(বইয়ের বাজার শেষ না হলেও বর্তমান বাণিজ্যিক চটক ও দায়বদ্ধতাহীন প্রকাশনা সংস্থাগুলি লেখক ও সাহিত্যের গাম্ভীর্যকে সংকটে ফেলছে।)
আশুতোষ বিশ্বাস
বইয়ের বাজার শেষ হয়ে গেছে—এমন দাবি সর্বাংশে সত্য নয়। আজও পাঠক বই কিনছেন এবং পড়ছেন, যার প্রমাণ মেলে ক্রমাগত ছাপা হওয়া বইয়ের সংখ্যায়। কোভিড-পরবর্তী সময়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বই কেনার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে মুদ্রার উলটো পিঠও আছে। প্রথাগত শিক্ষা ব্যবস্থা ও শ্রেণিকক্ষে বসে পাঠগ্রহণের আনন্দ থেকে ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় অংশ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। স্কুল-কলেজে ভর্তির অনীহা এবং অভিভাবকদের প্রথাগত পাঠক্রমে অনাগ্রহ এক গভীর সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই বিমুখতা সত্ত্বেও সাহিত্যচর্চার পরিসর কিন্তু কমেনি, বরং ডিজিটাল মাধ্যমে তার বিস্তার ঘটেছে বহুগুণ। কিন্তু এই বিস্তারের সমান্তরালে দানা বেঁধেছে এক গভীর বিভ্রান্তি, যা নবীন লেখকদের জন্য বড় আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজ্ঞাপনের ফাঁদ ও অলীক স্বপ্ন
বর্তমান যুগে সাহিত্যচর্চা বাড়লেও সোশ্যাল মিডিয়ার সৌজন্যে বই প্রকাশ এখন আর দীর্ঘ সাধনার ফল নয়, বরং একটি ‘সহজলভ্য প্যাকেজ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপ খুললেই চোখে পড়ে রয়্যালটির গ্যারান্টি বা বিনামূল্যে বই প্রকাশের লোভনীয় বিজ্ঞাপন। ‘সন্তানসম গ্রন্থটি মেলায় হাতে আসবে’—এমন চটকদারি ভাষা নতুন লেখকদের হৃদয়ে আশার আলো জাগায়। কিন্তু এই আকর্ষণের আড়ালেই ওঁত পেতে থাকে সংকটের বাঘ। রাতারাতি লেখক হওয়ার বাসনায় বহু তরুণ এমন সব প্রকাশনা সংস্থার দ্বারস্থ হচ্ছেন, যাদের সঙ্গে প্রকৃত সাহিত্যের কোনও সম্পর্ক নেই। পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়ার পরেই শুরু হয় নানাবিধ অজুহাতে অর্থ আদায়ের পালা। কাগজের দাম বৃদ্ধি বা মুদ্রণ খরচের দোহাই দিয়ে লেখককে কার্যত শোষণ করা হয়।
প্রকাশনা জগতের নৈতিক অবক্ষয়
এক সময় প্রকাশনা সংস্থা মানেই ছিল কঠোর নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং সম্পাদকের দায়বদ্ধতা। বিভিন্ন নামী প্রতিষ্ঠানগুলো সাহিত্যকে সম্পদ ও উত্তরাধিকার হিসেবে গণ্য করত। আজ সেই ধারণা আমূল বদলে গেছে। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা অনেক সংস্থারই কোনও স্থায়ী ঠিকানা নেই। অনেক ক্ষেত্রে বই ছাপার পর লেখককেই অর্ধেক বই কিনতে বাধ্য করা হয়। আবার ‘প্রথম সংস্করণ শেষ’—এমন অতিরঞ্জিত প্রচার চালিয়ে কৃত্রিম সাফল্যের আবহ তৈরি করা হয়। তবে সব প্রকাশকই এমন নন; অনেক দায়িত্বশীল প্রকাশক আজও সৃষ্টিশীল লেখকের অমূল্য সৃষ্টিকে পরম মমতায় লালন করছেন। কিন্তু একটি বড় অংশই এখন সৃজনশীলতার চেয়ে প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যাকেই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করছে।
মনন ও দায়বদ্ধতার ভবিষ্যৎ
সাহিত্য কেবল লেখকের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, তা সমাজের বৌদ্ধিক পরিসরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইতিহাস সাক্ষী আছে, কালজয়ী সাহিত্য মানুষের চিন্তাচেতনা বদলে দিতে পারে এবং স্বৈরাচারী অচলায়ন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তাই কোনও গ্রন্থ প্রকাশের আগে তার উদ্দেশ্য এবং অক্ষর অন্তরে লুকিয়ে থাকা বোধটুকু বুঝে নেওয়া প্রকাশকের নৈতিক দায়িত্ব। সাহিত্য কখনোই কেবল বাজারের নিয়মে বা নিছক বাণিজ্যিক মুনাফার ওপর ভিত্তি করে চলতে পারে না। প্রকাশকের কাছে যদি আর্থিক দিকটিই বড় হয়ে ওঠে, তবে মনন ও দায়বদ্ধতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে বাধ্য। গালভরা বিজ্ঞাপনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ফাঁদ চিনে নেওয়া আজ কবি ও লেখকদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। সচেতন পাঠক ও দায়িত্বশীল প্রকাশকের মেলবন্ধনেই সাহিত্যের প্রকৃত গরিমা রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
(লেখক শামুকতলা সিধো-কানহো কলেজের অধ্যক্ষ)
