এই ধ্বংস উপত্যকাই আমার দেশ

এই ধ্বংস উপত্যকাই আমার দেশ

শিক্ষা
Spread the love


 

  • শুভময় সরকার

কে যেন সেই বলেছিলেন, ‘দুর্যোগের স্মৃতি ম্লান হয়ে যায়, তাই দুর্যোগের প্রস্তুতি কঠিন হয়।’ শারদোৎসবের রঙিন দিনগুলো পেরোতে না পেরোতেই স্মৃতি উসকে দিল দু’বছর আগের এক দশমীর সন্ধে-রাত। স্মৃতিযাপনের প্রসঙ্গ এলেই আমরা অনিবার্যভাবে আবেগের সেই চিরন্তন উচ্চারণে চলে যাই– ‘স্মৃতি সততই সুখের’…! তবে প্রশ্নটা এখানেই, আদৌ কি স্মৃতি সর্বদাই বড় সুখের। এই উত্তরেই মালবাজারে প্রতিমা নিরঞ্জনের সেই ভয়াবহ স্মৃতি কি সুখের? আর দশটা ঘটনার মতো সে ঘটনাও তো আমাদের বিস্মৃতিপ্রবণ মন থেকে আস্তে আস্তে ‘ডিলিট’ হয়ে যাচ্ছিল। সোশ্যাল মিডিয়া ইমোজির সুনামিতে ভেসে গিয়েছিল সেদিন। স্মৃতির হ্যাংওভারও রইল কিছুদিন। কিন্তু চাক্কা জ্যাম হয়ে যাচ্ছিল মুঠোফোনের, সুতরাং চালাও পানসি বেলঘরিয়া, পুরোনো জঞ্জাল ধুয়েমুছে সাফ, ‘অল ডিলিটেড’…! হ্যাঁ, আমাদের এই ডিজিটাল ছায়াযাপনে কায়াহীনতাই বড় সমস্যা। শরীরী নয়, সবই ভার্চুয়াল। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় থিতু হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। আপাতত ‘শান্তি কল্যাণ’ হয়ে থাকছে সব।  ফলত যা হবার সেটাই হচ্ছে অনিবার্যভাবে।

উৎসবের দিনগুলো পেরোতে না পেরোতেই এই উত্তর-পশ্চিমবঙ্গে ভ্রূকুটির ছায়া। প্রকৃতির রোষানলে বিস্তীর্ণ অঞ্চল। নিউজ চ্যানেল, সোশ্যাল মিডিয়াজুড়ে উন্মত্ত বয়ে যাওয়া তিস্তা, তোর্ষা, জলঢাকা, বালাসনের গর্জন। ভেসে যাচ্ছে মানুষ, বাড়ি, বন্যপ্রাণী। নানাবিধ প্রতিক্রিয়ার ঝড় উঠেছে নেটিজেন পাড়ায়। আসন্ন ভোটের প্রাক্কালে খুব স্বাভাবিকভাবেই চলছে দোষারোপের পালা। ভয়ে, আশঙ্কায় শিউরে উঠছি পাহাড়ি ধসের ছবি আর হরপা দেখে। আমার শহরে যে মহানন্দার জলে হাঁটু অবধি ডোবে না, সেখানেও উন্মত্ত জলধারা।  ‘ইফ উইন্টার কামস, ক্যান স্প্রিং বি ফার বিহাইন্ড’…! নেভার।  সুতরাং এরপর আসবে রিলিফের ঢেউ আর বিস্তর প্রতিশ্রুতি। অসুবিধে নেই, দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোটাই দস্তুর- সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল থেকে নানান ওয়েলফেয়ার সংস্থাগুলো দাঁড়াবে এবং আমার দৃঢ়বিশ্বাস মানুষই বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ায়। তবু কিছু প্রশ্ন রয়ে যাবে এবং এই প্রশ্নগুলোই জরুরি, চিরকালই জরুরি ছিল, হয়তো নানান বাধ্যবাধকতা কিংবা অন্ধত্ব থেকে প্রশ্নগুলো তোলা হয়নি। খুব কঠিন নয় প্রশ্নগুলো, তবে উত্তরে থেকেছি মৌন। নিজের ভেতরে যে কথাগুলো, যে প্রশ্নগুলো উঠে এসেছে বারবার, সেগুলোর উত্তর শুনতেই চাইনি হয়তো-বা।

উত্তরের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রসঙ্গ এলেই ১৯৬৮-এর জলপাইগুড়ির সেই ঐতিহাসিক বন্যার স্মৃতি ফিরে আসে। আমি বা আমার মতো অনেকেরই সেই ভয়াবহ রাতের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই কিংবা থাকলেও সে স্মৃতি বিবর্ণ প্রায়। তবু মিথের মতো দশকের পর দশক ধরে সেই বন্যার প্রসঙ্গ ফিরে ফিরে এসেছে। ১৯৬৮-এর ৪ অক্টোবরের সে রাত ছিল কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আগের রাত। বাঁধ ভেঙে উন্মত্ত তিস্তা ঢুকে পড়েছিল জলপাইগুড়ি শহরে। একরাতে কয়েক দশক পিছিয়ে গিয়েছিল একটা শহর, একটা ঘরোয়া বনেদি শহর। আজ অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও বনেদি শহরের আনাচে-কানাচে বিষণ্ণ হাওয়ায় ভেসে আসে হাহাকার আর কান্নার স্মৃতি। প্রশ্নগুলো কি সেদিন ওঠা উচিত ছিল না। তারপর পেরিয়ে যাওয়া অর্ধশতাব্দীর বেশি সময়ে পৃথিবী আধুনিক থেকে অতিআধুনিক এবং উত্তরাধুনিকতায় পৌঁছে গিয়েছে, কিন্তু সহজ প্রশ্নগুলো আমরা তুলতে পারিনি, এড়িয়ে গিয়েছি আর এই প্রশ্নগুলো তুলতে পারিনি বলেই আমাদের প্রস্তুতি গড়েই উঠল না। সুরক্ষার ন্যূনতম ব্যবস্থা, বিপর্যয়ের সামান্যতম প্রতিরোধ আজও গড়ে উঠল না। অভিযোগের আঙুল উঠুক, ওঠাই উচিত কিন্তু সে আঙুল যেন মাঝে মাঝে আমাদের নিজেদের দিকেও ঘোরে, কারণ আমরাও সেই একই অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছি।

নেহাতই প্রসঙ্গক্রমে সামান্য ব্যক্তিগত কথায় আসা যাক। কিছুদিন আগে একটি সুপরিচিত সাহিত্য পত্রিকা তাদের নদী সংখ্যায় আমায় লেখার আমন্ত্রণ জানায়। যেহেতু নদী আমার এক গভীর আবেগের পরিসর, স্বাভাবিকভাবেই এক কথায় সম্মত হই। আমি লিখেছিলাম দুই যমজ নদী নিয়ে– লিস এবং ঘিস। ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস সদ্য ছেড়ে নতুন চাকরিতে ঢুকেছি। গায়ে ক্যাম্পাসের আউল-বাউল জীবনের গন্ধ তখনও যায়নি। শহর শিলিগুড়ির বিধান মার্কেটের সেই পুরোনো ডুয়ার্স বাসস্ট্যান্ড থেকে ব্লু-মাউন্টেন নামের এক নীল রঙের বাসে করে আমরা নিত্যযাত্রীরা সেবক পেরিয়ে প্রতিদিন ঢুকে পড়ি ডুয়ার্সের গভীর সবুজে। প্রাত্যহিক সেই চলার পথে সেবকের তিস্তা, তারপর একে একে লিস, ঘিস, মাল, জলঢাকা নদীগুলো পেরিয়ে যাই। সে এক নদীমাতৃক যাত্রাপথ। গল্পে মেতে ওঠা সেই বাসযাত্রার মাঝেই আমার দৃষ্টিতে কিন্তু এড়াত না পাহাড়ি নদীগুলোর শরীরজুড়ে ক্ষতচিহ্ন। দিনভর অগুন্তি ট্রাকের সারি, রিভারবেড চেঁছে তুলে নেওয়া হচ্ছে বালি-পাথর। মনে আছে, বালাসন নদীতে এরকমই এক দৃশ্য দেখতে দেখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রিয় স্যর তিন দশক আগে বলেছিলেন– ‘ফল ভুগতে হবে আগামীদিনে’। স্বল্পবাক সেই মানুষটি আজ নেই কিন্তু সময় যত এগোচ্ছে, অনুভব করছি তাঁর কথাগুলো।

সাম্প্রতিক অতীতে আমি এবং আমার মতো অসংখ্য সাধারণ মানুষ, যারা বিশেষজ্ঞ নই, তথ্য এবং তত্ত্বে তেমন সড়োগড়ো নই, তাদের চোখেও কিন্তু প্রকৃতির এই প্রতিনিয়ত আগ্রাসী হয়ে ওঠার প্রবণতা এড়াচ্ছে  না। অতীতে বিপর্যয় ঘটেনি এমনটা নয়। কিন্তু এত ধ্বংসলীলা চোখে পড়েনি। মেনে নিচ্ছি হয়তো সংবাদমাধ্যম এতটা সক্রিয় ছিল না, সোশ্যাল মিডিয়ার আবির্ভাব হয়নি কিন্তু বিপর্যয়ের খবর যে পাওয়া যেত না, তেমনটা তো নয়। আসলে এবার ভাবার সময় হয়েছে। আসমুদ্র হিমাচল, এই উপমহাদেশ, হয়তো-বা সারা বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য নামক আপাতনিরীহ শব্দের আড়ালে সর্বনাশের যে ডিজে বাজছে, সেই শব্দই হয়তো-বা ঘেঁটে দিচ্ছে আমাদের চিন্তাশক্তি, সচেতনতা। ‘ইকো ট্যুরিজম’-এর নামে যথেচ্ছাচার চলছে। পর্যটন তো থাকতেই হবে, সত্যিকারের ‘ইকো ট্যুরিজম’ ভীষণ জরুরি। প্রশাসনকেও কঠোর হতে হবে কিন্তু আঙুল কি নিজেদের দিকেও উঠবে না…!  বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গলে সাহু নদীর পাশ ধরে হাঁটতে হাঁটতে কিংবা জল শুকিয়ে গেলে তিস্তার চরে পিকনিকে উদ্দাম নৃত্য করতে করতে একটিবারও কি মনে হবে না– এই যে বিস্তর প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ, বোতল, থার্মোকলগুলো ছড়িয়েছিটিয়ে, সেগুলো বর্জ্যের জন্য নির্দিষ্ট করা জায়গায় ফেলি কিংবা এগুলোর ব্যবহার বন্ধ করি…! হবে না মনে আমাদের? দশকের পর দশক ধরে নদীর গতিপথ রোধ করা, ডাইভারশন করা, বর্জ্য ফেলা, অরণ্য ধ্বংস করা, যত্রতত্র বেআইনি হোমস্টে বানানো, ‘বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী’-র নামে জমি দখল, নদী দখল, জঙ্গল দখল নিয়ে কথা বলব না আমরা…!  নাকি বোবাকালা হয়েই থাকব?  আসুন আমাদের অসহায় অশক্ত দুটি হাত শূন্যে তুলে চিৎকার করে বলি কবীর সুমনের সেই বিখ্যাত গানের কলি দুটো— ‘মাঝ রাত্তিরে, চাঁদের কাস্তে, ধারালো হচ্ছে, আস্তে আস্তে, আস্তে আস্তে’…! প্রকৃতি কিন্তু বদলা নেওয়া শুরু করেছে। সাধু, সাবধান। শেষের সেদিন ভয়ংকর।

(লেখক সাহিত্যিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *