কমলাসুন্দরীর প্রেমে ‘স্বপ্নভঙ্গের’ আশঙ্কা

কমলাসুন্দরীর প্রেমে ‘স্বপ্নভঙ্গের’ আশঙ্কা

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


সমস্ত চকচকে বস্তু যেমন সোনা হয় না, তেমন পাহাড়ি রাস্তার ধারে কিংবা শিলিগুড়ির বিভিন্ন বাজারে ঢাল করে বিকোনো সব কমলালেবুই দার্জিলিংয়ের নয়। অনন্য স্বাদ আর গন্ধের জন্য এর আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা। সেই সুযোগ নিয়েই দেদারে বিকোচ্ছে ভিনরাজ্যের ফল।

রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি: ধীরে ধীরে জাঁকিয়ে বসছে শীত। পেটপুরে মধ্যাহ্নভোজনের পর নরম রোদে পিঠ দিয়ে কিংবা দুপুরে ভাতঘুমের পর অলস বিকেলে কমলালেবু ছাড়া ব্যাপার ঠিক জমতে চাইছে না।

খোসা ছাড়িয়ে একটি একটি করে কোয়া মুখে পুরতেই দু’চোখ যেন বুজে আসে। যদি আপনার ভালোমানের কমলালেবু চেনার ক্ষমতা না থাকে, তবে কিন্তু টক স্বাদে জড়িয়ে আসবে জিভ। আর চিনে নিতে পারলেই কেল্লা ফতে।

কিন্তু, সাধু সাবধান। সমস্ত চকচকে বস্তু যেমন সোনা হয় না, তেমন পাহাড়ি রাস্তার ধারে কিংবা শিলিগুড়ির বিভিন্ন বাজারে ঢাল করে বিকোনো সব কমলালেবুই (Orange) দার্জিলিংয়ের (Darjeeling) নয়। অনন্য স্বাদ আর গন্ধের জন্য এর আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা। সেই সুযোগ নিয়েই দেদারে বিকোচ্ছে ভিনরাজ্যের ফল।

ক্ষতি কী? আসুন দিনকয়েক আগেকার একটি ঘটনা বলি। দুপুরবেলায় পাহাড়ি পথের ধারে কমলালেবুর পসরা সাজিয়ে বসে কয়েকজন মহিলা। দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ের রাস্তায় এমন ছবি হামেশাই চোখে পড়বে। একটি চারচাকার ছোট গাড়ির ভেতর থেকে চিৎকার করে উঠল এক খুদে, ‘বাবা দ্যাখো দার্জিলিংয়ের কমলালেবু!’ গাড়ি থামিয়ে দরদাম করে এক কেজি কিনল খিদিরপুর থেকে আসা পর্যটকের দলটি।

সেই দলের একজন দিলীপ তালুকদার। সড়কের ধারে দাঁড়িয়ে একটির খোসা ছাড়িয়ে মুখে পুরতেই বিরক্তি প্রকাশ করলেন। বললেন, ‘হে রাম! এর তো কোনও স্বাদই নেই। কিন্তু আমি যে শুনেছি…।’

প্রতিবেদককে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি লোকাল? দার্জিলিংয়ের কমলালেবু কি এখন টক হয়ে গিয়েছে? কেমন যেন শুকনো শুকনো লাগল।’

এরপর দোকানিকে চেপে ধরতেই তিনি স্বীকার করলেন, ‘সিটং, তিস্তাভ্যালির কমলালেবুর সঙ্গে বাইরের কমলালেবু মিশিয়ে বিক্রি করছি। সবাই তো এভাবেই ব্যবসা করছেন।’

‘এটা অন্যায়’, বললেন সিঙ্কোনা প্রকল্পের অধিকর্তা ডঃ স্যামুয়েল রাই। তাঁর মতে, ‘এভাবে তো আমাদের পাহাড়ের বদনাম হয়। দার্জিলিংয়ের কমলালেবুর স্বার্থেই অবিলম্বে ফাটকা কারবার বন্ধ হওয়া উচিত।’

সেবকে রাস্তার দু’পাশে অগুনতি দোকান বসতে দেখা যায়। সেবক রেলগেটেও কয়েকজন ফেরিওয়ালা প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগে কমলালেবু ভরে দার্জিলিংয়ের বলে বিক্রি করেন। তারপর থেকে কালিঝোরা, সিটং মোড়, লোহাপুল, তিস্তাভ্যালি এবং রম্ভি হয়ে তিস্তাবাজার পর্যন্ত পথের দু’ধারে কয়েকশো মহিলা একইভাবে কারবার চালান। ১০টি করে কমলালেবুর প্যাকেট আকার অনুযায়ী ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে দর হাঁকেন।

সুমেধা থাপা নামে একজনকে জিজ্ঞাসা করতেই প্রথমে জোর দিয়ে সেদিন বললেন, ‘এগুলো দার্জিলিংয়ের কমলালেবু। সকালে পেড়ে এনেছি।’

– দার্জিলিংয়ের কোন জায়গার?
– সিটংয়ের।
– কিন্তু দেখে বা গন্ধে তো তেমন মনে হচ্ছে না।
সাংবাদিক পরিচয় দিতেই আর কোনও জবাব এল না।

১০ নম্বর জাতীয় সড়ক থেকে তিস্তাভ্যালি চা বাগানে ওঠার মোড়ে অন্তত ২৫-৩০ জন মহিলা বিক্রেতার দেখা মিলল। বীথিকা নামে একজন বলছিলেন, ‘এগুলো নাগপুর, নাসিকের কমলালেবু। সঙ্গে দু’চারটি করে সিটং, লাটপাঞ্চার আর তিস্তাভ্যালির কমলালেবুও রয়েছে। আমরা দার্জিলিংয়ের কমলালেবু হিসেবে বিক্রি করি।’
কেন মিথ্যের আশ্রয় নিতে হচ্ছে?

বীথিকার ব্যাখ্যায়, ‘দার্জিলিং, সিটংয়ের কমলালেবুর প্রচুর দাম। অত টাকা দিয়ে রাস্তার পাশের দোকান থেকে কেউই কিনবে না। আমরা দু’পয়সা রোজগারের জন্য শিলিগুড়ির বাজার থেকে নাসিক, নাগপুরের কমলালেবু কিনে এনে বিক্রি করছি।’

শিলিগুড়ির খুচরো বাজারে নাগপুরের কমলালেবু ৭০-৮০ টাকা কেজি প্রতি বিক্রি হচ্ছে। এক কেজিতে ৭-৮টি করে ওঠে। সেগুলো পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে ১০টি করে একটি প্যাকেট বানিয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় ‘দার্জিলিংয়ের কমলালেবু’ পরিচয়ে বিক্রি করা হচ্ছে।

উপায় কি নেই সঠিকটি চিনে নেওয়ার?

অভিজ্ঞ ক্রেতারা বলছেন, চোখ-নাক খোলা রেখে কিনতে হবে। সাধারণত, দার্জিলিংয়ের কমলালেবু আকারে তুলনামূলকভাবে ছোট হয়। দুই মেরু পৃথিবীর মতো চ্যাপ্টা। রং ‘পারফেক্ট’ কমলা। এর খোসা পাতলা আর মসৃণ। কিন্তু, ভিনরাজ্যের কমলালেবুর খোসা হয় অনেক বেশি খসখসে ও মোটা। নাগপুরের ফলটি গোলাকার, গায়ের রং হলুদের ওপর সবুজের ছোঁয়া। দার্জিলিংয়ের ক্ষেত্রে খোসা ভেতরের অংশের সঙ্গে শক্তভাবে লেগে থাকে না।

পাহাড়ের লেবুর মধ্যেও বৈচিত্র্য রয়েছে। ‘ট্যানজারিন’ স্বাদে বেশ মিষ্টি, আকারে ছোট এবং খোসা পাতলা। আরও একটি আছে। আকারে একটু বড়, খোসা তুলনামূলক মোটা এবং খানিকটা লালচে ভাব বেশি। সেটিও মিষ্টি। নাম মান্দারিন। এর কোয়া ছাড়িয়ে খাওয়া যায় সহজেই। মান্দারিন, ট্যানজারিন আর অরেঞ্জ বা কমলালেবু বাইরে থেকে দেখতে প্রায় একইরকম, তবে প্রজাতি আলাদা। উৎপত্তিগত দিক থেকেও কিছু পার্থক্য রয়েছে।

অরেঞ্জের জন্ম এশিয়া মহাদেশে। অনেকের মতে, ইন্দোনেশিয়া ও চিনের দক্ষিণাঞ্চলে। সাইট্রাস সাইনেসিস প্রজাতির ফল। সাধারণত, মরশুম শুরু হয় নভেম্বর থেকে। চলে মার্চ পর্যন্ত। প্রকারভেদে রঙের তারতম্য দেখা যায়।

গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (জিটিএ) মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক শক্তিপ্রসাদ শর্মার গলাতেও আফসোসের সুর, ‘বাজারে দার্জিলিংয়ের বলে বিক্রি হওয়া কমলালেবুর অধিকাংশই এখানকার নয়। বিষয়টি অনেকেই জানেন না। আসল-নকল চেনেন না। তার সুযোগ নেন বিক্রেতারা। বাইরে থেকে যাঁরা আসছেন, বিশেষত পর্যটকরা, কিনে ঠকছেন।’

The put up  কমলাসুন্দরীর প্রেমে ‘স্বপ্নভঙ্গের’ আশঙ্কা appeared first on Uttarbanga Sambad.



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *