বাংলা ভাষা কি বাঙালির সার্বিক জাতিসত্তার পরিচায়ক হয়ে উঠতে পেরেছে? একদা আইনসভায় বাংলা বলা যেত, কিন্তু সেই বাংলা বক্তব্যকে বাংলা ভাষায়, বাংলা হরফে ধারাবিবরণীতে রাখা হত না। ভবতোষ দত্ত বাংলায় বর্তব্য রাখার অনুমতি পাননি, কারণ, তিনি চমৎকার ইংরেজি জানতেন। আমাদের উদাসীনতা ও কৃতকর্মের ফল বাঙালি জাতিসত্তার গুরুত্বকে কোন তলানিতে এনে দাঁড় করিয়েছে– তার রোমন্থন। ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উপলক্ষে বিশেষ নিবন্ধ। লিখলেন অনুপ বন্দ্যোপাধ্যায়।
আরও পড়ুন:
পৃথিবীর ভাষিক চরিত্র বিশ্লেষণ করলে আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না ‘ভাষা’ রাজনীতির এক শক্তিশালী হাতিয়ার, যে-অায়ুধ এনে দেয় ক্ষমতা, আর ক্ষমতা এনে দেয়– অর্থ। আবার, ভাষা প্রাথমিকভাবে জাতিসত্তার পরিচায়ক। এবার এই জাতিসত্তার পরিচয়ের সঙ্গে রাজনীতির মিশেল হলেই দেখা দেয় দ্বন্দ্ব। একপক্ষ যদি জাতিসত্তাকে মূল্য দিয়ে রাজনীতি করতে চায়, তখনই আর-এক পক্ষ তার বিরোধিতা আরম্ভ করে। এর ফলে জাতিসত্তার পরিচয় নেপথ্যে চলে যায়। সামনে চলে আসে কেবলই দলীয় রাজনীতির খেলা। পৃথিবীর সব দেশেই এমনটি হয় বলছি না। এমনকী, আমাদের দেশেও দক্ষিণ ভারতে এমনটি ঘটে না– সেখানে জাতিসত্তার পরিচয়কে সম্মান জানিয়ে দলীয় রাজনীতি করা হয়।
কিন্তু আমাদের বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে বাঙালির সার্বিক জাতিসত্তার পরিচয়কে বোধহয় কখনওই ‘প্রাথমিক শর্ত’ হিসাবে গণ্য করা হয়নি। যারা চেষ্টা করেছে তাদের কপালে কেবলই অপমান ও বিদ্রুপ জুটেছে। আজ, এই ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’-এ, আপন কৃতকর্মের ফলাফল আমাদের সমগ্র বাঙালি জাতিসত্তাকে কীভাবে অপমান করছে, অবহেলা করছে– সে নিয়েই দু’-চার কথা বলব।
আমাদের বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে বাঙালির সার্বিক জাতিসত্তার পরিচয়কে বোধহয় কখনওই ‘প্রাথমিক শর্ত’ হিসাবে গণ্য করা হয়নি। যারা চেষ্টা করেছে তাদের কপালে কেবলই অপমান ও বিদ্রুপ জুটেছে।
১৯৩৭। প্রথম বাংলা সরকার তৈরি হল। তখন থেকেই আইনসভায় বাংলায় বক্তব্য রাখার প্রবণতা দেখা গেল। তবে সেই বাংলা বক্তব্যকে, বাংলা ভাষায়, বাংলা হরফে ধারাবিবরণীতে রাখা হত না। ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিতে হত। ১৯৩৮ সালের মার্চ মাস থেকে বাংলা ভাষায় প্রশ্ন করলে বাংলা ভাষায় ও হরফে কেবল সেই প্রশ্নগুলিকেই রাখা হত, উত্তর থাকত ইংরেজি ভাষাতেই। তবে এখানেও শর্ত রয়েছে। কী সেই শর্ত? ৫ আগস্ট ১৯৩৮ সালে মাননীয় অধ্যক্ষ মহাশয় জানিয়ে দিলেন– তিনি যদি সন্তুষ্ট হন যে, বক্তা সত্যি সত্যি ইংরেজি জানেন না, তবেই তিনি বাংলা ভাষায় বলতে পারবেন। যেমন– ওই দিন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত মহাশয় বাংলায় প্রশ্ন করতে গেলে অধ্যক্ষ মহাশয় পরিষ্কার বলে দেন যে, তিনি জানেন যে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাল ইংরেজি জানেন, অতএব– ‘মিস্টার দত্ত ইউ মাস্ট স্পিক ইন ইংলিশ’। সহজ করে বলতে গেলে– তখন বাংলায় বলতে গেলে ধমক খেতে হত। আবার ইংরেজিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে একটু হোঁচট খেলেই সভাকক্ষে উপস্থিত সভ্যরা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করতে ছাড়তেন না।
৮ জুলাই, ১৯৪৩। বাংলা বলতে না দেওয়ার আর-একটা কারণ উল্লেখ করা হয়। সেই কারণটা হচ্ছে– বাংলা শর্টহ্যান্ড জানা কর্মীর অভাব। সরকারি কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার এই নতুন সরকারের আমলে প্রচুর পরিমাণে বেড়েছে– এটা সত্যি। তবে এখনও, ৮৩ বছর পরেও– সর্বস্তরে সর্বতোভাবে সরকারি কাজে, আমাদের জীবন-জীবিকার কাজে, বাংলা ভাষার প্রয়োগের ক্ষেত্রে ফঁাক থেকেই যাচ্ছে।
দেশ স্বাধীন হল। ২১ নভেম্বর, শুক্রবার, ১৯৪৭। দুপুর ২টো। স্বাধীন ভারতের পশ্চিমবাংলায় প্রথম অধিবেশনে মাননীয় প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ মহাশয় বাংলা ভাষায় প্রস্তাব পাঠ করলেন। অনেকেই ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন, কেউ কেউ বাংলায় আবার কেউ কেউ ইংরেজিতে। তারপরেই কয়েকটি বিষয়ে আলোচনা আরম্ভ হল। জ্যোতি বসু, পরে দীর্ঘ সময়ের জন্য বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। ২১ নভেম্বর এবং ২৫ নভেম্বর বাদে, আগাগোড়াই ইংরেজিতে বিভিন্ন আলোচনায় যোগদান করেছিলেন। তবে তখন থেকেই অনেকেই বাংলায় বক্তব্য রাখতে আরম্ভ করেন।
কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার তো বাংলা বোঝে না। তাহলে? তাহলে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে হবে। কিন্তু ডা. বিধানচন্দ্র রায় পরিষ্কার জানিয়ে দেন (৯ মার্চ, ১৯৪৮), ‘উই হ্যাভ নো ফান্ডস টু ট্রান্সলেট দ্যাট।’ বুঝতেই পারছেন খুবই গোলমেলে ব্যাপার– বাজেটে টাকা রাখলে তো টাকা থাকবে, না রাখলে আর কী করে থাকবে! এই গোলমেলে ব্যাপার চলতেই থাকে পরবর্তী নানা সরকারের আমলে নানা কারণ ও ব্যাখ্যা দিয়ে। যার ফলস্বরূপ সারা ভারতে ছড়িয়ে গেল পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা তাদের মাতৃভাষার মর্যাদা নিয়ে অনেকটাই উদাসীন।
সরকারি কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার এই নতুন সরকারের আমলে প্রচুর পরিমাণে বেড়েছে– এটা সত্যি। তবে এখনও, ৮৩ বছর পরেও– সর্বস্তরে সর্বতোভাবে সরকারি কাজে, আমাদের জীবন-জীবিকার কাজে, বাংলা ভাষার প্রয়োগের ক্ষেত্রে ফঁাক থেকেই যাচ্ছে।
ইতিহাসকে আমরা দলীয় রাজনীতির স্বার্থে বারবার বিকৃত হতে দেখেছি। বারবার পাঠ্যক্রমও পালটে পালটে দিয়েছি। তবুও থেকে যায়। যেমন ‘বিচিত্রা’ পত্রিকার আষাঢ় ১৩৪১ (১৯৩৪) সংখ্যার সুশীলকুমার বসুর ‘ভারতের সাধারণ ভাষা’ শীর্ষক নিবন্ধটি। সেখানে এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘ভারতবর্ষের কোনো এক প্রদেশের ভাষাকে যদি রাষ্ট্রিক ভাষা করা হয় তাহা হইলে সেই প্রদেশের লোকেরা সহজেই অন্যপ্রদেশের লোকদের উপর কতকটা সুবিধা লইতে পারিবেন।… বক্তৃতা, তর্ক, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা প্রভৃতিতে তাহাদের অপেক্ষাকৃত সুবিধা হইবে। তদ্ব্যতীত নিজেদের ভাষা রাষ্ট্রীয় ভাষা বলিয়া অন্যান্য প্রদেশের ভাষা ও সাহিত্যকে কতটা অবজ্ঞার চক্ষে দেখা ইহাদের পক্ষে কতকটা স্বাভাবিক হইবে।’
বুঝতেই পারছেন দেশ ‘স্বাধীন’ হতে তখনও ১৩ বছর বাকি, আর হিন্দির পক্ষে জনমত গঠনের কাজ হিন্দি বলয়ের রাজনীতিবিদেরা আরম্ভ করে দিয়েছে। একজন রাজনীতিবিদ তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তঁার সব বই দেবনাগরীতে ছাপানোর অনুরোধ পর্যন্ত করে এসেছিলেন! আর আমরা, আমাদের মুখ্যমন্ত্রীরা– ডা. বিধানচন্দ্র রায়, সিদ্ধার্থশংকর রায়, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য– প্রতে্যকে বিভিন্ন সময় নানা ঘোষণা করেছেন। কখনও বলেছেন, ১ বৈশাখ থেকে সরকারি কাজকর্ম সব বাংলায় হবে, কখনও বলেছেন– ২৫ বৈশাখ থেকে হবে। কিন্তু কেন হল না প্রশ্ন করলেই উত্তর এসেছে– কখনও টাইপরাইটার অপ্রতুল, কখনও টাইপরাইটার কেনার বাজেট নেই, কখনও টাইপিস্ট ও স্টেনোগ্রাফার নেই, কখনও-বা পরিভাষা নেই– এরকম বিচিত্র সব উত্তর!
এখনকার দিনে এই কথাগুলি বললাম, কারণ, এই নতুন সরকারের আগে পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষার প্রতি উদাসীনতা আর উলটোদিকে হিন্দির প্রসার প্রচারের ক্ষেত্রে, স্বাধীনতার আগে, রাজনৈতিকভাবে এবং স্বাধীনতার পর তো সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের সক্রিয় লাগাতার উদ্যোগ নেওয়া চলেছিল এবং চলছে। হিন্দি বলয়ের নানা নেতাদের মুখে এখন যে বাংলা ভাষার প্রতি অপমানসূচক কথা শোনা যাচ্ছে, বাংলার মনীষীদের নাম পর্যন্ত বিকৃত করা হচ্ছে, অসম্মান করা হচ্ছে, বাংলার ইতিহাসকে গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে– সেগুলো সবই এতকাল ধরে চলে আসা আমাদেরই উদাসীনতার ফল। আর এখনও বর্তমান সরকার যখন মাটি কামড়ে দঁাতে দঁাত চেপে সেই সম্মান পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে– তখন কিছু বাঙালি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এর বিরোধিতা করছেন।
লোভ বড় ভয়াবহ জিনিস। এতে কোনও নীতি বা আদর্শ থাকে না। মা, বাবা, ভাই, বোন, প্রতিবেশী, রাজ্য, দেশ– সবকিছুই যখন বিকিয়ে যাচ্ছে, তখন বাঙালির সংস্কৃতি, সাহিত্য, কৃষ্টি এগুলোই-বা বাদ যাবে কেন? কেউ বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙে ফেলছে– ফেলুক না! বাংলা বলে কোনও ভাষাই ভারতে নেই বলছে– বলুক না! বাংলা বললেই ‘বাংলাদেশি’ তাই তাদের হেনস্তা করে বাংলাদেশে জোর করে পাঠিয়ে দিচ্ছে– দিক না! ‘বঙ্কিমদা’ বলছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ সান্যাল’ বলছেন– বলুক না! কেউ ‘রাজা’ রামমোহন রায় সম্পর্কে কটুকাটব্য করছে– করুক না! আমরা টুঁ শব্দটি করব না। এ কথা বোধগম্য যে, হিন্দি বলয়ের নেতারা তাদেরও অপমান করছে, বাঙালির জাতিসত্তাকে অবহেলা করছে, তবুও ‘চুপ’– কেননা সেই ‘লোভ’। একটা টিকিট চাই, একটা পদ চাই, ক্ষমতা চাই– তা সে আমাদের সার্বিক জাতিসত্তার বিনিময়ে হলেও।
তাই এবারের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে– যারা বাংলার, বাঙালির অপমান করছে, ধর্মের নামে বিভাজন তৈরি করার অপচেষ্টা করছে, তাদের বাংলার বুক থেকে সমূলে উৎপাটিত করতেই হবে, বাঙালির জাতিসত্তার পরিচয়কে দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে আনতেই হবে। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’– এই গান কেবল গাইলেই চলবে না, প্রমাণ করতে হবে। আর, সেই প্রমাণ করার দায়িত্ব এবার এপার বাংলার বাঙালিদেরই নিতে হবে– অন্য কেউ এসে, আমাদের হয়ে, এ কাজ করে দেবে না।
(মতামত নিজস্ব)
আরও পড়ুন:
এবারের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে– যারা বাংলার, বাঙালির অপমান করছে, ধর্মের নামে বিভাজন তৈরি করার অপচেষ্টা করছে, তাদের বাংলার বুক থেকে সমূলে উৎপাটিত করতেই হবে, বাঙালির জাতিসত্তার পরিচয়কে দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে আনতেই হবে।
সর্বশেষ খবর
