শুভময় মুখোপাধ্যায়
বুধবার সকালে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে যা ঘটল, তা এক কথায় নজিরবিহীন। হাজারো রাজনৈতিক ঝড় সামলানো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন সশরীরে হাজির হয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টে। লক্ষ্য- নির্বাচন কমিশনের তথাকথিত ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া। প্রধান বিচারপতির কাছে বিশেষ অনুমতি নিয়ে তিনি যখন কথা বলতে শুরু করলেন, তখন তাঁর গলায় আর পাঁচজন রাজনীতিকের মেকি বিনয় ছিল না। ছিল সেই চিরচেনা ‘স্ট্রিট ফাইটার’-এর ঝাঁঝ। স্পষ্ট বললেন, ‘আমি এখানে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আসিনি, এসেছি সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে।’
শুনতে সাধারণ মনে হলেও, এই একটি বাক্যেই তিনি বুঝিয়ে দিলেন, ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটের আগে তিনি ফের ‘কমন ম্যান’-এর একমাত্র অভিভাবক। নিজের ‘আক্রান্ত’ মানুষের হয়ে বিচার চাইতে খোদ মুখ্যমন্ত্রী যখন দিল্লিতে দরবার করেন, তখন সেই দৃশ্য আর নিছক আইনি লড়াই থাকে না, তা হয়ে ওঠে পুরোদস্তুর পলিটিক্যাল থিয়েটার। জাতীয় মিডিয়ার ক্যামেরা যখন তাঁর দিকে, তিনি জানতেন- এই ফুটেজটাই আগামী কয়েক মাস বাংলার গ্রামগঞ্জে ঘুরবে।
বুদ্ধিজীবীদের খোরাক, জনতার অক্সিজেন
সোশ্যাল মিডিয়ায় বা কলকাতার অভিজাত ড্রয়িংরুমে এদিন সন্ধ্যাবেলায় চায়ের কাপে নিশ্চিতভাবে ঝড় উঠল- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইংরেজি উচ্চারণ কেমন ছিল? তিনি কি ব্যাকরণ মেনে কথা বললেন? তথাকথিত ‘এলিট’ বা বুদ্ধিজীবী শ্রেণি হয়তো বাঁকা হাসি হাসল। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামের পোড়খাওয়া রাজনীতিকটি খুব ভালো করেই জানেন, তাঁর আসল শক্তি এই বুদ্ধিজীবীরা নন। তাঁর শক্তি জঙ্গলমহলের আদিবাসী কিংবা সুন্দরবনের মৎস্যজীবী, যাঁদের কাছে ইংরেজি ব্যাকরণের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি তাঁদের নামটা ভোটার তালিকায় থাকা।
মমতা যখন আদালতে দাঁড়িয়ে আবেগে গলা চড়িয়ে বলেন যে, বাংলাকে টার্গেট করা হচ্ছে, তখন ওই ভাঙা ইংরেজিই তাঁর ভোটারদের কাছে সাহসের প্রতীক হয়ে ওঠে। তাঁরা ভাবেন, ‘দিদি আমাদের জন্য দিল্লির বড়বাবুদের মুখের ওপর কথা বলে এসেছেন।’ এটাই মমতার ইউএসপি। তিনি জানতেন, রাজ্য সরকারের প্যানেলে থাকা শ্যাম দিওয়ানের মতো দুঁদে আইনজীবীরা আইনের পয়েন্টগুলো ভালোই বোঝাবেন, কিন্তু ‘আবেগ’-এর পয়েন্টে গোলটা তাঁকেই করতে হবে। আর সেটাই তিনি করে দেখালেন। প্রমাণ করলেন, রাজনীতিটা আসলে আবেগেরই খেলা, আর সেই খেলায় তিনি আজও অপ্রতিরোধ্য।
অভিষেক ও ‘মমতা-ম্যাজিক’
তৃণমূলের অন্দরে এখন কান পাতলেই শোনা যায়- আগামীর ব্যাটন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে। ডায়মন্ড হারবার মডেল, কর্পোরেট স্টাইল, ঝকঝকে ভাষণ- অভিষেক নিঃসন্দেহে আধুনিক। কিন্তু আজকের ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, ‘মমতা-ম্যাজিক’ আর ‘অভিষেক-মডেল’-এর ফারাকটা ঠিক কোথায়। অভিষেক হয়তো সাংবাদিক বৈঠক করে তথ্য-পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝাতেন, কেন এসআইআর প্রক্রিয়াটি ভুল। টুইটারে ঝড় তুলতেন। কিন্তু মমতা? তিনি সোজা সিংহের গুহায় ঢুকে পড়লেন। এই যে নাটকীয়তা, এই যে নিজেকে বিপন্ন করে বাজি ধরা- এটা অভিষেকের ‘ম্যানেজমেন্ট গুরু’ স্টাইলে পাওয়া কঠিন। অভিষেক শিখছেন, তৈরি হচ্ছেন, কিন্তু জনমানসে ঝড় তোলার যে সহজাত প্রবৃত্তি বা ‘ইনস্টিন্ট’ মমতার আছে, তা যে কোনও পাঠশালায় শেখানো যায় না। আজকের দিনটি অভিষেকের কাছেও বড় শিক্ষার- রাজনীতি সবসময় এক্সেল শিটে চলে না, মাঝেমধ্যে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ ইমেজের প্রয়োজন হয়।
ভোটের বছরে ‘এসআইআর’ জুজু
২০২৬ সাল। ভোটের বছর। শিক্ষক নিয়োগ থেকে আরজি কর- নানা ইস্যুতে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়ায় যখন বিরোধীরা পাল তুলছে, ঠিক তখনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘এসআইআর’ ইস্যুটিকে যেভাবে লুফে নিলেন, তা এক কথায় অনবদ্য। বিজেপির স্ট্র্যাটেজি ছিল, ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে অনুপ্রবেশকারী ইস্যুতে তৃণমূলকে চাপে রাখা। কিন্তু মমতা সেই বলটিকেই গ্যালারিতে পাঠালেন ‘ভিক্টিম কার্ড’ খেলে। বিষয়টিকে করে তুললেন ‘বাংলা বনাম দিল্লি’ বা ‘বাঙালি বনাম বহিরাগত’ সংঘাত। তাঁর বার্তা স্পষ্ট- ‘দ্যাখো, ওরা তোমাদের নাম কেটে দিচ্ছে, আর আমি তোমাদের নাম বাঁচাতে সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে লড়াই করছি।’
যে মানুষটি গতকাল পর্যন্ত সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন, আজ তাঁর মনেও একটা সন্দেহের পোকা ঢুকিয়ে দেওয়া গেল- ‘আমার নামটা ভোটার তালিকায় থাকবে তো?’ আর এই ভয়টাই মমতার ভোটব্যাংককে সংহত করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। এনআরসি বা সিএএ-র সময় তিনি যে কৌশল নিয়েছিলেন, এদিন ‘এসআইআর’ ইস্যুতেও ঠিক সেই ছকেই খেললেন। ক্ষোভকে ভয়ের মোড়কে মুড়ে নিজের পক্ষে টেনে নিলেন।
ছন্নছাড়া বিরোধী শিবির
কংগ্রেস এবং সিপিএম- এই দুই দল আজও যেন কোনও সমান্তরাল মহাবিশ্বে বাস করছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়াটা সত্যি হলে, তা তো বাম বা কংগ্রেস সমর্থকেরও হতে পারে! কিন্তু এই ইস্যু নিয়ে রাস্তায় নামা বা আইনি লড়াইয়ের কোনও উদ্যোগ তাদের নেই। তারা ব্যস্ত রইল মমতার ‘নাটক’ নিয়ে টিপ্পনী কাটতে। ফল? সাধারণ মানুষের চোখে এই লড়াইয়ের একমাত্র ‘ত্রাতা’ হয়ে রইলেন সেই মমতাই। বিরোধীরা মাঠের বাইরে বসে ধারাভাষ্যই দিয়ে গেল, ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে বেরিয়ে গেলেন মমতা।
আর বিজেপি? তারা আজ একটু হলেও ব্যাকফুটে। নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক সংস্থা হলেও, মমতা বারবার বুঝিয়েছেন কমিশন কেন্দ্রের ইশারাতেই চলে। আজ সুপ্রিম কোর্টে মমতা যখন সরাসরি কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আনলেন এবং আদালত সেটা শুনল, তখন বিজেপির ‘নিউট্রাল’ অবস্থান নেওয়া কঠিন। মমতার এই চালে বিজেপি এখন ডিফেন্সিভ। তাদের এখন বোঝাতে হবে যে, এই ভোটার সংশোধন প্রক্রিয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়- যা বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে বোঝানো বেশ কঠিন।
এদিনের ঘটনা শুধু আইনি শুনানি ছিল না। এটি ছিল ২০২৬-এর ভোটের আগে মমতার ‘ওয়ার্ম-আপ’ ম্যাচ। তিনি দেখিয়ে দিলেন, বয়স বা অসুস্থতা তাঁর রাজনৈতিক খিদে কমাতে পারেনি। তিনি আজও জানেন, কখন, কোথায় এবং কীভাবে আঘাত করলে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা যায়। ‘এসআইআর’ ইস্যু শেষপর্যন্ত আদালতে টিকবে কি না, তা সময় বলবে। কিন্তু রাজনীতির আদালতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ নিজেকে আরও একবার অপরিহার্য প্রমাণ করে দিলেন।
(লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক)
