উত্তরবঙ্গে তৈরি হবে চল্লিশ কোটির রোজগার

উত্তরবঙ্গে তৈরি হবে চল্লিশ কোটির রোজগার

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


 

  • অঞ্জন চক্রবর্তী

হাতির পিঠে চড়ে সপরিবারে মা দুর্গা কৈলাস থেকে মর্ত্যে এসেছেন। পৌরাণিক গাথা বলে, মা গজে আসছেন মানে কৃষি ও ফলনের জন্য সুখবার্তা। অর্থাৎ পৌরাণিক তত্ত্ব মানলে এবারে মায়ের যাত্রা-বাহন শুভ বার্তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থনীতির তত্ত্ব ও তথ্যের নিরিখে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলির জন্য সেই বার্তা কতটা শুভ তার একটা বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

সামগ্রিকভাবে দুর্গাপুজো এবং উৎসব ঘিরে একটি অর্থনীতি আবর্তিত হয় তা আমাদের অনেকটাই জানা ও বোঝা। বিভিন্ন সংগঠিত এবং অসংগঠিত পেশার মানুষের জীবন জীবিকা অনেকটাই আবর্তিত হয় পুজো এবং উৎসবকে ঘিরে, যা সারাবছরের আর্থিক রুপোলি রেখা তৈরি করে। ফলে একটা শ্রেণির কাছে দুর্গাপুজো যদি হয় দশভুজার আরাধনা, উৎসবমুখর জীবনের একটি দিন তাহলে এক অংশের কাছে পুজো মানে বাড়তি সুযোগ, বড় সুযোগ, দিন-রাত্রি এক করে সারাবছরের একটু স্বস্তি খুঁজে নেওয়ার সবচেয়ে বড় সুযোগ।

রাজ্য সরকারের পুজো বোনাস ও পুজো অ্যাডভান্স, চা বাগানের কর্মী সহ সমস্ত সরকারি ও সরকার পোষিত প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক এবং অস্থায়ী কর্মীদের বোনাস প্রাকপুজোয় বাড়তি অর্থনৈতিক অক্সিজেন। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী স্থায়ী এবং অস্থায়ী কর্মী যাঁদের বেতন মাসিক ৪৪০০০ টাকা অবধি, তারা ৬৮০০ টাকা করে পুজো বোনাস পাবেন, সুদহীন পুজো অ্যাডভ্যান্স ১০,০০০ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকা যা কিস্তিতে বেতনের থেকে কেটে নেওয়া হবে। সমগোত্রীয় পেনশনভোগীরা ৩৫০০ টাকা করে পুজো বোনাস পাবেন।

পুজো বোনাসের একটি বৈশিষ্ট্য হল যে, উৎপাদন ভিত্তিক মুনাফার বোনাস থেকে এটি ভিন্ন। এটি এককালীন রোজগার-ব্যয়-সঞ্চয়-নতুন আয়, এই চক্রটিকে সরাসরি বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ আমার চাহিদা এককালীন বাড়ে পুজো-উৎসবকে কেন্দ্র করে, যা অনেকটা সহজ হয়ে যায় এই পুজো বোনাসের এবং অ্যাডভান্সের জন্য।  ক্রয়ক্ষমতার এককালীন বৃদ্ধি, বিশেষত নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত সরকারি এবং আধাসরকারি কর্মীবর্গের জন্য সুখকর। আর চা বাগানে কুড়ি শতাংশ বোনাসের ঘোষণা চা বাগানকেন্দ্রিক ডুয়ার্স-তরাই ও খেটেখাওয়া আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য সামগ্রিক স্বস্তি ও আর্থিক মন্দার ক্ষণিক ছেদ।

আনুমানিক হিসেব বলছে, উত্তরের জেলাগুলিতে বাড়তি প্রায় ১৫০০ কোটি টাকার জোগান বাড়াবে এই পুজো বোনাস। এবং মোটামুটি একটি সহজ অর্থনৈতিক অঙ্ক কষলে এই ১৫০০ কোটি টাকা কতটা বাড়তি রোজগার তৈরি করবে তার একটি হিসেব করা যেতে পারে। ধরে নিই, ভারতবর্ষের সাপেক্ষে (রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার তত্ত্ব ও তথ্যের ভিত্তিতে) প্রান্তিক ভোগ প্রবণতা ০.৬। এর মানে, আমার যদি এক টাকা আয় বাড়ে, তাহলে তার ৬০ পয়সা আমি ভোগ্যপণ্যের জন্য ব্যয় করব। তাহলে রোজগার গুণকের হার দাঁড়াবে ২.৫ শতাংশ। অর্থাৎ ১৫০০ কোটি টাকার বাড়তি রোজগার ন্যূনতম বাড়তি চল্লিশ কোটি  টাকার নতুন রোজগার তৈরি করবে। কারণ, একজনের ব্যয় আরও অনেকের আয়ের উৎস। আবার তাদের নতুন আয় আবার নতুন ব্যয়ের পথ খুলবে। এভাবে গোলকটি অর্থনীতিতে কাজ করে। অর্থাৎ দুর্গোৎসবকে ঘিরে অানুমানিক ৪০ কোটি টাকা উত্তরের বিভিন্ন জেলায় মূলধন হিসাবে নতুন ব্যবসার জন্ম দেবে। তাহলে মায়ের গজে আগমনবার্তার সঙ্গে ব্যবসার হাত ধরে সুখের ইঙ্গিত কিছুটা হলেও মিলে যাচ্ছে।

উত্তরবঙ্গের জেলাগুলি দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলি থেকে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া, এ তত্ত্ব দীর্ঘদিনের এবং তা নিয়ে রাজনৈতিক তর্জাও ঘুরেফিরে আসে। এর বাইরে গিয়ে যদি দেখা যায়- তাহলে পশ্চিমবঙ্গের গড় মাথাপিছু রোজগারের হার বার্ষিক ৬ শতাংশ। এই রোজগার নির্ণয়ের কৌশলের একটা সীমাবদ্ধতাও আছে। কারণ এতে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের খুব একটা হদিস পাওয়া যায় না। কারণ গড় আয়ে ধনী ও গরিবের আয় যোগ ও ভাগে বৈষম্য বা রোজগারের ফারাকটিকে তরলীভূত করে দেয়। তবু কিছুটা আলোচনা এই মাথাপিছু গড় আয়ের সূচক নিয়ে করা যেতেই পারে।

পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু গড় আয়ের সাপেক্ষে উত্তরের জেলাগুলি কি অস্থায়ী আছে? দার্জিলিং জেলার ক্ষেত্রে (পাহাড় ও সমতল) এই বৃদ্ধির হার পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতা থেকে বেশি। বার্ষিক ৭ শতাংশ। কলকাতার ক্ষেত্রে সেই হার ৬.৬ শতাংশ।  উত্তরের বাকি জেলাগুলির ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার পর্যায়ক্রমে কোচবিহার, দক্ষিণ দিনাজপুর ও মালদার ক্ষেত্রে ৪.৯ শতাংশ, যা পশ্চিমবঙ্গের গড়ের থেকে অনেকটাই কম। উত্তর দিনাজপুর এবং জলপাইগুড়ি (অবিভক্ত) জেলার ক্ষেত্রে এই হারটি যথাক্রমে ৫.৩ শতাংশ এবং ৫.৪ শতাংশ অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের গড়ের থেকে কিছুটা কম। তাহলে যদি ধরে নিই কোচবিহার, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদার ক্ষেত্রে নিম্নবিত্ত বা উচ্চবিত্তের আয়ের পরিমাণ অনেকটা কম, তাহলে পুজো বোনাস এবং অ্যাডভান্স এই জেলাগুলির ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর হবে। কারণ তত্ত্ব বলে, রোজগার যত কম তার আয়ের বেশিরভাগটাই ভোগের জন্য ব্যয়ে খরচ হয়। সেখানে খাদ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ও স্বাস্থ্যের পেছনে আয়ের প্রায় পুরোটাই খরচ হয়ে যায়। অর্থাৎ দার্জিলিং ও মালদার মধ্যে আর্থিক বৈষম্যে কিছুটা হলেও লাগাম টানবে পুজো বোনাস ও অ্যাডভান্স। কোচবিহার এবং জলপাইগুড়ির ক্ষেত্রেও একই তত্ত্ব কাজ করবে।

মা দুর্গার গজে আগমন যদি পুজো বোনাস হয় তাহলে বলতেই হয় কেন্দ্রীয় সরকারের জিএসটি হারের ব্যাপক রদবদল সুখের ইঙ্গিতবাহী। যদিও এটা বলে নেওয়া দরকার যে, জিএসটির হার ১৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে আনা একটি অতি বিলম্বিত পদক্ষেপ। কারণ ভারতবর্ষে জিএসটির হার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জিএসটির গড় হার থেকে বহু বেশি ছিল। কোভিড পরবর্তী অর্থনীতিতে যখন চূড়ান্ত রোজগারহীনতা এবং চাহিদা হ্রাসের সঙ্গে উৎপাদন হার মারাত্মকভাবে পড়ে গিয়েছিল সেই সময়ই চাহিদাকে বাড়ানোর জন্য জিএসটি কমানো যথার্থ পদক্ষেপ হত।

জিএসটি কমে যাওয়া ভারতের নিম্নবিত্ত ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের প্রায় ৮০ শতাংশর বেশি মানুষকে দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধির এবং হাড়ভাঙা রোজগার জীবনধারণের যন্ত্রণা থেকে অনেকটা রেহাই দেবে। আবার আঞ্চলিক অর্থনীতি থেকে জাতীয় অর্থনীতিতে দেশীয় বিনিয়োগ বাড়াতে সাহায্য করবে এবং যার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাব উত্তরের জেলাগুলিতেও পড়বে। পুজোর মুখে জিএসটির হার কমানো উৎসব অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।

উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং পাহাড় বা তরাই, ডুয়ার্সে যেখানে পর্যটন ও পর্যটন অর্থনীতির একটা বড় ভূমিকা আছে সেখানে হোটেলের থাকার খরচে জিএসটি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা অবশ্যই স্থানীয় উৎসব অর্থনীতিতে আশার আলো জোগাবে।

ফলে অর্থনীতির নিরিখে রাজ্যের বোনাস এবং কেন্দ্রের জিএসটি দুটি প্রাকপুজো ঘোষণা উত্তরবঙ্গের পাহাড় থেকে সমতল, চা বাগান থেকে ‘দিন আনি দিন খাই’-এর মানুষদের জন্য অনেকটা নবপত্রের অশোক পাতা যা দুঃখমোচনের আশ্বাস দেয়।

(লেখক- অর্থনীতির অধ্যাপক এবং ডিরেক্টর, ইউজিসি মালব্য মিশন টিচার্স ট্রেনিং সেন্টার, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *