রূপায়ণ ভট্টাচার্য
নববর্ষের দিন। ওপার বাংলার কুষ্টিয়ার কুমারখালী। এক শোভাযাত্রায় একজন একজন এক এক মনীষী সেজেছিলেন। এভাবে ৩৮ জন আলাদা ভ্যানরিকশায় বসে একসঙ্গে পথ পরিক্রমায়। পিছনে অসংখ্য মানুষ।
রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বাঘা যতীন, লালন ফকির, ক্ষুদিরাম, কাঙাল হরিনাথ, মীর মোশারফ, আকবর…। এমনকি নীল বিদ্রোহের অসামান্য নেত্রী প্যারীসুন্দরী সিংহও সেজে একজন।
ছবিগুলো দেখে আশ্বস্ত হওয়া গেল। যাক, এখনও এসব অসামান্য দৃশ্য তৈরি হয়। সব্বার মাথা উচ্ছন্নে যায়নি তাহলে! চন্দ্র-সূর্য উঠছে!
এমনিতে পদ্মাপার ও গঙ্গাপার এক হতে চলেছে অন্য দিক দিয়ে। স্বর্গের রাজপথে নয়, জাহান্নামের ভাঙাপথে। নেতা থেকে জনতা– বেকারত্ব, দুর্নীতি, অশিক্ষা– কারও আর মাথাব্যথা নেই যেন। শুধু ধর্ম, ধর্ম আর ধর্ম। এটাই সবচেয়ে বড় অধর্ম। দুই বাংলার লজ্জা হল, এখানে ধর্ম এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, ক্রমে পিছনে পড়ে
থাকছে রোটি-কাপড়া অউর মকান, উন্নয়ন, নীতি, আদর্শ, শিক্ষা, ক্ষুধা, শিল্প, আধুনিকতা, বিজ্ঞানমুখিতা।
এটা ধর্মযুদ্ধ নয়। এটা অমানুষ হওয়ার যুদ্ধ। অমানুষ হয়ে ধর্মকে বাঁচানো যায়?
ওই বাংলায় এখন এমন দুর্দশা, এক কবি স্বাধীনতা দিবস বাতিল করার প্রতিবাদে সোচ্চার হলে তাঁকে অকথ্য মার
খেতে হয় প্রকাশ্যে। শেষপর্যন্ত মারাই যান হতভাগ্য সৌমিত্র দেব। প্রশাসন চুপ।
ওই বাংলার এখন এমন দুর্দশা, বিশিষ্ট কবি রফিক আজাদের বাড়ি বুলডোজার ভেঙে দেয়। ঋত্বিক ঘটকের বাড়ি যেমন মানুষই ভাঙে মাসকয়েক আগে।
ওই বাংলার এখন এমন দুর্দশা, ইসলামি মৌলবাদীদের দাপটে অধিকাংশ শহর-গ্রামে সন্ত্রস্ত হিন্দুরা। বহু ধর্মনিরপেক্ষ মুসলিমও গৃহহারা।
ওই বাংলায় এখন এমন দুর্দশা, পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানেও হিন্দু-মুসলিম যুদ্ধ লাগানোর চেষ্টা হয়। নাম পালটে যায় মঙ্গল শোভাযাত্রার।
এটা ধর্মযুদ্ধ নয়। এটা অমানুষ হওয়ার যুদ্ধ। অমানুষ হয়ে কোনও ধর্মকে বাঁচানো যায়?
আমরা তো এই বাংলায় বসেও ওই বাংলার মতো হয়ে উঠছি কোথাও কোথাও।
এই বাংলার এখন এমন দুর্গতি, কাউকে বারবার বলে প্রমাণ দিতে হচ্ছে, আমি সব ধর্মকেই শ্রদ্ধা করি।
এই বাংলার এখন এমন দুর্গতি, কেউ কেউ বিশেষ ধর্মকে প্রকাশ্যে গালাগাল দিয়ে উত্তেজনা তৈরির শিরোমণি হয়েই অনেকের কাছে নায়ক।
এই বাংলার এখন এমন দুর্গতি, নিজের ধর্মের লোকদের ভয়ংকর অপরাধ করতে দেখেও সেই ধর্মের বিশিষ্টরা চুপ।
এই বাংলার এখন এমন দুর্গতি, দুই ধর্মের মৌলবাদীদের কড়া নিন্দা করার লোক কমে আসছে ক্রমে।
চার পার্টির প্রধান নেতাও দিশেহারা।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়- একদিন কালীঘাটের স্কাই ওয়াক উদ্বোধন করছেন। পরদিনই ইমাম-মোয়াজ্জিনদের সম্মেলনে। তারপরেই জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধনকে মেগা ইভেন্ট করার চেষ্টায়।
শুভেন্দু অধিকারী– দিনের পর দিন মুসলিমদের সুতীব্র ব্যঙ্গ করেই চলেছেন। এছাড়া কোনও কাজ নেই। আপনি আমি হলে কবে গ্রেপ্তার হয়ে যেতাম।
মহম্মদ সেলিম– কী করবেন, বুঝে পান না। ফেসবুক ছাড়া পার্টির সমর্থকদের এখনও সাংগঠনিক অস্তিত্ব নেই দেখে।
অধীর চৌধুরী– মমতাকে গালাগাল করা ছাড়া আজও কোনও কাজ খুঁজে পাননি। তাঁর বদলি শুভঙ্কর সরকারের সেই কাজটাও নেই।
অন্য নেতারাও বিভ্রান্ত। কী করবেন জানেন না।
একজন হিন্দু নেতা নেই, যিনি হিন্দুদের অকাজ কুকাজের কড়া সমালোচনা করে শুধু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে সওয়াল চালাচ্ছেন। এখন নাকি সেটা সম্ভব নয়।
একজন মুসলিম নেতা নেই, যিনি মুসলিমদের অকাজ কুকাজের কড়া সমালোচনা করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে সওয়াল চালাচ্ছেন। এখন নাকি সেটা সম্ভব নয়।
জনতা?
বাংলাদেশে বহু মানুষ মৌলবাদী হয়ে গিয়েছে। তাদের সমালোচনায় নেমে অন্য দল নিজেদের অজান্তেই হয়ে উঠেছে মৌলবাদী। এই বাংলাতেও তাই। ৩৪ বছর ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সফল সিপিএমের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা, তাদের বহু সমর্থক হাতে চে গেভারার উল্কি পাঞ্জাবিতে ঢেকে পরম রামভক্ত হয়ে চ্যাঁচাচ্ছেন, জয় শ্রীরাম। মানে অতি সহজ। এঁরা মোটেই অসাম্প্রদায়িকতা ও মার্কসবাদ রক্তকণিকায় ঢোকাতে পারেননি। সব রক্তবিন্দুতে ছিল সুবিধেবাদ।
বাংলার একদিকে ছড়িয়ে পড়েছে আরএসএসের গুরুদের গোপন ক্লাস। কলকাতা থেকে গ্রাম। সেখানে কোন ধর্মকে কী কটাক্ষ চলে, পাঠক জানেনই, বলার দরকার নেই। বিজেপির হয়ে ভোট করবে ওরাই। বলা যায় না, জিতলে মুখ্যমন্ত্রী হয়তো অচেনা মুখ।
ওদিকে, বিশেষত উত্তরবঙ্গের অনেক গ্রামগঞ্জে বাড়ছে গোপন বেসরকারি মাদ্রাসা। গ্রামীণ লোকে বলে খারিজি মাদ্রাসা। সেখানে আনা হচ্ছে অন্য জেলার কিশোরদের। বলা হয়, এরা এতিম। মানে অনাথ। যাদের স্থানীয়রাই চেনে না। মোথাবাড়ি গিয়ে শুনেছিলাম, প্রচুর কমবয়সি ছেলে সেখানে হাঙ্গামায় ছিল আক্রমণকারীর ভূমিকায়। মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগত, সংঘর্ষে এত কিশোর-তরুণ আসে কী করে বাংলাদেশের মতো? উত্তর পেয়ে যাই।
এই গুরু ও ছাত্রর দল যে বিহার বা উত্তরপ্রদেশ থেকে খারিজিতে আসছে না, এমন গ্যারান্টি নেই। গ্রামে কোথাও এদের এক একদিন এক এক বাড়িতে খাওয়ার ব্যবস্থা হয়। মাঝেমাঝেই ধর্মীয় জালসা বসে অমুক মাদ্রাসার উন্নতিতে। সংখ্যাটা বাড়ছে ইদানীং। যেমন প্রচুর বেড়েছে গ্রামগঞ্জে কীর্তনের আসর। মন্দির ঝকঝকে হবে। মসজিদও ঝকঝকে হবে না কেন তা হলে?
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সেই কবে, ২৩ বছর আগে, ২০০২ সালে বলেছিলেন, ‘বাংলায় প্রচুর বেআইনি মাদ্রাসা চলছে। সেখানে দেশবিরোধী কাজ হয় কি না দেখা দরকার।’ তারপর কিছুই করতে পারেননি। পলিটব্যুরো এবং বামফ্রন্ট দুটো সভা ডেকে তাঁকে চুপ করিয়ে দেয়। বিমান বসু তো এখনও আছেন। তিনিই বলেছিলেন, ‘বুদ্ধবাবু আমাদের বলেছেন, অধিকাংশ মিডিয়া আমাকে মিসকোট করেছে।’ এত বছর ধরে বাম ও তৃণমূল প্রশাসনের গোয়েন্দারা করলেন কী? তাঁরা বের করতে পারেননি মন্দির-মসজিদের এত রমরমার রহস্য।
উত্তরবঙ্গ থেকে নিশীথ প্রামাণিক, সুকান্ত মজুমদার, দেবশ্রী চৌধুরীরা তো অনেকদিন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রইলেন। রাজ্যের উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রীর তালিকায় নাম দেখবেন গৌতম দেব, রবীন্দ্রনাথ ঘোষ, উদয়ন গুহ, সাবিনা ইয়াসমিনের। ছিলেন বা আছেন। দুই পক্ষের এঁরাই বা এতদিন কী করলেন এলাকায় ধর্মীয় আগ্রাসন রুখতে?
আসলে পদ্মাপারের মতো গঙ্গাপারের পার্টিগুলো একচক্ষু হয়ে উঠছে সব। একদিক দেখছে শুধু। শুধু নিজেদের লাইনে কথা বলতে ব্যস্ত। দুই ধর্মীয় পক্ষকে সমান সুরে তুলোধোনা করতে ব্যর্থ। তৃণমূল, বিজেপি, সিপিএম ও কংগ্রেসের বড় মেজো সেজো ছোট সিকি আধা নেতারা বুঝতে পারছেন না, বিধানসভা ভোটে নিজেদের ক্ষণিক লাভের জন্য কত বড় ক্ষতি করছেন রাজ্যটার। ক্ষতি এবং সর্বনাশ। সব দল সমান দায়ী।
এটা ধর্মযুদ্ধ নয়। এটা অমানুষ হওয়ার যুদ্ধ। অমানুষ হয়ে নিজের ধর্মকে বাঁচানো যায়?
যায় না।
