ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি যাতে সসম্মানে উত্তীর্ণ হতে পারে, তার জন্য দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের চেষ্টায় এতটুকু ফাঁকি নেই। দিল্লির নেতাদের নিয়মিত আনাগোনা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। মেট্রোর অনুষ্ঠানে হালে কলকাতা এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সে যাত্রায় মোদি জনসভাও করেছিলেন। সেনাবাহিনীর অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী ফের কলকাতায় এসেছেন। এ যাত্রায় দলীয় অনুষ্ঠান না থাকলেও প্রধানমন্ত্রী রাজভবনে রাজ্য নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর একে একে আসবেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা। ভোটমুখী পশ্চিমবঙ্গে ঠাসা কর্মসূচি বিজেপির শীর্ষ নেতাদের।
এর পাশাপাশি বাঙালি আবেগে শান দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারের দেখাদেখি রাজ্য বিজেপিও এবার বাংলার জেলায় জেলায় বিভিন্ন পুজো কমিটিকে আর্থিক সাহায্য করবে। বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে বাঙালি শ্রমিকদের হেনস্তা নিয়ে তৃণমূল যখন আন্দোলন করছিল, তখন গেরুয়া শিবিরের পালটা কোনও কর্মসূচি ছিল না। উলটে শুভেন্দু অধিকারীর মতো কেউ কেউ বেফাঁস মন্তব্য করায় দলের ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা তৈরি হয়েছে। দুর্গাপুজোর ক্ষেত্রে অবশ্য দল কৌশল বদলাচ্ছে। দলের দেওয়া অর্থ সরাসরি পুজো কমিটির হাতে তুলে দেবেন মহাতারকা তথা বিজেপি নেতা মিঠুন চক্রবর্তী। আবার তৃণমূলের স্বামী বিবেকানন্দ কাপের পালটা নরেন্দ্র কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করছে বিজেপি।
রাজ্য নেতৃত্ব বড় বেশি হাইকমান্ড নির্ভর হয়ে পড়েছে। শোনা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা নাকি ভোট উপলক্ষ্যে কলকাতায় ঘাঁটি গেড়ে মাস কয়েক থাকবেন। মাঝেমধ্যে দিল্লি যাবেন। জুলাইয়ে গোটা রাজ্যের বুথভিত্তিক সমীক্ষার একটি রিপোর্ট শা’র কাছে জমা পড়ে। জেলায় জেলায় কোন বুথ কতটা শক্তিশালী, কোন বুথ কতটা দুর্বল, কোথায় কোথায় বিজেপি প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা- এসবের উল্লেখ ছিল সেই রিপোর্টে। এবার শা’র কলকাতায় ঘাঁটি গেড়ে পড়ে থাকার পরিকল্পনা। তাই এমন একটি বাড়ির খোঁজ চলছে, যার ছাদ হেলিপ্যাড হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এতদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কলকাতায় এলে নিউটাউনের একটি হোটেলের বত্রিশতলায় থাকতেন।
কিন্তু বঙ্গ বিজেপি কি নির্বাচনের জন্য পুরোপুরি তৈরি? সদ্যসমাপ্ত বিধানসভার বিশেষ অধিবেশনে বিরোধী দল হিসেবে বিজেপির পারফরমেন্স তুলনায় ভালো ছিল। কিন্তু এত বড় রাজ্যে প্রধান বিরোধী দলের যে ভূমিকা থাকার কথা, তা অদৃশ্য। শমীক ভট্টাচার্য রাজ্য সভাপতি হওয়ার পর আশা করা হচ্ছিল, এবার হয়তো বাংলার নেতারা ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে নামবেন। কোথায় কী? শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদার, দিলীপ ঘোষ নিজের নিজের মতো করে কর্মসূচি স্থির করেন।
দিলীপ ঘোষের আবার অন্য সমস্যা। কোনও অনুষ্ঠানেই আমন্ত্রণ পান না প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি। সেই সময়গুলো কাটানো তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। কখনও দলের কাজ দেখিয়ে দিল্লি ছুটতে হয় আবার কখনও দ্বারস্থ হতে হয় ধর্মগুরু রবিশঙ্করের। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারকে ঘিরে অন্য বিতর্ক। সম্প্রতি একটি মঞ্চে তিনি ভাষণ দিচ্ছিলেন, যেখানে তাঁর পায়ের কাছে রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্কিমচন্দ্রের ছবি ছিল। বিজেপি নেতারা বাংলার মনীষীদের অসম্মান করেন বলে অভিযোগ এনেছে তৃণমূল। আবার শমীককে রাজ্য সভাপতি হিসেবে ততটা সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে না। আসলে শমীক নিজে একরকম মানুষ, দলে তাঁর সঙ্গীসাথিরা আরেকরকম। খাতায়-কলমে রাজ্য সভাপতি হলেও খুব কিছু করার উপায় শমীকের নেই। একুশের বিধানসভায় বিজেপি জিতেছিল ৭৭ আসন। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, তৃণমূলকে হটানো অনেক পরের কথা, এবারে পদ্ম শিবিরের আসন গতবারের থেকেও কমে যাবে। নেতাদের কাণ্ডকারখানা দেখে বিজেপির সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও এখন এই আশঙ্কা ছড়াচ্ছে। সেই আশঙ্কা তাঁদের মনোবল ভেঙে দিলে গোটা দলের পক্ষে সমস্যার।
