ঘটনা দিনসাতেক আগের। মেট্রোর দরজায় গুঁতোগুঁতি ভিড়। পিছিয়ে পড়েছি স্বভাবত। আর অমনি গায়ের উপর বন্ধ হয়ে গেল মেট্রোর দরজা! এমন হতে দেখেছি বহুবার, অন্যদের ক্ষেত্রে। নিজে এ পরিস্থিতিতে কী করব, বুঝতে বুঝতে সময় লেগে গেল অনেকখানি। ততক্ষণেই আমার দুই হাত টেনে ধরেছে একেবারে অপরিচিত অন্য দুই হাত। টানছে প্রবল জোরে। কোনওক্রমে ভিতরে ঢুকতে পারলাম যখন, কাঁধ-পিঠের ব্যথা অতিক্রম করে দেখলাম, আমাকে সাহায্য করেছে অল্পবয়সী একটি ছেলে। অফিসফেরত। চোখেমুখে সংশয়। আমি ধন্যবাদ জানালাম কোনওমতে।
হয়তো আসলে ভয় নয়, পুরুষকে এমন ধন্যবাদই বারেবারে জানাতে চেয়েছে মেয়েরা। চেয়েছে, হাঁ করে তাকিয়ে থাকার বদলে তারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিক। জামায় পিরিয়ড স্টেন দেখলে আপাদমস্তক ‘জাজ’ করার বদলে জানিয়ে সতর্ক করুক মেয়েটিকে। রাতের রাস্তায় তাকে নিরাপদ অনুভব করাক। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা নির্বিশেষে রাতে বাড়ি ফেরা ভাবলেই যে ভয় আঁকড়ে ধরে মেয়েদের, তা কি মেয়েদের ভালো লাগে? আলাদা করে ‘নারী দিবস’ পালনের চেয়ে, আলাদা করে লেডিস সিট সংরক্ষণের চেয়ে, যদি রোজকার জীবনের অংশই করে নেওয়া যায় নারীদের প্রতি সম্মানকে, তাহলে হয়তো সকলের পক্ষে পৃথিবী আরও অনেকখানি বেশি বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।
আরও পড়ুন:


আর জি কর-এর নারকীয় ধর্ষণ-হত্যার ঘটনার ক্ষত আজও টাটকা পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ নারীর হ্রদয়েই। যে বিচারের আশায় রাত জেগেছিল অসংখ্য মেয়ে, দেড় বছর পেরিয়ে সে বিচার আজও অধরা। সে মিছিলে তো বহু পুরুষও ছিলেন, যারা সত্যিই বিশ্বাস করেন বিচারের প্রয়োজনীয়তায়। যারা সত্যিই বাড়ির মেয়েটিকে নিয়ে চিন্তিত, চিন্তিত পথের অচেনা সহযাত্রীকে নিয়েও।
এ তালিকা অবশ্য বলতে বসলে শেষ করা যাবে না। নির্ভয়ার ঘটনাটি দিয়েও গুনতে শুরু করা যায় যদি, তবুও কোথায় এসে থামতে পারা যাবে? আগামী হাজার প্রজন্মের নারীদেরকেও যে এমন ভয়েই বাঁচতে হবে, তা তো গত কয়েকদিনের বাংলাদেশের শিশু ধর্ষণের ঘটনাগুলিই জানান দেয়। এমনকি গত মাসে বিশ্বের সমস্ত সংবাদমাধ্যমকে কাঁপিয়ে দিল যে এপস্টিন ফাইলস, তার মূলেও তো একই কথা— নারী যেন পুরুষের ভোগ্য বস্তু। যাকে পুরুষ ভালোবাসাও দেখায় যদি, তবে তা নেহাতই স্বার্থে!


সোশাল মিডিয়ায় প্রায়শই ঘুরে বেড়ায় একটা কোটেশন, যেখানে বলা হয়েছে, অন্য কোনও প্রাণীর মাংস খাওয়া নিয়ে মানুষে মানুষে বিভেদ থাকতে পারে। একমাত্র নারীমাংসের প্রসঙ্গেই একমত হয় জগতের সমস্ত পুরুষ। সম্প্রতি খবরে উঠে এসেছিল আফগানিস্তানের ঘটনা। সেখানে তালিবান শাসন চলতে জানিয়ে দেওয়া হয় নাগরিকদের, পুরুষ তার স্ত্রী ও সন্তানদের ততক্ষণ পর্যন্ত প্রহার করতে পারবেন, যতক্ষণ না শরীরের কোনও হাড় ভেঙে যাচ্ছে। অথবা বাইরে থেকে দেখে ক্ষত বুঝতে পারা যাচ্ছে। হাড় ভেঙেও যায় যদি, তবে বড়জোর ১৫ দিনের হাজতবাস হবে সে পুরুষের!
মেয়েরা কিন্তু অকৃতজ্ঞ নয়! তাদের বরং বিশ্বাস, নারী দিবসের উদযাপন মেয়েদের যতখানি, ততখানিই ছেলেদেরও। সত্যিই যে পুরুষেরা মেয়েদের দুর্বল ভাবার বদলে সমকক্ষ ভাবেন, তাদের সাহায্য করাকে আলাদা করে গুরুদায়িত্ব না ভেবে স্বাভাবিক সহাবস্থানের অঙ্গ হিসেবে দেখেন, তাদের ধন্যবাদ না জানালে অসম্পূর্ণ থেকে যায় নারী দিবস।
যে-সঙ্গী আগে বাড়ি ফিরলে রান্না করে রাখেন তাঁর সঙ্গিনীর জন্য, যে-বাবা রাত হলে মেয়ে না-ফেরা অবধি জেগে থাকেন, যে-ভাই খুনসুটির মাঝেও খেয়াল রাখে দিদির মনখারাপের দিনগুলো— ধন্যবাদের দাবিদার তাঁরা সক্কলেই। বিশ্বাস করুন, পুরুষ-মুক্ত পৃথিবী মেয়েরা চায়নি কোনওকালেই। পৃথিবীর তামাম নারীদের এটুকুই চাহিদা কেবল, যেন পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে প্রত্যেক পুরুষই ধন্যবাদের যোগ্য হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
