বাড়ছে বাহনের সংখ্যা, পাল্লা দিচ্ছে দূষণ, তিলোত্তমার যানজটের বহর!

বাড়ছে বাহনের সংখ্যা, পাল্লা দিচ্ছে দূষণ, তিলোত্তমার যানজটের বহর!

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


এ মুহূর্তে গতিমন্দার মানচিত্রে কলকাতা দেশের দ্বিতীয় মন্থরতম শহর, বেঙ্গালুরুর পরে। কলকাতায় যানবাহনের গতি ঘণ্টায় ১৭.৪ কিলোমিটার। এখানে রাস্তার পরিমাণ কম, নতুন রাস্তার সম্ভাবনা আটকে যায় জমির কারণে, পাল্লা দিয়ে শহরের গণপরিবহণ ব্যবস্থা ঢিলঢালা হয়েছে, বেড়েছে ব্যক্তিগত বাহনের সংখ্যা, আর গত প্রশাসনের আমলে যত্রতত্র ‘অবৈধ পার্কিং’ গড়ে তুলে তোলাবাজির দৌরাত্ম্য চরমে উঠেছিল। গোদের উপর বিষফোড়া, কলকাতায় দূষণও চরমে। লিখছেন পার্থপ্রতিম বিশ্বাস। 

এখন দেশের প্রায় প্রতিটি মেগাসিটি উত্তরোত্তর গতি মন্থরতার কবলে। নগরায়নের প্রবল দাপটে দেশের একের-পর-এক শহরে জনঘনত্ব বাড়ছে। সেই সঙ্গে বেড়ে চলেছে শহরে যানঘনত্ব। গত দু’-দশকে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে ওঠা যানসংখ্যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়তে পারেনি শহরের রাস্তার দৈর্ঘ্য বা প্রস্থ। ফলে রাস্তার ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যানঘনত্ব বেড়ে ওঠায় গতিমন্দার কবলে পড়ছে শহর।

আরও পড়ুন:

কলকাতা এ-দেশের অন্যতম পুরনো শহর, যে শহরের রাস্তাঘাটের পরিমাণ শহরের ভৌগোলিক এলাকার মাত্র ৬ শতাংশ, যা সাধারণত যে কোনও পরিকল্পিত শহরে হওয়া উচিত ২৫ শতাংশ মতো। ফলে, পরিকল্পিত শহরের তুলনায় ৭৫ শতাংশ কম রাস্তা নিয়েই রক্তাল্পতায় ভোগা রোগীর মতো রাস্তার স্বল্পতা নিয়েই ছুটে চলেছে এ শহরের মানুষ। আর সে প্রেক্ষিতেই দ্রুত নগরায়নের ধাক্কায় ধীরে ধীরে বেহাল হতে চলেছে শহরের যানচলাচল।

আরও পড়ুন:

এ মুহূর্তে দেশের গতিমন্দার মানচিত্রে কলকাতা দ্বিতীয় মন্থরতম শহর, বেঙ্গালুরুর পরে। কলকাতার তুলনায় বেঙ্গালুরু অনেক বেশি পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠলেও দ্রুত ও বিকৃত নগরায়নের চাপে তা যানজটে বিপর্যস্ত। বেসরকারি আন্তর্জাতিক সমীক্ষার ভিত্তিতে যানজটের নিরিখে মেক্সিকো সিটির পরেই স্থান এ-দেশের বেঙ্গালুরু শহরের। আর, সেই তালিকায়, প্রথম ৩২টি শহরের মধ্যে রয়েছে এ-দেশের কলকাতা, মুম্বই, চেন্নাই, দিল্লি থেকে শুরু করে পুনে, হায়দরাবাদ, জয়পুরের মতো ৮টি শহর।

রাস্তায়-রাস্তায় লাগামছাড়া পার্কিংয়ের দাপটে শহরের রাস্তার কার্যকরী দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ কমছে। কমছে রাস্তার যানধারণ ক্ষমতা। ফলে সীমাবদ্ধ পরিসরের শহরের রাস্তায় অবাধ ‘অবৈধ’ পার্কিংয়ের দাপটে তৈরি হচ্ছে হামেশাই যানজট।

বেঙ্গালুরু শহরে যানবাহনের গড় গতিবেগ প্রতি ঘণ্টায় ১৬.৭ কিলোমিটার। কলকাতায় ঘণ্টায় ১৭.৪ কিলোমিটার। ফলে তুল্যমূল্য ব্যবধানে থেকেই যেন গতি-মন্থরতার প্রতিযোগিতা চলছে দুই শহরের মধ্যে! মেগাসিটির মানচিত্রে মুম্বইয়ের রাস্তায় যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় ২০.৮ কিলোমিটার এবং চেন্নাইয়ে ঘণ্টায় ১৯.২ কিলোমিটার।

কিন্তু কলকাতার চেয়ে সাড়ে ৩ গুণ বেশি রাস্তা নিয়েও বেঙ্গালুরু যে-যানজটে খাবি খাচ্ছে, তার অন্যতম কারণ শহর জুড়ে অস্বাভাবিক যানঘনত্বের বৃদ্ধি। যানঘনত্ব হিসাব করা হয় প্রতি কিলোমিটার রাস্তায় ব্যস্ত সময়ে সর্বোচ্চ গাড়ির সংখ্যা দিয়ে। সেই নিরিখে বেঙ্গালুরুর যানঘনত্ব প্রতি কিলোমিটারে ৯০০, দিল্লিতে ৪০০, আর কলকাতায় ২,৪৪৮। ফলে যে-কারণে বেঙ্গালুরুর রাস্তায় প্রবল যানজট হয়, সেই কারণে কলকাতায় এখনও বিপদসীমার ধারে কাছেই ঘুরছে। এখানে উল্লেখ্য যে, দিল্লি শহরে যানসংখ্যা কলকাতার তুলনায়
৪ গুণ বেশি হলেও সেই শহরে রাস্তার পরিমাণ (৩৩,১৯৮ কিলোমিটার) কলকাতার ১৮ গুণ বেশি। ফলে দিল্লিতে রেজিস্ট্রিকৃত গাড়ির সংখ্যা ১.৫৪ কোটি হলেও দিল্লির রাস্তায় যানঘনত্ব কলকাতা তুলনায় ৫ গুণ কম। ফলে দিল্লির রাস্তায় যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় ২৫.৪ কিলোমিটার, যেটা কলকাতার তুলনায় ৪৬% বেশি।

কলকাতার মতো সীমাবদ্ধ রাস্তার শহরে প্রবল যানঘনত্ব যে গতিমন্দার জন্ম দেবে বলার অপেক্ষা রাখে না। গতিমন্দা শহরকে গ্রাস করলে শহরের আর্থিক বিকাশের পথ অবরুদ্ধ হয়। এ শহরে সীমিত সংখ্যায় কিছু উড়ালপুল, আন্ডারপাস বা বাইপাস ব্যতিরেকে রাস্তার পরিমাণ বাড়ানো খুবই কঠিন– জমি সমস্যার কারণে। এই প্রেক্ষিতে কলকাতার মতো শহরকে যানজট মুক্ত রাখতে বহুমাত্রিক উপায় অবলম্বন করতে হবে। যার অন্যতম– অবৈধ পার্কিংয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ। কলকাতা শহরের রাস্তায় বিপুল যানঘনত্বের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শহর জুড়ে পার্কিংয়ের বিপুল চাহিদা। বিশেষত, শহরের ব্যস্ত বাজারহাট থেকে অফিসকাছারি কিংবা হোটেল-হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় ‘পার্কিং’-এর ‘চাহিদা’ তুলনায় বেশি। বাড়ির বাইরে বিভিন্ন পরিষেবা গ্রহণের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে শহরে যানবাহনের চাহিদা, তৎসহ পার্কিং।

যাত্রী পরিবহণের ক্ষেত্রে শহরের গণপরিবহণ ব্যবস্থা দুর্বল হলে বাড়তে থাকে রাস্তায় ব্যক্তিগত যানবাহনের বহর। ফলে আরও বাড়ে পার্কিংয়ের চাহিদা। এখন কলকাতা-সহ দেশের প্রায় প্রতিটি মেগাসিটিতে গণপরিবহণের মেরুদণ্ড রূপে বাসের সংখ্যা কাঙ্ক্ষিত পরিমাণের চেয়ে ঢের কম। আধুনিক যাত্রী পরিষেবায় যেখানে প্রতি লক্ষ জনসংখ্যার শহরে বাসের সংখ্যা হওয়া উচিত ৫০ থেকে ৬০, সেখানে এ-দেশের কোনও মেগাসিটিতে সেই পরিমাণ বাসের জোগান নেই। প্রতি লাখ জনসংখ্যায় কলকাতায় যখন রয়েছে ২২.৫টি বাস, দিল্লি অথবা চেন্নাইয়ের ক্ষেত্রে সেই সংখ্যা যথাক্রমে ৪৫ এবং ৩৫.৬।

গণপরিবহণের খামতি কলকাতার মতো জনবহুল শহরে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের ঝোঁক বাড়িয়ে তুলছে। চারচাকা থেকে দু’-চাকা যে কোনও গাড়ি কাজের প্রয়োজনে রাস্তায় বেরলে তার পার্কিংয়ের স্থান অপরিহার্য। অবিন্যস্ত ও অপরিকল্পিত শহরগুলিতে শহরের বিভিন্ন স্থানে কাজের দিনে পার্কিংয়ের জায়গা মেলা ভার। সে প্রেক্ষিকে, কলকাতা মহানগরের ব্যস্ততম এলাকায় জড়ো হওয়া গাড়ির পরিকল্পিত পার্কিংয়ের স্থান না-থাকায় অপরিকল্পিত ঢঙে গজিয়ে উঠেছে রাস্তার উপর গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। প্রথম-প্রথম এই ব্যবস্থায় ‘পার্কিং ফি’ থেকে আদায় করা অর্থ ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের কথা বিবেচনা করে শহরের ব্যস্ত মোড়গুলির আশপাশের অঞ্চলে রাস্তার ধার ঘেঁষে অগুনতি পার্কিংয়ের ছাড়পত্র দিয়েছিল শহরের পৌরসভা। কালে কালে পৌরসভার বজ্র অঁাটুনির ফঁাক গলে শহরের রাস্তায় আইনি পার্কিংয়ের পাশাপাশি ‘বেআইনি পার্কিং’ বেড়ে চলে রমরমিয়ে।

রাস্তায়-রাস্তায় লাগামছাড়া পার্কিংয়ের দাপটে শহরের রাস্তার কার্যকরী দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ কমছে। কমছে রাস্তার যানধারণ ক্ষমতা। ফলে সীমাবদ্ধ পরিসরের শহরের রাস্তায় অবাধ ‘অবৈধ’ পার্কিংয়ের দাপটে তৈরি হচ্ছে হামেশাই যানজট। আর, ওই যানজটের ফলে গতিমন্দার কবলে পড়া লক্ষ-লক্ষ যানবাহনের থেকে বেড়ে চলেছে বায়ুদূষণ লাফিয়ে লাফিয়ে। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, যানবাহনের গতি ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার থেকে কমে ১৫ কিলোমিটারে পৌঁছলে বায়ুদূষণের মাত্রা প্রায় ৩ গুণ বেড়ে যেতে পারে। ফলে বেআইনি পার্কিং শহরে গতিমন্দার সঙ্গে শহরকে দ্রুত দূষিত করে তোলে। ইতিমধ্যে কলকাতা শহরের বায়ুদূষণের মাত্রা দেশের রাজধানী দিল্লিকে ছুঁয়ে ফেলছে। শহরের পুরসভা ও পুলিশ প্রশাসনকে বেআইনি পার্কিং রোধে কার্যকর ভূমিকা নিতেই হবে।

পালাবদলের পরে, এ রাজ্যের নতুন সরকার, বেআইনি পার্কিং রোধে প্রাথমিকভাবে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে প্রতীকী উদ্যোগের চেয়েও ফলবান হতে পারে ধারাবাহিক কঠোর অনুশাসন। পাশাপাশি শহরের ব্যস্ত জনবহুল এলাকায় ভূগর্ভস্থ, বহুতল পার্কিং কমপ্লেক্স গড়ে তোলার পরিকল্পনাও জরুরি। এবং আরও জরুরি পার্কিংয়ের ভিড় কমাতে শহরে মেট্রো থেকে শুরু করে বাসের মতো গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে মজবুত করা। প্রয়োজন ‘পার্কিং ফি’ আদায়ের নাম করে যত্রতত্র শহর জুড়ে ‘তোলাবাজি’-র যে উপদ্রব তৈরি হয়েছিল, অাশা করতে পারি, নতুন সরকারের রাজনৈতিক জমানায় সেগুলির ইতি টানা। তবেই পথেঘাটে কিঞ্চিৎ সুশাসনের স্বাদ পাবে মানুষ!

(মতামত নিজস্ব)
লেখক অধ্যাপক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

আরও পড়ুন:

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *