উচ্চারণ
সুশীল মণ্ডল
গভীর হয়ে অনেক অতলে মনের অন্দরে
অনেক শব্দের স্তূপে চাপা পড়ে আছে
একটা মোহময়ী উচ্চারণ।
তার কথা বলা বারণ সাদা পাতায়
কথা বলা বারণ গাছের পাতায়
সে কথা বলতে পারে না মেঘের ক্যানভাসে।
তাকে মাঝে মাঝে বলি অন্তহীন বিস্মরণ
সঙ্গোপনে চেয়ে থাকা ঝাপসা অতীত।
জানি
উচ্চারণ উচ্চারিত না হলে
দুঃখ ডানা মেলে না
নারীর মধ্যে মেলে না কবিতার দেখা
নদী তার তরঙ্গমালায় জ্যোৎস্না মাখতে পারে না।
উচ্চারণ উচ্চারিত হলে পদ্মবনে মৌমাছি আসে
নিথর অরণ্যে পাখি ডেকে ওঠে
আমরা সবাই কেমন যেন কবি হয়ে উঠি।
ফিরে আসো তুমি
অনুপ দত্ত
সারাদিন এলোমেলো চিন্তায় ঘুরে ফিরে আসো তুমি
কখন সকাল গড়িয়ে যায় বিধবার সিঁথির মতো পথ ধরে
তুমি হেসে উঠলেই ঝরে পড়ে শুকনো গোলাপ
পাখিরা গেয়ে ওঠে ‘এ দিল মাঙ্গে মোর’…
পাইন, বট পেরিয়ে একসময় বসন্তের আকাশে খসে পড়ে তারা
রাঙা মাসি ছেঁড়া চটিতে সেফটিপিন গুঁজে মিলিয়ে যায় অন্ধকারে
পাড়ার মোড়ে তুফানি আড্ডায় তোমার চর্চায় বাতাসের মতো ছড়িয়েছে গুটখার গুঁড়ো
ভয় পেয়ো না… রিয়ালিটি শোয়ে মাতঙ্গিনী হাজরার মতো এগিয়ে যাও…
গুগলে সার্চ করে লোকেশন দেখে তবেই সেই পথে এসো
এখানে তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে শিশিরের জলে ঝাপসা হয়ে আসছে মায়াদেবীর সংসার
ভালোবাসা ভালোবাসা চিৎপুর চিৎপুর বলে চেঁচিয়ে গেল বাস কনডাক্টর
বসার আসনে ছড়িয়ে আছে পিৎজার খালি বাক্স, দেশলাই কাঠের চামচ
ছায়াহীন পিরামিডের চূড়ায় বসে চোখ পড়েছে গহীন স্রোতে
তুমি কোথায়? রাত বাড়ছে সিন্ধুপাড়ে…
সারাদিন এলোমেলো চিন্তায় ঘুরে ফিরে আসো তুমি…
যাযাবর সময়
সঞ্জয় বিশ্বাস
তোমাকে প্রথম দেখেছি যাযাবরের বিষণ্ণ সারিতে
বসন্তের উদাস দিনে, ঝরা পলাশের মোহনীয় রং
মেখে তুমি চলেছিলে সজারুদের গোপন ঠিকানায়
তখন অরণ্যের বোবা মর্মর ধ্বনি তোমার কর্ণমূলে
পেয়েছিল সুরের দ্যোতনা। জংলা পাতার মালা পরে
তুমি ফিরে এসেছিলে দখিন বাতায়নে, তখন
তোমার চোখের পাতায় দেখেছি আচম্বিতে লেগে থাকা
তৃণভোজী হরিণের ভয়, মধ্য দুপুরের ঝলসানো বাতাসে
সেদিন তুমি কাকে খুঁজেছিলে একা একা?
বহুদিন অন্ধ রাতে তোমাকে খুঁজেছিলাম যাযাবর কুয়াশায়…
খুঁজে খুঁজে আমার চোখের দৃষ্টি হয়েছিল সলতে পাকানো
প্রদীপের শেষ নিভু নিভু আলোর বিন্দু, এখন-
আমি তো বসে আছি এই শরীর থেকে অস্থি বিসর্জন দিয়ে,
বুকের ভিতরে জেগে আছে অসহনীয় রাত, আদিম বটবৃক্ষের
ঘ্রাণ আমাকে করেছে আরও উন্মাদ, তুমিও হয়েছ উন্মাদিনী
সময় হয়েছে এখন অস্তগামী জাহাজে উঠবার
দু’জনেই এখন চলে যাব উদাসী বসন্তের ওপার
শব্দের মিছিল
পার্থসারথি চক্রবর্তী
সময়, সে তো ক্ষয়িষ্ণু
আলোও কমে আসে ক্রমশ
কাছে দূরে মিলিয়ে যায়-
কোনো এক লহমায়!
মুষ্টিবদ্ধ বালি চোরাপথ খোঁজে,
গাছেরা কানে কানে বলে যায় –
ঝরে যাবে তোমার পাতাও
একদিন,আমাদের মতো!
ভাত, বিশ্বাস আর সন্দেহের দ্বন্দ্ব
চলছেই তবু চিরকাল;
আগুনে পথের ছাই উড়িয়ে
জীবনের মিছিলে সারি সারি।
ফাগুন দাগ
প্রীতিলতা চাকী নন্দী
বাসন্তিক আঘাতের তীব্রতা জানতে চাইলে
ভেঙে টুকরো টুকরো হবার গল্প শোনাবো একদিন
বাঁকা চাঁদের প্রবন্ধ বহু পুরোনো
এবার উপন্যাস লিখবার পালা
অকপট যাদের ভালোবেসেছি
পাশে অযোগ্য থেকে গেছি
যারা আজীবন ভালোবেসে থেকে গেল
মুহূর্তের ভেতর আপন হতে পারিনি
এক আকাশ ভরসা যেখানে ছিল
বিনিময়ে একমাত্র অবলম্বন হয়ে রইলাম
সারাদিনের ঝলসানো উনুন
সামলে ওঠবার পর
যখন দহন ভুলে যাই
কড়াই বেয়ে নেমে আসা ঝোলের দাগ
বসন্ত খোঁজে প্রতিনিয়ত।
বড়ো একাকী
সন্ধ্যা দত্ত
আমার মননে ও চিন্তনে,
দুধেল ফেনার মতো ভেসে ওঠে
কিছু বিপন্নতা—
পিছু নেয় অবোধ অভিমান।
নিরম্বু অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াই—
সংশয়ের আঁচে ধুঁকছে বর্ণমালারা।
ব্রাত্য ওরা আজ—
ফিকে হয়ে গিয়েছে রক্তের রঙ।
তবুও কিছু বেপরোয়া শেষ ধাপটায়
নামতে চায়।
শুধুমাত্র শেকড়ের সন্ধানে।
অস্তিত্বের লড়াই টিকিয়ে রাখে।
উথালপাথাল করে।
হা-ঘরে অক্ষররা ভূমি আঁকড়ে থাকে।
কিছু ভাষা প্রেমীদের বদান্যতায়।
বিমূঢ় স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণরা,
মাথানত করে দাঁড়ায় এককোণে!
নীরবে, নিভৃতে একাকী অসহায়,
বড়ো একাকী।।
