চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়…। সারসত্যটি আট মাস আগে বুঝেছিলেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসককে জনরোষে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন উদাহরণ কম নেই। টাটকা নজির সিরিয়ার শাসক বাশার আল-আসাদ। গত বছরের ডিসেম্বরে বিদ্রোহী বাহিনী এগিয়ে আসতে থাকায় প্রাণভয়ে দেশ ছেড়ে যাঁকে পালাতে হয়েছিল। আরেকটু পিছিয়ে গেলে ২০২২-এ আরেক জুলাই বিপ্লবের ঠেলায় প্রাসাদ থেকে গোপনে শ্রীলঙ্কা ছেড়েছিলেন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাক্ষে।
মানুষের ক্ষোভ কতটা মারাত্মক হতে পারে, বুঝেছিলেন এই রাষ্ট্রনায়করা। শাসক যতই প্রতাপ ও প্রভাবশালী হোক, দেশবাসী বিরূপ হলে তার পরিণাম কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে- এই রাষ্ট্রপ্রধানরা তার সাক্ষী। এখন আরেক দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসক ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ বিরাট আকার নিয়েছে। অথচ আমেরিকার নাগরিকরা সাদরে, আগের চেয়ে বেশি সমর্থন দিয়ে ট্রাম্পকে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন।
সেই ঐতিহাসিক ঘটনাটি বেশি পুরোনোও নয়। মাত্র তিন মাস আগে যিনি বিরাট বিরাট প্রতিশ্রুতি দিয়ে হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্টের চেয়ারে বসেছিলেন। এর মধ্যেই জনতার একাংশের বিরাগভাজন তিনি। ওয়াশিংটন, নিউ ইয়র্ক, শিকাগো, হিউস্টন, ফ্লোরিডা, লস অ্যাঞ্জেলেস, বস্টন ইত্যাদি আমেরিকার প্রায় সমস্ত বড় শহর সেই বিরাগের উদ্গিরণ দেখল সদ্য। সংক্ষিপ্ত শাসনকালে তাঁর একাধিক পদক্ষেপ, নির্দেশ মানুষকে ক্ষিপ্ত করে তুলেছে। পরিণামে একদিনে দেশে হাজার দেড়েক প্রতিবাদী জমায়েত দেখল আমেরিকা।
এত ক্ষিপ্ত জনতা যে, ট্রাম্পকে উন্মাদ বলে গালাগাল করতেও ছাড়ছে না। ট্রাম্পের পাশাপাশি একইসঙ্গে ক্ষোভ আছড়ে পড়ছে তাঁর ঘনিষ্ঠ সঙ্গী এবং দ্বিতীয় দফার শাসনে প্রধান সহযোগী এলন মাস্কের বিরুদ্ধে। কেন এত রাগ, অসন্তোষ? সেই তালিকাটি কম বড় নয়। শিক্ষা দপ্তরের বিলুপ্তি, বয়স্কদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, একের পর এক ছাঁটাই, গর্ভপাতের অধিকার খারিজ, এলজিবিটিকিউ কমিউনিটির মর্যাদাকেই তুচ্ছ জ্ঞান ইত্যাদিতে ফুঁসছে মার্কিনিদের একাংশ।
পাশাপাশি অভিবাসীদের রাতারাতি বিতাড়ন এবং পরিশেষে অন্য দেশের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক চাপিয়ে দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তোলা আমেরিকার সাধারণ মানুষকে ক্ষিপ্ত করে তুলেছে। তারই প্রতিফলন গত সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে এত জমায়েত ও বিক্ষোভ। যাতে শামিল মার্কিনি জনতার বক্তব্যে অসন্তোষের তীব্রতা স্পষ্ট। তাদের জীবন থেকে ট্রাম্প ও মাস্কের হাত সরানোর দাবিতে একদিনে কার্যত গর্জন শোনা গিয়েছে আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্তে।
‘হ্যান্ডস অফ’ স্লোগানে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে সেই প্রতিবাদ। গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য পরিচিত আমেরিকা এক বিপরীত চিত্র দেখতে পাচ্ছে গত কয়েক মাস ধরে। যেখানে সামান্যতম প্রতিবাদকেও দেশদ্রোহিতা বলে মনে করছে শাসক। ইতিমধ্যে গাজায় লাগাতার আক্রমণের জন্য ইজরায়েলের বিরুদ্ধে মন্তব্য করায় ভালো সংখ্যক বিদেশি পড়ুয়ার ভিসা পত্রপাঠ বাতিল করে দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। যাঁদের মধ্যে ভারতীয়ও ছিলেন। ছাঁটাই নিয়ে শঙ্কা এখন গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
শুধু শীর্ষ প্রশাসনে নয়, দমকল ও বন দপ্তরের মতো জরুরি সরকারি চাকরিতেও ষথেচ্ছ কোপ ফেলছে ট্রাম্প প্রশাসন। তাছাড়া অন্য দেশের ওপর একতরফা কর চাপিয়ে যে বাণিজ্য যুদ্ধের সূচনা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, তাতে দেশে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা করছেন অনেকে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অর্থনীতি, জীবিকা ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ট্রাম্প-মাস্ক জুটির পদক্ষেপ কার্যত বিভীষিকা ডেকে আনছে আমেরিকায়।
মাত্র তিন মাসের শাসনে এত ক্ষোভ সঞ্চিত হয়েছে যে, একদিনে সমস্ত শহরে একযোগে এত প্রতিবাদ সংঘটিত হল। ট্রাম্পের দেখানো আমেরিকা ফাস্ট স্বপ্নের দ্রুত মোহভঙ্গ হচ্ছে সেদেশে। এই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে হোয়াইট হাউসের বক্তব্যে স্পষ্ট, ট্রাম্প মনে করেন না যে, তিনি কোনও ভুল করেছেন। ফলে আন্দোলন আরও ব্যাপক হওয়ার ইঙ্গিত দেখা দিচ্ছে। পরিণতিতে আমেরিকার মতো দেশ অস্থির হয়ে উঠলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
The publish অস্থিরতার পথে appeared first on Uttarbanga Sambad.
