সুকল্যাণ ভট্টাচার্য্য
ইন্দো-ভুটান যৌথ নদী কমিশন গঠন সংক্রান্ত কোনও আলোচনা সাম্প্রতিক সংসদ অধিবেশনে হয়নি। বিগত ইন্দো-ভুটান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে সভাতেও আলোচনার সূত্রায়ন হয়নি।
উত্তরবঙ্গের তিন প্রাক্তন সাংসদ তারিণী রায়, জিতেন দাস ও মিনতি সেন, এই বিষয়ে সংসদে একসময় প্রশ্ন উঠিয়েছিলেন। আলিপুরদুয়ারের বিধায়ক থাকাকালীন দেবপ্রসাদ রায় এই নিয়ে প্রবলভাবে সোচ্চার হয়েছিলেন। বর্তমান আলিপুরদুয়ারের বিধায়ক সুমন কাঞ্জিলাল এই বিষয়ে বিধানসভায় ধারাবাহিকভাবে সরব। রাজ্য বিধানসভায় যৌথ নদী কমিশন গঠন সংক্রান্ত বিষয়ে প্রস্তাবও গৃহীত হয়েছে। রাজ্য থেকে একটি সর্বদলীয় প্রতিনিধিদল বিষয়টি নিয়ে দিল্লিতে গিয়ে দরবার করবে বলে জানা গেলেও এখনও পর্যন্ত ফলপ্রসূ কর্মসূচি নেই।
ভারত সরকার ভুটানের সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন সংক্রান্ত যে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করেছে এবং সেই অনুযায়ী কাজ চলছে। সেক্ষেত্রে এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্টের শর্তাবলি কতদূর মানা হয়েছে, তা নিয়েও জিজ্ঞাসা আছে।
প্রসঙ্গগুলো যাঁদের যে স্থানে তোলা উচিত, তাঁরা নির্বাক! কেন্দ্রীয় জলশক্তিমন্ত্রকের ২০২৩-’২৪ এর রিপোর্টেরও কোথাও যৌথ নদী কমিশন স্থাপন করার ইঙ্গিত পর্যন্তও নেই। এই বছর ব্রহ্মপুত্র বোর্ডের ৮৩তম সভায়ও এই প্রসঙ্গে বিন্দুমাত্র আলোচনাও হয়নি। সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটিও এখনও পর্যন্ত নির্বাক। ইন্দো-ভুটান জয়েন্ট টেকনিকাল টিমের সপ্তম বৈঠকেও (৬ অক্টোবর ২০২৩) ফলপ্রসূ কোনও সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসেনি। যা পরিস্থিতি, তাতে খুব সত্বর এই কমিশন গঠিত হচ্ছে না!
মাঝে মাঝে এই সংক্রান্ত বিষয়ে কিছু কথা সুকৌশলে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অনেকটা ‘ললিপপ’ দেখানোর মতো! এই বছরের ২৮-২৯ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে ইন্দো-ভুটান নদী বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের দশম বৈঠকেও যৌথ নদী কমিশনের কোনও প্রসঙ্গ আলোচিত হয়নি। ভুটানে একের পর এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি হচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক সহায়তায়। যৌথ নদী কমিশন তৈরি হলে পরিবেশগত বিষয়কে যেভাবে উপেক্ষা করে ওই প্রকল্পগুলো গড়ে উঠছে, তা সম্ভব হওয়া কঠিন!
১৯৮০ সালে গঠিত ব্রহ্মপুত্র বোর্ড থেকে আজ পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য মাত্র ৯১ কোটি টাকা পাওয়া গেছে! এই নিয়ে সংসদে আওয়াজ কবে উঠবে? ইন্দো-ভুটান জয়েন্ট টেকনিকাল টিমের প্রত্যক্ষ পরামর্শদানের উপর ভিত্তি করে আজ পর্যন্ত ভারত ও ভুটানের মধ্যে ৩৬ হাইড্রো মেট্রোলজিক্যাল স্টেশন বসানো গিয়েছে। পাহাড়ি নদীর অন্যতম বিশিষ্টতা ‘হড়পা’। সেই তথ্য আদানপ্রদানেরও আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি। ১৯৪৯-এর ইন্দো-ভুটান বন্ধুত্ব চুক্তি ও ১৯৫০-এর ইন্দো-নেপাল চুক্তিরও পুনর্মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি। বিষয়টি নিয়ে সব দিক থেকে ভেবেই এগোতে হবে।
ইন্দো-ভুটান যৌথ নদী কমিশন কবে বাস্তবতার মুখ দেখবে, তার কোনও ঠিক নেই! উত্তরবঙ্গের মানুষের ‘জল-যন্ত্রণা’র নিদারুণ কষ্ট কবে ঘুচবে, কেউ জানে না! ড্রেজিং আর যত্রতত্র বাঁধ দিয়ে এই সমস্যা মিটতে পারে না। এই সহজ-সরল সত্যটি যথাযথভাবে বুঝে যত তাড়াতাড়ি যৌথ নদী কমিশন গঠিত হয়, ততই মঙ্গল!
(লেখক বানারহাটের স্কুল শিক্ষক)
