন্ডিয়ান উত্তরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দুটো প্লেটের ঘর্ষণে মাটির নীচে প্রচুর পরিমাণে শক্তি সঞ্চয় হয়ে ছোট ছোট আকারে ভূমিকম্প হচ্ছে।

এদিকে, সিসমিক গ্যাপ তৈরি হয়েছে হিমালয় পর্বতমালায়। ওই সঞ্চিত শক্তি যে কোনও সময় সিসমিক গ্যাপ দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে। যার ফলে রিখটার স্কেলে আট থেকে নয় মাত্রায় ভূমিকম্প হতে পারে বলে আশঙ্কা বিজ্ঞানীদের। মূলত, এই কারণেই সংশ্লিষ্ট এলাকাকে ‘সিসমিক জোন ৬’-এ নথিভুক্ত করা হল।

উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক রঞ্জন রায়ের কথায়, ‘আতঙ্কিত না হয়ে আমাদের এখন থেকে সতর্ক হতে হবে। সরকার, মানুষ- উভয়েরই আগাম প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। জাপান, মালয়েশিয়ার মতো দেশও ‘রিং অফ ফায়ার’-এর মধ্যে রয়েছে। যখন-তখন সেখানে ভূমিকম্প হচ্ছে। তবুও কিন্তু জীবনযাপন থমকে নেই। উন্নয়নের কাজে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করছে ওরা। এখানেও তেমন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করা প্রয়োজন।’



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *