গেরিলা-যুদ্ধে সুবিধা ইরানের! মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে সমস্যা আমেরিকার

গেরিলা-যুদ্ধে সুবিধা ইরানের! মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে সমস্যা আমেরিকার

রাজ্য/STATE
Spread the love


দু’-হাজার বছর আগের চৈনিক সেনাপতি ও যুদ্ধকৌশলী সুন জু-র যুদ্ধদর্শন বলে যে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে কারও লাভ নেই। ইরানের ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও গেরিলা-যুদ্ধে সক্ষমতা থাকায় আমেরিকা ও ইজরায়েল ঘোষিত যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়িত্ব পেলে ট্রাম্প সাহেবের লাভের গুড় না পিঁপড়ে খেয়ে যায়! লিখছেন রূপক বর্ধন রায়

তাহলে? এই ইরান যুদ্ধের মোদ্দাকথা দাঁড়াল এই যে, নারী ও শিশুপাচারকারী, যৌনশিকারি জেফরি এপস্টিনের বড়লোক ও শক্তিশালী মার্কিনি-ইজরায়েলি বন্ধুরা ‘ইরান’ নামক একটি ধর্মীয় মৌলবাদী শাসনব্যবস্থায় নারী-স্বাধীনতা ও মানবাধিকার পুনরুদ্ধারের উদ্দেশে একটি বাচ্চাদের স্কুলে বোমা মেরে প্রায় ১৭০টি শিশুকন্যাকে হত্যা করেছে! একেই কি বলে শাঁখের করাত? বা উলুখাগড়ার প্রাণ যাওয়া? তা-ই হবে নিশ্চয়! তবে এই আলোচনার বিষয়বস্তু সেটা নয়।

ব্যাপার যেটা, যুদ্ধেরও তো কিছু নিয়ম আছে না কি, নীতি আছে, উদ্দেশ্য-বিধেয়, নাউন-ভার্ব আছে? যুদ্ধের কাজ নেহাত মানুষ মারা নয়, অপর পক্ষের যুদ্ধ ‘চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা’-কে নষ্ট করে দেওয়াই এই সমস্ত বন্দুক, বোমা, কামান ইত্যাদির কাজ। না, এ-কথা আমি বলছি না, যেহেতু যুদ্ধের ‘এক্সপার্ট’ নই, তাই ‘এক্সপার্ট’গণ যা বলছেন, সেসব কথা সহজ করে সবার সঙ্গে বসে বুঝতে চেষ্টা করছি। প্রশ্ন: মানবিক ও ভূরাজনৈতিক দিকটি বাদ দিলেও, কেবল যুদ্ধের নীতি ও নিয়মের দিক থেকে ভেবে দেখলে, এই ইরান যুদ্ধ কত দিন চলতে পারে, এবং তার ফলে মধ্যবিত্তর সুদূরপ্রসারী অবস্থাটা ঠিক কী হতে চলেছে?

আধুনিক যুদ্ধবিশারদের মত
দিন কয়েক আগে, বিখ্যাত সামরিক ইতিহাসবিদ অধ্যাপক হুঘ স্ট্রাখেন জার্মানির জাতীয় টিভি চ্যানেলে একটি ছোট্ট সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখানে ইরান যুদ্ধ নিয়ে তাঁর মূল বক্তব্য এইপ্রকার– ‘…যুদ্ধ সাধারণত নেতাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্যের বাইরে বেরিয়ে দ্রুত বিস্তৃতি লাভ করে। ক্লজভিৎসের মতে, যুদ্ধের নিজস্ব গতি সীমিত রাখা কঠিন। ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাত স্বল্পমেয়াদি হবে বলা হলেও মার্কিনিরা প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত কৌশলগত প্রস্তুতি নিয়েছিল কি? সুন জু-র সেই অমোঘ সতর্কবার্তা– যুদ্ধে নামার আগে গভীর হিসেবনিকেশ প্রয়োজন– তাই এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত টিকিয়ে রাখায় সক্ষম বলা হলেও… (ওদিকে) ইরান দুই সপ্তাহ পরেও লড়াই চালিয়ে গেলে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য স্পষ্টত কোনও পথ খোলা থাকবে না।

যুদ্ধেরও তো কিছু নিয়ম আছে না কি, নীতি আছে, উদ্দেশ্য-বিধেয়, নাউন-ভার্ব আছে?

এমনকী, ইরানি শাসন দ্রুত ভেঙে পড়লেও, বাইরের সমর্থনে গঠিত কোনও অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের কাছে বৈধতা পাবে না।… ইরান এই সংঘাতকে অস্তিত্বরক্ষার লড়াই হিসাবে দেখছে… মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বভাবতই তেমন কোনও দায় নেই।… ২০০৩ সালে ইরাককে, যেখানে দেশ ও ভূখণ্ড সম্পর্কে সীমিত ধারণা এবং অস্পষ্ট যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনা যেমন দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার দিকে নিয়ে গিয়েছিল… ইরানের মতো ঐতিহাসিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও সেদিকেই ইঙ্গিত করছে।… দ্রুত ফলাফলের জন্য শুধুই আকাশ ও সামুদ্রিক শক্তির উপর নির্ভর করে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম… কাজেই এই সংঘাত উভয় পক্ষের জন্যেই বিস্তৃত ক্ষতির দিকেই এগোচ্ছে।’

কী বলেছেন সুন জু?
১৯ শতকের যুদ্ধবিশারদ ক্লজভিৎসের লেখা পড়িনি, বিন্দুবিসর্গ জানিও না। তবে পিএইচডি চলাকালীন প্রবীরদা দু’-হাজার বছর আগের চৈনিক সেনাপতি ও যুদ্ধকৌশলী সুন জু-র যুদ্ধদর্শন বিষয়ক একটা দুর্দান্ত গ্রাফিক বই এনে দিয়েছিল। সেই বই থেকে সুন জু-র যুদ্ধদর্শনের বেশ কিছুটা অংশ পড়েছিলাম। এরপর নিস শহরের পুরনো বইয়ের বাজারে রজার আমেসের বিরাট ইংরেজি অনুবাদ পাই। সে-বইয়ের মূল অংশও পড়ার সুযোগ হল। তাই স্ট্রাখেনের সাক্ষাৎকার শোনার পর আবারও বই দু’টি ঘাঁটার লোভ সামলাতে পারিনি। কী পাচ্ছি সেসব লেখায়?

নিজের সম্পদ রক্ষা করা এবং শত্রুর মনস্তত্ত্ব নিয়ে খেলা করাই সুন জু-র মূল লক্ষ্য। তৃতীয় অধ্যায় ‘আক্রমণের পরিকল্পনা’-য় তিনি বলছেন– ‘প্রাচীরঘেরা শহর অবরোধ করাই হল সবচেয়ে নিকৃষ্ট যুদ্ধনীতি।’ আধুনিক সমরবিদরা ইরানের মাটির গভীরে অবস্থিত শক্তিঘাঁটিগুলিকে এই ‘প্রাচীরঘেরা শহর’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন। সুন জু-র মতে, এই ধরনের সরাসরি আক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী এবং ব্যয়বহুল হওয়াই জয়ের চেয়ে ধ্বংসই ডেকে আনে বেশি। এর আগে দ্বিতীয় অধ্যায় ‘যুদ্ধ পরিচালনা’-য় তিনি জোর দিয়ে বলছেন, ‘দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে কোনও দেশই কখনও উপকৃত হয়নি।’

সুবিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও ঐতিহাসিকভাবে গেরিলা-যুদ্ধে সক্ষমতার কারণে ইরানের উপর যে কোনও আক্রমণই যে শেষ পর্যন্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের রূপ নিতে পারে।

দুইয়ে মিলে যেটা দাঁড়াল, সুবিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও ঐতিহাসিকভাবে গেরিলা-যুদ্ধে সক্ষমতার কারণে ইরানের উপর যে কোনও আক্রমণই যে শেষ পর্যন্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের রূপ নিতে পারে, ইঙ্গিত সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে। যা আক্রমণকারী দেশের রাজকোষ এবং সুন জু-র প্রথম অধ্যায় “মূল্যায়নে বর্ণিত জাতীয় মনোবল ও ‘নৈতিক আইন’ (Ethical Legislation)”-কে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। তাই, একাদশ অধ্যায় “ন’-ধরনের ভূখণ্ড”-য় বর্ণিত ভৌগোলিক ও মনস্তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতাসমূহ বর্তমানে সরাসরি ইরান আক্রমণের বিপক্ষেই যাচ্ছে। শেষমেশ ষষ্ঠ অধ্যায়ে ‘দুর্বল ও শক্তিশালী দিক’ মানলে একজন বুদ্ধিমান সেনাপতির শত্রুর দুর্বল জায়গায় আঘাত করার কথা, তাই ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী মিসাইল লঞ্চপ্যাডে আঘাত করাও সুন জু-র দর্শনের পরিপন্থী। চুম্বকে, আধুনিক সমরবিদরা এই যুদ্ধের আপাত-চরিত্রগুলিকে চটজলদি নিষ্পত্তির পরিপন্থী বলেই মনে করছেন।

সাধারণ ভাতকাপড়ে
আমরা যারা চাকরি করি, যারা দিনের শেষে পরনিন্দা ও পরচর্চার আমোদে দৈনন্দিন আরামটুকু খুঁজে নিয়ে, চাট্টি খেয়ে, ঘুমতে গিয়ে স্বপ্নে ‘টার্মিনেটর’ ছবির যুদ্ধ দেখে সজোরে পাশবালিশে লাথি কষাই, তাদের, অর্থাৎ মধ্যবিত্তের অবস্থা, এই যুদ্ধের ফলে ঠিক কী হতে চলেছে– তা বলা খুব মুশকিল কি? আমার মতো যারা যুদ্ধ-নীতি ও নিয়মের কিছুই বোঝে না– তাদের তাই এই বেলা সুন জু, ক্লজভিৎসদের কাছে একবার না একবার যেতেই হচ্ছে। অদ্য গ্যাসের দাম বাড়ল, আগামী কাল তেলের বাড়বে, পরশু নুন বাড়ন্ত হতে পারে– তাই এক্সপার্টদের মতে– এ যুদ্ধ কত দিন ঠিক চলতে পারে, তার একটা অগোছালো ধারণা থাকাটাও বিশেষ জরুরি হয়ে উঠেছে বইকি। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, ইরাকের ইতিহাস যা বলছে, তাতে ব্যাপার যে বিশেষ সুবিধার নয়, বলা বাহুল্য। আর আমার মতো যাদের বছরে অন্তত বারকয়েক দেশে যাওয়ার আবেগ ও ব্যবহারগত প্রয়োজনীয়তা থাকে, তাদের কপালে যে কী আছে তা ট্রাম্প, বিবি, লারিজানি সাহেবরাই জানেন। আপাতত আমাদের হাতে কেবলই কাঁচকলা!

(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাবন্ধিক
[email protected]

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *