৫ বছর পর পর ভোটপর্ব যেন ধনীদের জুয়াখেলা! অল্প ব্যয়ে নির্বাচন সম্ভব?

৫ বছর পর পর ভোটপর্ব যেন ধনীদের জুয়াখেলা! অল্প ব্যয়ে নির্বাচন সম্ভব?

ইন্ডিয়া খবর/INDIA
Spread the love


স্বাধীন ভারতে বাংলার প্রথম মুখ‌্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ দেশে গণতন্ত্র কার্যকর করতে এবং তা বহাল রাখতে নিদান দিয়েছিলেন কিছু। ৫ বছর পর পর ভোটপর্ব যেন ধনীদের জুয়াখেলায় পরিণত না হয়– তা নিশ্চিত করাই ছিল তাঁর প্রকৃত অভিপ্রায়। অথচ দেশের বর্তমান ‘গণতন্ত্র’ হাঁটে যেন তাঁর আদর্শের সম্পূর্ণ বিপ্রতীপে! লিখছেন প্রণবকুমার সাহা। 

আরও পড়ুন:

স্বাধীনতার প্রায় ৭৯ বছর অতিক্রান্ত। যদিও ভারতের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে বাংলার প্রথম মুখ‌্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের (১৮৯১-১৯৮৩) অভিযোগ, হতাশা, ক্ষোভ তাঁর লেখনীতে বারংবার ফুটে উঠেছে। তাঁর দৃষ্টিতে দেশের গণতন্ত্র রক্ষার একাধিক বিষয় এখন উপস্থাপন করা হল।
প্রত্যেক দেশের শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে সে-দেশের লোকের ঐতিহ্য ও প্রকৃতি অনুযায়ী। পরম সহিষ্ণুতা ভারতীয় ঐতিহ্যের বৈশিষ্ট্য।

আরও পড়ুন:

তাই এখানে স্বাভাবিকভাবেই গণতন্ত্র জনপ্রিয়। যে শাসনব‌্যবস্থার চাপে ব্যক্তির অন্তরাত্মা নিষ্পেষিত হয়, তা প্রগতিবিরোধী ও অগণতান্ত্রিক। অন‌্যদিকে, গণতন্ত্রর আসল কথা– ব্যক্তিস্বাধীনতা, নিজস্ব মতপ্রতিষ্ঠার জন্য শান্তিপূর্ণভাবে দলগঠনের ক্ষমতা। তথা ব্যষ্টি ও সমষ্টি– অর্থাৎ ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে পরিপূর্ণ সামঞ্জস্য রক্ষা। যে ব্যক্তি-স্বাধীনতা সমাজের অকল্যাণ সাধন করে, তা স্বাধীনতা নয়, উচ্ছৃঙ্খলতা। সহজ কথায়, গণতন্ত্রের লক্ষ্য: স্বাধীন সমাজ বা শাসনব্যবস্থা কর্তৃক যেটুকু শাসন না হলেই নয়, সেটুকু, বা ন্যূনতম শাসন। এই
‘আদর্শ’ সামনে রেখেই ভারতীয় সংবিধান রচিত।

তাই এখানে স্বাভাবিকভাবেই গণতন্ত্র জনপ্রিয়। যে শাসনব‌্যবস্থার চাপে ব্যক্তির অন্তরাত্মা নিষ্পেষিত হয়, তা প্রগতিবিরোধী ও অগণতান্ত্রিক।

গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে প্রয়োজন ‘সততা’। প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের মতে, ‘ভারতবর্ষে বর্তমানে অসৎলোক দুই শ্রেণীর’। এক শ্রেণির লোক গণতন্ত্রে বিশ্বাস করলেও ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের জন্য গণতান্ত্রিক নিয়ম সমূহ কার্যকর করতে দেয় না। আর-এক শ্রেণির লোক গণতন্ত্রে বিশ্বাসই করে না। গণতান্ত্রিক সংবিধানের অন্যায় সুযোগ নিয়ে একদলীয় জনতার একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এদের মুখে গালভরা বুলি, জনতাকে বিভ্রান্ত করার। যদিও এ-প্রসঙ্গে প্রফুল্লচন্দ্র হতাশার মধ্যে আশার আলো খুঁজে পেয়েছেন। তঁার যুক্তিতে, ‘এদের শেকড় এদেশের মাটিতে নয়। এদেশের কৃষ্টির সঙ্গে এদের কোন সম্পর্ক নেই। সাময়িকভাবে কোন কোন স্থানে এদের প্রভাব হলেও ভারতের মাটিতে এদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। ভারতীয় কৃষ্টি ধর্ম ভিত্তিক। এদের ধর্মের সঙ্গেও কোন সম্পর্ক নেই। তাই এরা স্থায়ীভাবে ভারতের জনগণের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। যেটুকু পেরেছে তাও অনেকাংশে গণতন্ত্রে বিশ্বাসীদের দুর্বলতার জন্য।’

গণতন্ত্রে সাম্প্রদায়িকতা বা গোষ্ঠীগত সংকীর্ণতার কোনও স্থান নেই। যেমন নেই হিংসাত্মক কাজের। গণতন্ত্রে অবিশ্বাসীরা হিংসাত্মক কাজ করলেও গণতন্ত্রে বিশ্বাসীদের উচিত নয়, হিংসাত্মক পথে জবাব দেওয়া। এমন হলে দেশের অভ্যন্তরে একপ্রকার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে– যা প্রকারান্তরে গণতন্ত্রের সমাধি। শুধু তাই নয়, ‘এটা না হলে রক্তগঙ্গা প্রবাহিত হবে’– এমন কথাও তিনি বলেছেন। দুর্ভাগে‌্যর বিষয়, বর্তমান ভারতে সাম্প্রদায়িক, প্রাদেশিক ও গোষ্ঠীগত সংকীর্ণতা এমন আকার ধারণ করেছে যে জাতীয় সংহতির কথা সবিশেষ চিন্তা করতে হচ্ছে। অথচ ১৯৪৭ সালে সে চিন্তা করতে হয়নি।

ভারতীয় গণতন্ত্রে সকল প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার স্বীকৃত।

ভারতীয় গণতন্ত্রে সকল প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার স্বীকৃত। প্রলোভন বা ভয় দেখিয়ে ভোট আদায় করার ব্যবস্থা অগণতান্ত্রিক। গণতন্ত্রে একাধিক দল থাকতে পারে, এবং ভারতে আছেও। বরং রয়েছে বহুল পরিমাণে। প্রত্যেক দল যাতে শান্তিতে নির্বাচনী প্রচার কার্য চালাতে পারে সে-ব্যবস্থা দলগুলির নিজেদের তো বটেই, সরকারেরও নেওয়া উচিত। উচিত, কোনও দল সভা আহ্বান করলে অন্য কোনও দলের লোকের ‘কালো পতাকা’ নিয়ে না-যাওয়া বা অন্য কোনও প্রকারের বিরোধিতামূলক আচরণ না করা সুনিশ্চিতকরণ। শান্তিরক্ষার্থে সংশ্লিষ্ট সভায় পুলিশি মোতায়েনও জরুরি। প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ স্বাধীন ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার উদ্দেশ্যে জানান, ‘বে-সরকারী ও সরকারী উভয় স্তরে প্রচেষ্টার দ্বারা হিংসাত্মক কাজের আবহাওয়া বন্ধ করতে হবে। নতুবা নির্বাচন স্বাধীন ভাবে হবে না– ফলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা না হয়ে হবে সন্ত্রাসের রাজত্ব।’
হিংসাত্মক কাজ, সাম্প্রদায়িক এবং অন্য প্রকারের সংকীর্ণতা বহন করা, প্রচুর অর্থব্যয়– তিনটি বিষয়কে ত্যাগ করতে হবে গণতন্ত্রের বিশ্বাসীদের।

নির্বাচনের জন্য যত টাকা পর্যন্ত খরচ করার বিধান আছে, অধিকাংশ দল তার চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করে এবং অসত্য হিসাব দাখিল করে। অসত্য ও মিথ্যার উপর ভর করে যারা আইনসভায় প্রবেশ করেন, তাদের আচরণ যে প্রথম থেকেই মিথ‌্যাশ্রয়ী, তা বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না। গণতন্ত্রে বিশ্বাসীদের এ বিষয়ে খুব সতর্ক থাকা আবশ‌্যক। নইলে গণতন্ত্রের বদলে ধনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়, বলা বহুল‌্য।

কেউ কেউ মনে করে, দেশে শিক্ষিতের হার বাড়লেই এর প্রতিকার হবে। প্রফুল্লচন্দ্রর এ বিষয়ে ভাবনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর মতে, শিক্ষার প্রসার লাভ বাঞ্ছনীয় এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু শিক্ষিতের হার বাড়লে এর প্রতিকার হবে এ-কথা বাস্তবের কষ্টিপাথরে টেকে না। কলকাতায় শিক্ষিতের হার গ্রামাঞ্চলের চেয়ে বেশি। এদিকে, কলকাতায় নির্বাচন ব্যয় গ্রামাঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি। অতএব বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার প্রসারলাভ ও সুফল পাওয়ার আশা কম।
শ্রীঘোষের মতে, সবচেয়ে ভাল হয় যদি ভোটারগণ সংঘবদ্ধ হয়ে নিজেদের প্রতিনিধি মনোনীত করে। তঁার পরামর্শ– যারা মনেপ্রাণে গণতন্ত্রের পূজারী, তাদের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য ভোটারদের সংঘবদ্ধ করে তাদের নিজেদের প্রতিনিধি মনোনয়নের সুয়োগ করে দেওয়া। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি তার বিপরীত। প্রফুল্লচন্দ্র হতাশার সুরে বলেছেন, ‘আজ যা হচ্ছে তা জোর করে ফুলের কলিকে ফোটানর ব্যর্থ প্রয়াস মাত্র।’

এত কম খরচে কী করে নির্বাচনী ব্যয়নির্বাহ হবে এ প্রশ্নের উত্তরও প্রফুল্ল ঘোষ পেশ করেছেন।

উপযুক্ত অবস্থা সৃষ্টির জন্য প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ নিম্নলিখিত কয়েকটি প্রস্তাব পেশ করেছেন দেশবাসীর কাছে। প্রস্তাবগুলির মধ্যে সর্বপ্রথম প্রার্থী নির্বাচন। একজন সৎ ও যোগ্য মানুষ– যার আদর্শ জনকল্যাণমূলক, সে-ই জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের কল্যাণ সাধন করতে পারে। সততা, যোগ্যতা ও সুষ্ঠু নীতি এই তিন মাপকাঠিতে বিচার করতে হবে প্রার্থীকে। অর্থাৎ নিজ-নিজ বা দলগত স্বার্থে কেউ-কেউ বলে (প্রকাশে‌্য নয়, তলে-তলে) আমি মুসলমান, মুসলমানদের আমাকেই ভোট দেওয়া উচিত। তাতেই মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষা হবে। আমি মাহিষ্য, মাহিষ্যদের আমাকেই ভোট দেওয়া, তাতে মাহিষ্যদের স্বার্থরক্ষা হবে উচিত ইত্যাদি ইত্যাদি। এসবই গণতন্ত্রের জন‌্য সর্বনাশা।

দ্বিতীয় প্রস্তাব, নির্বাচন ব্যয় কম করা। বিধানসভার নির্বাচনে ২ হাজার ও লোকসভার নির্বাচনে ৬ হাজার পর্যন্ত খরচ করতে পারবে এক-একজন প্রার্থী (১৯৬৭ সালের হিসাব অনুযায়ী)। এর বেশি খরচ করা আইনত দণ্ডনীয় হওয়া উচিত।

এত কম খরচে কী করে নির্বাচনী ব্যয়নির্বাহ হবে এ প্রশ্নের উত্তরও প্রফুল্ল ঘোষ পেশ করেছেন। যথা: “(১) কোন প্রার্থী কোন পোষ্টার বা প্রচারপত্র ছাপাতে পারবেন না। (২) প্রত্যেক প্রার্থী নিজের গুণ বা যোগ্যতা এবং তার আদর্শ সংক্ষেপে লিখে দেবেন। সরকার তা ছাপিয়ে প্রত্যেক ভোটারের কাছে পৌঁছে দিবে। এজন্য প্রত্যেক বিধানসভা প্রার্থী সরকারকে ৫ শত টাকা দেবেন। (৩) কোনও প্রার্থী বা তার প্রতিনিধি কোনও ভোটারের বাড়ি যাবেন না। (৪) প্রত্যেক বিধানসভা কেন্দ্রে প্রার্থী নিজে বা তার জয়াকাঙ্খী ভোট ১২টি সাধারণ সভা করতে পারবেন। (৫) নির্বাচনের দিন প্রার্থীর পক্ষে কোন স্বেচ্ছাসেবক ভোট গ্রহণ কেন্দ্রের নিকটে বা দূরে কোথাও থাকতে পারবে না। উদ্দেশ্য যাতে ভোটাররা স্বাধীনভাবে শান্তিতে ভোট দিয়ে আসতে পারে। তিনি শেষমেষ একথাও বলেন, ‘বাস্তবের কষ্টিপাথরে যাচাই করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করতে হবে’।”

৫ বছর পর পর ভোটপর্ব যেন ধনীদের জুয়াখেলায় পরিণত না হয়– তা নিশ্চিত করাই ছিল তাঁর আসল অভিপ্রায়। শ্রীঘোষের সতর্কতা বা উপদেশ বাণী যে ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতিতে গ্রহণ করা হয়নি, তার সবথেকে বড় প্রমাণ, নিতান্ত অনাদর আর অবহেলায় তাঁর নিজের জীবনের শেষটুকু কাটে। তাঁর জীবনচর্চা ও আদর্শ কেবল তার চিঠির পাতাতেই রয়ে গিয়েছে। ফলস্বরূপ ভারতীয় গণতন্ত্রের কলুষিত রূপ ধীরে ধীরে আমাদের সামনে প্রকট হয়ে উঠেছে।

তথ‌্যসূত্র
‘প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের অগ্রন্থিত প্রবন্ধবলী’।
সম্পাদনা: প্রণবকুমার সাহা ও সুশান্ত মুখোপাধ্যায়। ‘সোপান’, কলকাতা, যন্ত্রস্থ

আরও পড়ুন:

(মতামত নিজস্ব)
লেখক অধ্যাপক
[email protected]

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *