‘উজ্জ্বলা যোজনা’ এখন অনুজ্জ্বল! কেবল আর্থিক নয়, বাড়ছে স্বাস্থ্য সংকটও

‘উজ্জ্বলা যোজনা’ এখন অনুজ্জ্বল! কেবল আর্থিক নয়, বাড়ছে স্বাস্থ্য সংকটও

বৈশিষ্ট্যযুক্ত/FEATURED
Spread the love


২০২০ সালে যে রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ছিল ৭০০ টাকার কাছাকাছি, তা এখন বিভিন্ন সময়ে হাজার টাকা, বা তারও বেশি। ‘উজ্জ্বলা যোজনা’-র সুবিধাভোগীরা কাগজে-কলমে গ্যাস সংযোগ পেলেও বাস্তবে সিলিন্ডার রিফিল করার ক্ষমতা অনেকেরই নেই। একজন দিনমজুরের স্ত্রী, যঁার সংসারে মাসিক আয় পঁাচ থেকে সাত হাজার টাকা, তঁার কাছে একটি সিলিন্ডারের দাম মানে পরিবারের বেশ কয়েক দিনের খাবারের বাজেট। গোদের উপর বিষফেঁাড়া: যুদ্ধ! লিখছেন পার্থ দেবনাথ।

বিশ্বের কোনও একপ্রান্তে যখন কামান গর্জে ওঠে, তখন তার প্রতিধ্বনি শুধু রণক্ষেত্রেই থামে না– সেই শব্দের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে উত্তরপাড়ার ছোট্ট ফ্ল্যাটে, মেদিনীপুরের মাটির বাড়িতে, বর্ধমানের গ্রামীণ রান্নাঘরে। যুদ্ধ একটি ভৌগোলিক ঘটনা নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক ঝড়– আর সেই ঝড়ের সবচেয়ে মুখ্য নিষ্ঠুর শিকার ভারতের কোটি কোটি গৃহিণী, যঁারা প্রতিদিন একটি সিলিন্ডারের ভরসায় সংসারের চুলা জ্বালান।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে-অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা এখনও কাটেনি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচলে বাধা, এবং পরিবহণ ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি মিলিয়ে তৈরি হয়েছে দুষ্টচক্র। এলপিজি সিলিন্ডারের আন্তর্জাতিক মূল্য নির্ধারিত হয় সৌদি আরামকোর ‘কনট্র্যাক্ট প্রাইস’ বা ‘সি পি রেট’-এর উপর ভিত্তি করে। সেই রেট যখন আন্তর্জাতিক উত্তেজনার কারণে বাড়ে, তখন ভারতের তেল কোম্পানিসমবহের খরচও বাড়ে। আর সেই বাড়তি বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করেন আমাদের গ্রামের বধূ, শহরের গৃহিণী।

হিসাবে গরমিল
২০২০ সালে যে রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ছিল ৭০০ টাকার কাছাকাছি, তা এখন বিভিন্ন সময়ে হাজার টাকা বা তারও বেশি ছুঁয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের ভরতুকিতে কিছুটা স্বস্তি মিললেও সেই সুবিধা প্রত্যেকের কাছে পৌঁছয়় না। ‘উজ্জ্বলা যোজনা’-র সুবিধাভোগীরা কাগজে-কলমে গ্যাস সংযোগ পেলেও বাস্তবে সিলিন্ডার রিফিল করার ক্ষমতা তঁাদের অনেকেরই নেই। একজন দিনমজুরের স্ত্রী, যঁার সংসারে মাসিক আয় পঁাচ থেকে সাত হাজার টাকা, তঁার কাছে একটি সিলিন্ডারের দাম মানে পরিবারের বেশ কয়েক দিনের খাবারের বাজেট।

ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। গ্রামবাংলায় আবার মাথা তুলছে উনুন আর খড়ির চুলা। কেউ ফিরছেন কাঠকয়লায়, কেউ গোবরের ঘুঁটেতে। এই ‘পিছিয়ে যাওয়া’ কেবল আর্থিক নয়, এটি স্বাস্থ্যগত সংকটও। রান্নার সময় উৎপন্ন ধোঁয়া থেকে ফুসফুসের রোগ, শ্বাসকষ্ট এবং শ্বাসনালির দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা দেখা দেয়– আর এই ধোঁয়ার সামনে সবচেয়ে বেশি সময় কাটান মহিলারাই। ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’-র তথ্য বলছে, ঘরের ভিতরে বায়ুদূষণে বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৩৮ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়, যার বড় অংশ উন্নয়নশীল দেশের নারী ও শিশু।

জ্বালানি সংকট
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বের জ্বালানি বাজারে যে-ভূমিকম্প এনেছে, তা অভূতপূর্ব। রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল রপ্তানিকারক দেশ। পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়ার শক্তি সরবরাহ বিঘ্নিত হতেই ইউরোপ এলপিজি ও এলএনজি-র বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকল। মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে চাহিদা বাড়ল। আর, এই চাহিদার ধাক্কায় ভারতকে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হল। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি– ইজরায়েল-গাজা সংঘাত এবং হুথিদের লোহিত সাগরে আক্রমণ– জাহাজ পরিবহণের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। সুয়েজ খাল এড়িয়ে আফ্রিকার ‘কেপ অফ গুড হোপ’ বা উত্তমাশা অন্তরিপের পথে জাহাজ চললে সময় ও খরচ উভয়ই বৃদ্ধি পায়। এই সমগ্র শৃঙ্খলের শেষ মাথায় দঁাড়িয়ে আছেন ভারতের গ্রামীণ মহিলারা, যঁারা প্রতি মাসে মাথায় হাত দিয়ে ভাবছেন: এই মাসে সিলিন্ডার কিনব, না, ছেলের বই?

অদৃশ্য শ্রম
ভারতীয় পরিবারে গৃহিণীর ভূমিকাকে এখনও ‘অদৃশ্য অর্থনীতি’ বলে গণ্য করা হয়। মজুরি নেই, স্বীকৃতি নেই, অথচ তঁারা-ই পরিবারের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, সন্তানের শিক্ষা এবং সার্বিক সুখ-দুঃখের মূল নিয়ামক। রান্নার গ্যাস যখন ‘সাশ্রয়ী’ থাকে, তখন তঁারা সময়মতো রান্না করতে পারেন, পরিবারকে গরম খাবার দিতে পারেন। কিন্তু যখন সিলিন্ডারের দাম ছাপিয়ে যায় পরিবারের ক্ষমতা, তখন শুরু হয় নীরব লড়াই।

এই লড়াই মানে ভোরবেলা উঠে লক্‌ড়ি কুড়ানো। এই লড়াই মানে গরমের দুপুরে ধোঁয়াভরা উনুনের সামনে দঁাড়িয়ে চোখ মুছতে মুছতে রান্না করা। এই লড়াই মানে নিজের খাবার কমিয়ে ছেলেমেয়ের পাতে বেশি তুলে দেওয়া। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের ৬০ শতাংশের বেশি পরিবারে এখনও রান্নার মূল দায়িত্ব মহিলাদের। অথচ, রান্নার জ্বালানির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তঁাদের সরাসরি ভূমিকা প্রায় নেই বললেই চলে। বাজেট ঠিক করেন পুরুষ, কিন্তু কষ্ট ভোগ করেন মহিলা।

স্বাস্থ্যঝুঁকি
গ্যাস সিলিন্ডারের অপ্রাপ্যতা বা অসাধ্য মূল্যের কারণে ঘরে ফেরা কাঠখড়ির চুলার স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আমরা যথেষ্ট সচেতন নই। গবেষণা বলছে, একটি ধোঁয়াযুক্ত রান্নাঘরে রান্না করা মানে প্রতিদিন কয়েকশো সিগারেটের ধোঁয়া টানার সমতুল। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ফুসফুসে, চোখে এবং হৃদ্‌যন্ত্রে। দীর্ঘমেয়াদে ‘ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ’ (সিওপিডি) এবং ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। ভারতের গ্রামীণ মহিলাদের মধ্যে শ্বাসকষ্টের যে উচ্চহার দেখা যায়, তার নেপথ্যে এই বায়ুদূষণের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।

এছাড়া গ্যাসের অভাবে অনেক পরিবারে রান্নার সময় কমে যায়, খাবারের মান নষ্ট হয়। শিশুদের পুষ্টিতে টান পড়ে। মায়েরা নিজেরা খাওয়া বাদ দিয়ে সন্তানকে খাওয়ান। এভাবে গ্যাস সংকট একটি পুষ্টি সংকটেও রূপ নেয়, বিশেষত, সমাজের নিচুতলার পরিবারগুলিতে।

রাজনীতির ডামাডোল
নির্বাচনের আগে গ্যাসের দাম কমানো হয়, ভরতুকি ঘোষণা হয়, ‘উজ্জ্বলা যোজনা’-র সুবিধা প্রচার করা হয়। কিন্তু নির্বাচনের পর ধীরে ধীরে দাম আবার বাড়তে থাকে। এই ওঠা-নামার মাঝে ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রকৃত ব্যবহারকারী। ভরতুকি কমিয়ে ‘বাজারভিত্তিক মূল্য’ নির্ধারণের যুক্তি দেওয়া হয়, কিন্তু বাজার কখনই গরিব মানুষের কথা ভাবে না। আন্তর্জাতিক মূল্যের সঙ্গে ঘরোয়া মূল্য সংযুক্ত করার নীতি যতটা ‘বাস্তববাদী’, ততটাই নিষ্ঠুর– কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে বৃদ্ধির প্রভাব সঙ্গে সঙ্গে পড়লেও হ্রাসের সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছয় না।

সংসদে গৃহিণীদের প্রতিনিধিত্ব কম। তঁাদের সংগঠিত কোনও ইউনিয়ন নেই, ধর্মঘটের ক্ষমতা নেই। অথচ তঁারা-ই প্রতিদিন যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য পরিশোধ করছেন– শুধু চুলার সামনে দাঁড়িয়ে নয়, স্বাস্থ্য, স্বপ্ন এবং সময় দিয়ে।

বিকল্পের সম্ভাবনা
অনেকে ‘বায়ো গ্যাস’ বা ‘সোলার কুকার’-এর কথা বলেন। তাত্ত্বিকভাবে এগুলো চমৎকার বিকল্প। কিন্তু বাস্তবে বায়ো গ্যাসের পরিকাঠামো তৈরি করতে জমি ও প্রাথমিক বিনিয়োগ লাগে, যা গরিব পরিবারের নাগালের বাইরে। ‘সোলার কুকার’ মেঘলা দিনে বা সন্ধ্যায় কাজ করে না। ইন্ডাকশন কুকারের বিদ্যুৎ বিল বহন করার ক্ষমতা সবার নেই। ফলে দরিদ্র মহিলাদের জন্য ব্যবহারিক ‘বিকল্প’ এখনও সীমিত।

এক্ষেত্রে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা দরকার। গ্রামীণ এলাকায় পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস পৌঁছে দেওয়ার ‘লক্ষ্যমাত্রা’ নির্ধারিত হলেও তার বাস্তবায়ন ধীর। ‘সিটি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন’ প্রকল্পের সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত করা দরকার। একই সঙ্গে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য গ্যাস ভরতুকি কার্যকর ও প্রত্যক্ষ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

আশ্চর্য প্রদীপ
প্রথমত, গ্যাস ভরতুকির সুবিধা কেবল ‘যোগ্য পরিবার’ নির্ধারণের কাগুজে প্রক্রিয়ায় আটকে না রেখে সত্যিকারের প্রয়োজনীয় পরিবারগুলির কাছে পৌঁছনোর ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মূল্যের সরাসরি প্রভাব থেকে দেশের নিম্নবর্গের মানুষকে বিচ্ছিন্ন রাখতে একটি ‘মূল্য স্থিরীকরণ তহবিল’ গঠন করা যেতে পারে, যা যুদ্ধ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংকটের সময় ব্যবহার করা হবে। তৃতীয়ত, রান্নাঘরের বায়ু দূষণের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচার দরকার এবং সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গৃহিণীদের শ্বাসকষ্টজনিত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার সুব্যবস্থা রাখতে হবে। চতুর্থত, এলপিজি সিলিন্ডারের কালোবাজারি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, কারণ বাজারে সিলিন্ডারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বৃদ্ধি করা একটি পুরনো অসাধু কৌশল।

নীরব প্রতিবাদ
প্রতিটি বড় যুদ্ধের সময় পিছনের সারির মানুষেরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ও বাড়ির মহিলারা লুকিয়ে চঁাদা দিয়েছেন, কাপড় বুনেছেন, খাবার কমিয়েছেন। এখনও সেই ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। পার্থক্য শুধু এটুকু যে এই ‘যুদ্ধ’ ভারতের মাটিতে নয়, কিন্তু তার প্রভাব এসে পড়ছে ভারতের রান্নাঘরে।

আমরা যখন বৈশ্বিক শান্তির কথা বলি, তখন কি মনে রাখি যে, প্রতিটি বোমার মূল্য দেন পৃথিবীর কোনও না কোনও প্রান্তের একজন নারী, মা? রণক্ষেত্র থেকে হাজার মাইল দূরে একটি ছোট্ট রান্নাঘরে চুলার সামনে দঁাড়িয়ে থাকা মহিলার কষ্টটুকু কি আমাদের মানচিত্রে জায়গা পায়? কূটনীতির টেবিলে যে সমঝোতা হয়, তার হিসাব কি রাখা হয় সেই মহিলার স্বাস্থ্য, সময় ও স্বপ্নের মূল্যে?

যুদ্ধ দূরে হোক বা কাছে– তার আগুন রান্নাঘরে পৌঁছায়। সেই আগুন নেভাতে শুধু কূটনীতি নয়, দরকার একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার যা বলবে: এই দেশের প্রতিটি মহিলার রান্নাঘরে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পরিষ্কার জ্বালানি পৌঁছানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর যত দিন না সেই অঙ্গীকার পূরণ হচ্ছে, তত দিন আমাদের মনে রাখতে হবে– প্রতিটি গ্যাস সংকট একটি লিঙ্গবৈষম্যের সংকট, প্রতিটি যুদ্ধের শিখা একটি মানবিক সংকট।

(মতামত নিজস্ব)

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *