ধর্মের চালেও যে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকা যাবে না, তা আর কেউ না বুঝুন হিমন্ত বিশ্বশর্মা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। অথচ হিন্দুত্বের কার্ডে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের পর তিনিই চ্যাম্পিয়ন। সংখ্যালঘুদের দীর্ঘকালের বসতি উচ্ছেদ, তাঁদের নানাভাবে হেনস্তা থেকে শুরু করে নানাবিধ কাজকর্ম করেছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী। শেষপর্যন্ত বিধানসভা, লোকসভা কেন্দ্রের ডিলিমিটেশন এমনভাবে হয়েছে যে, সংখ্যালঘু ভোট ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে।
তবুও হিমন্ত বিশ্বাস করেন, এই কার্ডে অসমে বিজেপির ক্ষমতা আর বড়জোর এক দশক। অর্থাৎ আরও দুটি বিধানসভার মেয়াদ পর্যন্ত। ততদিনে অসমের জনবিন্যাস এমনভাবে পালটাবে যাতে ধর্মের রাজনীতি থাকলেও তা ধুয়ে বিজেপির জল খাওয়ার দিন শেষ হয়ে যাবে। ঐতিহাসিক বাস্তবতা থাকলেও সংখ্যালঘুদের অসমের ভূমিপুত্র না মানার ভাষ্য তৈরি হচ্ছে অসমে। সেই ভাষ্য তৈরি হচ্ছে হিন্দুত্বের পোস্টার বয় হিমন্তের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে।
অসমের ভূমিপুত্র আদতে কারা- তা নিয়ে বিবাদ ও বিতর্কের শেষ নেই। জমির অধিকার, চাকরিতে সংরক্ষণ ইত্যাদি নিয়ে প্রায় সবসময়ই অশান্ত হয় অসম। ভূমিপুত্রের সংজ্ঞা ধরলে অনেক জনগোষ্ঠীকেই আর ব্রাত্য ধরা যায় না বাংলার এই প্রতিবেশী রাজ্যটিতে। হিমন্তের তত্ত্বাবধানে বিজেপি যে ভাষ্যই তৈরি করার চেষ্টা করুক না কেন, ঐতিহাসিক সত্য হল শুধু আহোম রাজবংশের উত্তরাধিকারী কিংবা অসমিয়া জনগোষ্ঠী অসমের আদি বাসিন্দা নয়।
কোচ কিংবা কাছাড়িদের অসমের প্রাচীন ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার উপায় নেই। একইভাবে বোড়ো, রাভা, কার্বি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অসমে অনেকদিনের। বিজেপি যতই চেষ্টা করুক, এই জনগোষ্ঠীগুলির প্রত্যেকটিকে হিন্দু বলা যাবে না। এসব জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ নিরীশ্বরবাদী ও প্রকৃতির উপাসক। হিন্দুত্বের সুতোয় সবক’টি জনগোষ্ঠীকে বেঁধে রাখা কঠিন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ প্রতিবেশী হওয়ার সুবাদে সেখান থেকে অনবরত অসমে যাওয়া-আসার ইতিহাস অনেক পুরোনো।
বাংলাদেশ থেকে যাঁরা এসেছেন, তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। কিন্তু অসমের ইতিহাসে তাঁদের অংশীদারিকে অস্বীকার করার উপায় নেই। অল অসম স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (আসু) সঙ্গে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধির সরকারের অসম চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭১ পর্যন্ত যাঁরা ভারতে এসেছেন, ধর্মনির্বিশেষে তাঁরা সবাই এদেশের নাগরিক হওয়ার যোগ্য। এখন তাঁদের সকলকে মিয়াঁ তকমা দিয়ে দেশ থেকে বিতাড়নের চেষ্টা শুধু অন্যায় নয়, অসাংবিধানিকও বটে।
নানা ফন্দিফিকিরে হিমন্ত তাঁর রাজত্ব হয়তো আরও এক দশক নিষ্কণ্টক করতে পারবেন, কিন্তু উল্লিখিত ঐতিহাসিক বাস্তবতার কারণে দীর্ঘকাল তা হওয়া কঠিন। আপাতত এক দশক নিশ্চিন্ত হলে অবশ্য হিমন্তের রাজনৈতিক কেরিয়ার বাধার মুখে পড়বে না। হিমন্তের লক্ষ্য সেটাই। যদিও দীর্ঘমেয়াদে হিমন্তের এই চাল বুমেরাং হতে পারে। তা নিয়ে অসমের মুখ্যমন্ত্রীর তেমন মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। তাঁর নিজের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকলেই হল।
এখন নাহয় ধর্মের ভেদে বিভাজনের বিষ ছড়ানো হচ্ছে অসমে। কিন্তু বিভেদের বাতাবরণ আরও নানা কারণে অনেকদিন আগে থেকেই আছে। যার ফলে বাঙাল খেদা আন্দোলনের জন্ম নেয়, বোড়োল্যান্ড রাজ্যের দাবি ওঠে, অসমিয়া জাতীয়তাবাদের ধুয়ো দেওয়া হয়। সম্প্রতি কার্বি আংলংয়ে হিংসাত্মক ঘটনার কারণ একই।
অসম চুক্তিতে তখন সব পক্ষ নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে ১৯৭১-এর ২৫ মার্চকে ভিত্তি ধরলেও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানসিকতায় বিদ্বেষের বীজ থেকে গিয়েছে। যে কারণে অসমের মধ্যে নানা স্বায়ত্তশাসিত পরিষদ তৈরি করতে হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। তা সত্ত্বেও বোড়ো, কার্বি, রাভা জনগোষ্ঠীগুলির নিজভূমে পরবাসী হওয়ার আশঙ্কা ঘোচেনি। অন্যদিকে, এখন যেমন ভোটের স্বার্থে হিন্দুত্বের কার্ড খেলা হয়, কংগ্রেস আমলে তেমন ছিল তোষণের রাজনীতি। সম্প্রীতির বাতাবরণ তৈরির চেষ্টা কোনও রাজনৈতিক দল সংকীর্ণ স্বার্থে কখনও করেনি। তারই বিষময় ফল ফলছে এখন।
